টাঙ্গাইল থেকে বেলাকোবা। স্বাধীনতার আগে যখন মানচিত্র টুকরো হতে যাচ্ছে, তখনই যোগসূত্র তৈরি হয়ে যায় এই দুই জনপদের। তখনও টাঙ্গাইল জেলা সদর হয়নি। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ায়, টাঙ্গাইলের ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের বসতি ছেড়ে পরিবার নিয়ে বেলাকোবায় চলে এসেছিলেন দুই বন্ধু। তাঁদের সঙ্গেই আসে পোড়াবাড়ির চমচমের ‘রহস্যময়’ রেসিপি। পরবর্তীতে যা কিনা বেলাকোবার চমচম হিসেবে খ্যাত হয়েছে। পাড়ি দিচ্ছে বিদেশেও। এই চমচমই এখন বেলাকোবার অন্যতম পরিচিতি।

এলাকাবাসীদের সূত্রেই জানা যায়, ময়মনসিংহের টাঙ্গাইলের ধলেশ্বরী নদীর ধারের পোড়াবাড়ির চমচমের খ্যাতি উনবিংশ শতাব্দীর গোড়া থেকেই ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। দেশভাগের সময় চমচম তৈরির সঙ্গে যুক্ত ধীরেন সরকার এবং কালীদাস দত্ত দু’জনে চলে আসেন বেলাকোবায়। রেল লাইন আড়াআড়ি ভাবে ভাগ করেছে বেলাকোবাকে। লাইনের দু’দিকে দুই বন্ধুর দু’টি চমচমের দোকান গড়ে ওঠে। পোড়া ইটের রং, উপরে ক্ষীরের দানা ছড়ানো এবং ভিতরে রসে টইটম্বুর। পোড়াবাড়ির চমচমের সব বৈশিষ্ট্যই থাকায় রসিকজনের স্বীকৃতি পেতেও সময় বেশি লাগেনি। পোড়াবাড়ির চমচম মানচিত্র টপকে পরিচিত হয় বেলাকোবার চমচম নামে।

গত বছরই তাঁদের দোকানের চমচম আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে বলে জানালেন বাদলবাবু। কালীদাস দত্তের ছেলে। অন্যদিকে, ধীরেন সরকারের ছেলে উদয়বাবু জানালেন কলকাতা তো বটেই রাজ্যের বাইরে এমনকী বিদেশে চমচম পাঠানোর জন্যও তাদের নিয়মিত মজবুত এবং সুন্দর প্যাকেট রাখতে হয়। দুই মিষ্টি ব্যবসায়ীর দাবির স্বীকৃতি রয়েছে ইন্টারনেটেও। গুগুল সন্ধানে শুধু বেলাকোবা লিখলে জনসংখ্যা, আয়তন, কবে রেল লাইন পাতা হয়েছিল সে সবের সংক্ষিপ্ত তথ্য ছাড়া আর কিছুই মেলে না।

কিন্তু, বেলাকোবার সঙ্গে চমচম শব্দটি জুড়ে দিলেই অন্তত ২০টি ‘পেজ’ খুলে যাবে। সেখানে চমচমের সুলুক সন্ধান, স্বাদের বৈশিষ্ট্য থেকে শুরু করে মিলবে সাহিত্য। কত গল্প, অনুগল্প, প্রবন্ধে বেলাকোবার চমচমের উল্লেখ্য রয়েছে তা জানিয়ে দেবে গুগুল। সে সব শুধু আগেকার রচনা নয়, একেবারে টাটকা গল্প যেগুলি শুধুই ব্লগে প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যেও বেলাকোবার চমচমের একাধিক প্রসঙ্গ জানা যেতে পারে মাউসের একটি ক্লিকেই। অর্থাৎ শুধু প্রবীণ লেখক নন, নতুন প্রজন্মের লেখকদের রচনাতেও বেলাকোবার চমচমের উল্লেখ্য দেখা যাবে। যে ঘটনা, আধুনিক প্রজন্মের কাছেও এই মিষ্টির কদর যে রয়েছে তার, ‘ই-প্রমাণ’ হিসেবে বলা যেতে পারে।

কী রহস্য রয়েছে, যার কারণে অনান্য চমচমের সঙ্গে এক পাত্রে না বসে, কুলীন রয়ে গেল বেলাকোবা?

ধীরেনবাবুর ছেলে উদয়বাবু জানালেন, তৈরির শুরু থেকেই অন্য মিষ্টির সঙ্গে চমচমের পার্থক্যটা শুরু হয়ে যায়। চমচমের জন্য গ্রাম থেকে দুধ সংগ্রহ করে আনেন তিনি। খাঁটি ঘন দুধ ছাড়া চমচম তৈরি-ই হবে না। যে গরু দুধ দিচ্ছে, তার খাওয়া দাওয়াও পুষ্টিকর হওয়া চাই, তাতেই মিলবে খাঁটি দুধ। উদয়বাবুর আক্ষেপ, “আজকার গরুকে ইঞ্জেকশন দেওয়া সহ নানা পদ্ধতিতে দুধের পরিমাণ বাড়ানো হয়। সেই দুধ আর কোথায়। তবে যা পাই, তা দিয়েই কাজ চালাতে হয়। তাই গ্রাম থেকে খুঁজে দুধ নিয়ে আসি।”

শুধু দুধ জোগাড় করলেই হল না, আসল রহস্য নাকি রয়েছে, ছানা-তে। বাদলবাবুর কাছে শোনা গেল সেই কাহিনি। দুধের থেকে ছানা তৈরি হওয়ার পরে, গরম ছানাকে জল ঝরানোর জন্য ঝুলিয়ে রাখতে হয়। কিছু পরে হাত দিয়ে দেখতে হয় ছানা কতটা ঠান্ডা হল। খুব গরম নয়, আবার খুব ঠান্ডাও নয় এমনই এক মুহূর্তে ছানা দিয়ে তৈরি হয় চমচম। যার ফলেই নাকি বেলাকোবার চমচম ভাঙলেই মৌমাছির চাকের মতো অসংখ্যা ঘর দেখা যায়। তবে কতটা গরম কতটা ঠাণ্ডা, সেই রহস্য অবশ্য বাদলবাবু ভাঙেননি। সেটা নাকি ‘অভিজ্ঞতা’য় গাঁথা আছে। চমচম তৈরির পরে রসে কড়া পাক দিতে হয়। বাদলবাবুর কথায়, “সারা রাত চমচমকে রস খাওয়াতে হয়। না হলে ভিতরে রস ঢুকবে না। চমচমে কামড় বসালেই যে রসস্রোত মুখে ছড়িয়ে পড়ে, তার পেছনে কিন্তু পরিশ্রম অনেক।”

এ হেন জনপ্রিয় চমচম অনাদরেই রয়ে গেল বলে আক্ষেপ বেলাকোবার বাসিন্দাদের। চমচমকে হাত ধরে অর্থনীতির ঘুরে দাঁড়ানোর কথা কেউ না ভাবলেও, বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, সরকারি সাহায্য মিললে ‘প্যাকেজিং’ করে কিছুটা হয়ত চাঙ্গা হতো, অর্থনীতি, সুযোগ হত কর্মসংস্থানেরও। বাদলবাবুর যুবক ছেলে প্রাথমিক শিক্ষক লিটন হাতের স্মার্টফোন নড়াচড়া করতে করতে বলল, “অনেক বন্ধুরাই বলে জলপাইগুড়ি, শিলিগুড়ি বা অন্যত্র চমচমের আউটলেট খোলা যায় কিনা। সরকারি সাহায্য পেলে তা হয়ত ভেবে দেখা যেত।” তবে শুধু চমচম নয়, বেলাকোবার বেশ কিছু শিল্প-সম্ভাবনা অনাদরেই থেকে গেল বলে বাসিন্দাদের আক্ষেপ।

 

(চলবে)