বিকেল থেকে আকাশজোড়া মেঘ ছিল। মাঝেমধ্যেই তর্জন-গর্জন। সন্ধ্যা নামতেই গর্জনের সঙ্গে প্রবল বর্ষণ। সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। শনিবার সন্ধ্যায় কালবৈশাখীর এই দাপটে গোটা মুর্শিদাবাদ জেলা তছনছ হয়েছে।

তবে জেলার সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাগরদিঘী ব্লক। সেখানকার অন্তত ৬০টি গ্রাম ঝড়ের কবলে পড়েছিল। ব্লকের প্রায় আড়াই হাজার বাড়ি ভেঙেছে। উপড়ে গিয়েছে বিদ্যুতের খুঁটি ও গাছ। ভুট্টা ও বোরো চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গিয়েছে ব্লক প্রশাসন সূত্রে। পরিণত আম অকাতরে ঝরেছে।

সাগরদিঘির বিডিও দেবব্রত সরকার রবিবার দুপুরে ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসে জানিয়েছেন, ‘‘বালিয়া, মনিগ্রাম, পাটকেলডাঙা, গোবর্ধনডাঙা ও কাবিলপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রায় সমস্ত গ্রামই তছনছ হয়ে গিয়েছে ঝড়ে। বাড়িঘর ভেঙে গিয়েছে। ফসলের ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপের জন্য কৃষি দফতরকে বলা হয়েছে। পঞ্চায়েতের প্রধানদের ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে।  সোমবারই প্রতিটি গ্রামে ত্রিপল ও চাল পাঠানো হবে।’’

রবিবার সকালে ফুলবাড়ি, গাদি, ভাটাপাড়া, তেঘরি, বালিয়া, পাকালপাড়া, কাবিলপুর, সাহেবনগর, অমৃতপুর, রনজিৎপুর, উলাডাঙা- যে দিকেই চোখ গিয়েছে সর্বত্রই তাণ্ডবের ছবি নজরে এসেছে।   এ দিন দেখা গিয়েছে, কেউ কেউ ব্যস্ত ভেঙে পড়া বাড়ি সারাতে। কেউ আবার মাঠে ফসলের ক্ষতির অঙ্ক কষছেন। কেউ আবার উঠোনে আছড়ে পড়া গাছের ডাল সরাতে ব্যস্ত। ফুলবাড়ির রেজাবুল শেখের বাড়িতে ভেঙে পড়েছে রাস্তার ধারের একটি গাছ। তিনি বলেন, ‘‘মেঘ দেখে  ঘরেই বসেছিলাম। তুমুল ঝড় বৃষ্টির সঙ্গে মেঘের গর্জন। হঠাৎ ভেঙে পড়ল বাড়ি লাগোয়া নিমের গাছটা।’’ এলাকার আনেশা বিবি, সায়েমা বিবি, পাতনু বেওয়া সকলেরই মাথা গোঁজার ঠাঁই ভেঙে পড়েছে। তাঁদের দুর্দশার সাক্ষী থেকেছেন বিডিও। গাদির পঞ্চায়েত সদস্য তৃণমূলের আলি মহম্মদ বলেন, ‘‘অনেক বাড়ি ভেঙে পড়েছে। দুর্গতদের ত্রিপল দেওয়া জরুরী। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যে পর্যন্ত তা মেলেনি।’’ কাবিলপুর পঞ্চায়েতের প্রধান কংগ্রেসের আম্বিয়া খাতুন বলেন, ‘‘ঝড়ের তাণ্ডবে কাবিলপুরের অন্তত সাড়ে চারশো বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত। মাঠের ফসল সব শেষ।’’ পাটকেলডাঙার পঞ্চায়েত প্রধান তৃণমূলের পরিহা আসজাদি বেগম বলেন, ‘‘শুধু পাটকেলডাঙায় অন্তত ১১০০ বাড়ি ভেঙেছে। ২০০ বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গিয়েছে। বোরো ধানের ৪০ শতাংশ নষ্ট হয়েছে।’’ এদিনের ঝড়ে উড়ে গেছে অমৃতপুর গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক খাইরুল আনমের বাড়ির টিনের ছাদ উড়ে গিয়েছে। তিনি বলেন, ‘‘২০০০ সালের বন্যার পর বেশিরভাগ লোকজনই পাকা বাড়ি তৈরি করেছিলেন। সেই কারণে বাড়িঘর কম ক্ষতি হয়েছে, কিন্তু বোরো চাষ ও গ্রীষ্মকালীন সব্জি চাষেও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।’’ অন্যদিকে বহরমপুর ও নওদা ব্লকেরও বেশ কিছু মাটির বাড়ি ঝড়ে ভেঙে গিয়েছে। বহরমপুরের মহকুমা শাসক সুপ্রিয় দাস বলেন, “বহরমপুর ও নওদা ব্লকের বেশ কিছু মাটির বাড়ির দেওয়াল ও টিনের ছাউনি ভেঙে গিয়েছে। এ ছাড়াও হরিহরপাড়া এলাকায় যেমন বেশ কিছু কলাগাছ নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে সংশ্লিষ্ট ব্লক প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট তলব করা হয়েছে।”

শনিবারের ঝড়ে মুর্শিদাবাদ পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে মিলেমিশে
একাকার হয়ে গিয়েছে নানা দলের পতাকা। গৌতম প্রামাণিকের তোলা ছবি।

মুর্শিদাবাদ পুরসভা এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে অল্প-বিস্তর ক্ষতি হয়েছে। বেশ কিছু বাড়ির টালি ও টিন উড়ে গিয়েছে। কাউন্সিলর কংগ্রেসের বিপ্লব চক্রবর্তী বলেন, “পুরসভা এলাকার বিভিন্ন ওয়ার্ডে ক্ষয়-ক্ষতি হলেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভাগীরথীর পাড় লাগোয়া এলাকায়। বিশেষ করে ৪, ৮, ১৪ ও ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের কিছু জায়গায।” পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রায় আড়াই হাজার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ত্রাণ চেয়ে আবেদন করেছে। মহকুমাশাসককে আবেদনপত্র পাঠানো হবে। জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জের পুরপ্রধান সিপিএমের শঙ্কর মণ্ডল বলেন, “বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে ক্ষয়-ক্ষতির খবর আসছে।’’ তবে এই পুর এলাকার মানুষ সেভাবে ত্রাণ পাননি। শঙ্করবাবু বলেন, ‘‘সামনে ভোট। তাই আদর্শ নির্বাচনী বিধি জারি রয়েছে। সে কারণে আমরা ত্রাণ দিতে পারছি না। বিরোধীদের কেউ কেউ আবার তা মানছে না।’’ একই অবস্থা লালগোলা ব্লকেরও। লালগোলার নশিপুর পঞ্চায়েত এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ লোক বাস করেন পাটকাঠির বেড়ার ঘরে। ঝড়ে ওই ঘর উড়ে গিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামবাসীদের মধ্যে মাসাদুল হক জানান, তাঁর টিনের চালা উড়ে গিয়েছে। এলাকার আম ও লিচু বাগান ব্যাপকভাবে ক্ষতি হয়েছে। অন্যদিকে কান্দিতে ঝড়ের সঙ্গে শিলাবৃষ্টিও হয়েছে। ফলে এলাকার বোরো চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বড়ঞা ব্লকের বড়ঞা-১ ও ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত, কল্যানপুর-১ ও ২ নম্বর গ্রাম পঞ্চায়েত, সুন্দরপুর ও বিপ্রশিখর গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে ব্যাপক শিলাবৃষ্টির জন্য ধান চাষে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এলাকার চাষি রাজেশ গুঁই, কার্তিক দাসদের দাবি, “আচমকা শিলাবৃষ্টির কারণে ধানের ফলন সেভাবে মিলবে না।” একই ভাবে ক্ষতি হবে গরমের সব্জিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা করছেন চাষিরা। শিলা বৃষ্টির জন্য পটল, ঝিঙে মতো সব্জির ক্ষতি হয়েছে বলে কৃষি দফতরের আধিকারিকদের দাবি। বড়ঞা ব্লকের কৃষি আধিকারিক রবিশঙ্কর দাস বলেন, “বোরো ধান ফলনের আগে এমন শিলাবৃষ্টির কারণে ধানের ফলন কমার আশঙ্কা রয়েছে। তবে বোরো চাষে কতটা ক্ষতি হয়েছে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না।’’

শুধু বাড়ি-ঘর তছনছ বা চাষের ক্ষতিই নয়, কালবৈশাখীর তাণ্ডবে জেলার বিভিন্ন এলাকার বিদ্যুৎ সংযোগও দীর্ঘক্ষণের জন্য ব্যাহত হয়েছে। গাছের ডাল বিদ্যুতের তারে ভেঙে পড়ায় মুর্শিদাবাদ ও জিয়াগঞ্জ-আজিমগঞ্জ পুর এলাকায় রবিবার সন্ধ্যাতেও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। জিয়াগঞ্জ শহর অন্ধকারে ডুবে রয়েছে।

অন্য দিকে নদিয়াতেও ঝ়ড়ে বেশ কিছু ঘর-বাড়ি ভেঙে প়ড়েছে। ক্ষতি হয়েছে চাষবাসেও। জেলার চাপড়া, নাকাশিপাড়া, কালীগঞ্জ প্রভৃতি ব্লকে ঝড়ের কারণে ক্ষতি হয়েছে। অনেক জায়গায় রবিবার বিকেল অবধি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল।