জাতীয় নাগরিক পঞ্জি নিয়ে আতঙ্ক থেকে মন্দা আর মূল্যবৃদ্ধি— খানিক হলেও খোয়া গিয়েছে বিজেপির পালের হাওয়া। সেই সুযোগে তৃণমূল হারানো জমি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা শুরু করেছে। আর তাতেই বেধে যাচ্ছে সংঘাত। হচ্ছে খুন-জখম। সাম্প্রতিক একের পর এক ঘটনায় তারই ইঙ্গিত মিলছে বলে রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা।  সোমবার রাতে হাঁসখালির ঘটনায় সেই তালিকাতেই নবতম সংযোজন। 

দাপুটে যুবনেতা সত্যজিৎ বিশ্বাসের হাত ধরে হাঁসখালি ব্লকে বিরোধীদের এক সময়ে পুরোপুরি কোণঠাসা করে ফেলেছিল তৃণমূল। পঞ্চায়েত ভোটে বেশির ভাগ আসনে অন্য কেউ প্রার্থী পর্যন্ত দিতে পারেনি। তৃণমূলেরই একাংশের অভিযোগ, শেষের দিকে সমাজবিরোধীদের উপরে বেশি নির্ভর করতে শুরু করেছিলেন কৃষ্ণগঞ্জের বিধায়ক সত্যজিৎ। গত ফেব্রুয়ারিতে সরস্বতী পুজোর আগের দিন বাড়ির কাছে পুজোমণ্ডপের সামনে তিনি খুন হওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যেতে থাকে। গোটা হাঁসখালি ব্লকে তৃণমূলের সাংগঠনিক দুর্বলতা প্রকট হয়। লোকসভা ভোটে এই এলাকায় কার্যত ভরাডুবি হয় তাদের। 

লোকসভা ভোটের ফল প্রকাশের দিন থেকেই হাঁসখালিতে একের পর এক তৃণমূল নেতাকর্মীর উপরে হামলার অভিযোগ উঠছিল বিজেপির বিরুদ্ধে। অনেকে এলাকাছাড়া হয়ে যান। নেতার অভাবে তৃণমূল কোনও প্রতিরোধই তৈরি  করতে পারছিল না। এই অবস্থা চলেছে শঙ্কর সিংহ দলের রানাঘাট সাংগঠনিক জেলা সভাপতি হওয়ার আগে পর্যন্ত। ক্ষমতা হাতে পাওয়ার পরে শঙ্কর হাঁসখালি ব্লককে আলাদা গুরুত্ব দিতে থাকেন। বদল আনা হয় ব্লক নেতৃত্বে। সত্যজিতের আমলে কোণঠাসা হয়ে যাওয়া পোড় খাওয়া নেতা তথা প্রাক্তন বিধায়ক ও জেলা পরিষদ সদস্য শশাঙ্ক বিশ্বাসকে ব্লক সভাপতি করে সংগঠনকে ঢেলে সাজার চেষ্টা করতে থাকেন শঙ্কর ও দলের নদিয়া জেলা পর্যবেক্ষক রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায়। তার জেরেই বিজেপির হাতে মার খাওয়া তৃণমূল নেতাকর্মীরা এখন ঘুরে দাঁড়িয়ে পাল্টা মার দেওয়ার চেষ্টা করছেন বলে অনেকের ধারণা।

 দিন কয়েক আগেই গাঁড়াপোতা এলাকায় বিজেপির কর্মীর বাড়িতে হামলা ও দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। শূন্যে গুলিও ছোড়া হয়। অভিযোগ, লোকসভা ভোটের পরে এলাকাছাড়া নেতারাই ওই হামলার সঙ্গে জড়িত। জয়পুরে এক তৃণমূল কর্মীর গুলিবিদ্ধ হওয়াটাও এই ক্ষমতার টানাপড়েনের জেরে বলেও দাবি অনেকের। 

লোকসভা ভোটে গোটা হাঁসখালি ব্লকে কার্যত ভরাডুবি হয়েছিল তৃণমূলের। সে সময়ে তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত জয়পুর গ্রামে সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি বিজেপি। কিন্তু তৃণমূলের একাংশ বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় জয়পুর গ্রামেও ধীরে ভারসাম্য পাল্টে যেতে থাকে। তা নিয়ে ভিতরে-ভিতরে গ্রামের পরিবেশ উত্তপ্ত হতে থাকে। ক্লাব দখল ঘিরে সেই উত্তেজনা প্রকাশ্যে চলে আসে। 

একটা জিনিস স্পষ্ট, রানাঘাট লোকসভা আসনে জয়ী হওয়ার পরে বিজেপি হাঁসখালি ব্লকে নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করেছে। আবার তৃণমূলও ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে আগামী দিনে হাঁসখালি ব্লকে পরিস্থিতি ঘোরালো হতে পারে আশঙ্কা জেলা পুলিশের একাংশেরও। 

তৃণমূলের রানাঘাট সাংগঠনিক জেলা সভাপতি শঙ্কর সিংহের দাবি, “বিজেপি প্রথম থেকেই সন্ত্রাস করে এলাকা দখল করতে চাইছে। সেই সুযোগে একদা সিপিএমের সঙ্গে থাকা সমাজবিরোধীরা বিজেপির ঝান্ডা দখল করেছে। বিজেপির নেতাদেরও নিয়ন্ত্রণে তারা নেই।” তৃণমূল কি ধোয়া তুলসীপাতা? শঙ্করের দাবি, “প্রাথমিক ধাক্কা সামলে আমাদের কর্মীরা ঘুরে দাঁড়াতেই বিজেপি মরিয়া হয়ে খুনের রাজনীতি শুরু করেছে।” 

রানাঘাট লোকসভা কেন্দ্রের বিজেপি সাংসদ জগন্নাথ সরকারের পাল্টা প্রতিক্রিয়া, “হতাশা থেকে ওরা এখন এ সব কথা বলছে। নিজেদের গোষ্ঠী কোন্দল সামলাতে না পেরে আমাদের উপরে দোষ দিচ্ছে।”