ইউনেস্কোর কাছ থেকে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া দার্জিলিঙের টয় ট্রেনের বারেবারেই নানা বিভ্রাট ঘটছে। কখনও বেলাইন হচ্ছে ট্রেন। নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়ে ট্রেন থেকে লাফিয়ে প্রাণও হারিয়েছেন পর্যটক। টয় ট্রেন ভালবাসেন যে স্বেচ্ছাসেবীরা, তাঁরাও শঙ্কিত। তাঁদের আশঙ্কা, এমন চললে ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ স্বীকৃতি বিপন্ন হতে পারে।

দার্জিলিং হিমালয়ান রেলের (ডিএইচআর) সহকারি ডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়র বসন্ত রায় দিওয়ালি বলেন, “টয় ট্রেনের লাইন ঠিক রাখতে লাগাতার কাজ করা হচ্ছে। তাতে টয় ট্রেনের বেলাইন হওয়ার আশঙ্কা একেবারেই কমে গিয়েছে। পর্যটকেরা নিরাপদেই ঘুরতে পারবেন।”

চার বছর ধরে ৫৫ নম্বর জাতীয় সড়ক মেরামতির জন্য শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং পর্যন্ত নিয়মিত টয় ট্রেন বন্ধ। শুধুমাত্র দার্জিলিং থেকে ঘুম (জয় রাইড), শিলিগুড়ি থেকে গয়াবাড়ি অবধি (জঙ্গল রাইড) চলে। এ ছাড়া কার্শিয়াং ও দার্জিলিঙের মধ্যে একটি প্যাসেঞ্জার ট্রেন চলে। গত ২৬ জানুয়ারি চুনাভাটিতে ট্রেনের গতি বাড়ায় তা থেকে লাফ দিয়ে মৃত্যু হয় কলকাতার বেলেঘাটার পর্যটক মলি রায়ের। এয়ারব্রেক দেরিতে ধরায় ওই বিপত্তি বলে রেল সূত্রের খবর। আরও তিনজন ঝাঁপিয়ে জখম হন। এর পরের দুই দিনও টুং এলাকায় প্যাসেঞ্জার ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি টয় ট্রেনের চাকায় গলদ ধরা পড়ে। শিলিগুড়ির অদূরেই ট্রেনটি থামিয়ে ত্রুটি শুধরে নেওয়া হয়। সেই ট্রেনে ছিলেন নিউজিল্যান্ডের পর্যটকদের একটি দল।

ট্যুর অপারেটরদের সূত্রের খবর, ফেব্রুয়ারির শেষে দার্জিলিং আসার কথা রয়েছে ১৬ জনের একটি ব্রিটিশ পর্যটক দলের। তেমনই মার্চে গরমে শৈলশহরে আসছেন তাইল্যান্ডের ১০০ জনের  একটি দল। ইন্টারনেটে টয় ট্রেন সম্পর্কে খোঁজ নিতে গিয়ে উদ্বিগ্ন হয়েছেন অনেকেই। কয়েকজন খোঁজ নিয়েছেন, ‘টয়ট্রেন চড়া কী আগের মত সুরক্ষিত?’ জিটিএ কর্তৃপক্ষ থেকে শুরু করে দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ে (ডিএইচআর) সাপোর্ট গ্রুপও যথাসাধ্য পর্যটকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছেন। যাতে ১৯৯৯ সালে পাওয়া ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ’ শিরোপা অক্ষুণ্ণ থাকে।

রাজ্য পর্যটন দফতরের যুগ্ম অধিকর্তা (নর্থ) সুনীল অগ্রবাল বলেন, “টয় ট্রেনে যা চলছে, তাতে পর্যটকদের উপরে একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এটা একেবারেই কাম্য নয়। রেলের অফিসারদের বাড়তি গুরুত্ব দিতে বলেছি।” পাহাড়ের জিটিএ পর্যটন দফতরের এক্সিকিউটিভ ডাইরেক্টর সোনাম ভুটিয়া বলেন, “রেলকে ব্যবস্থা নিতে বলছি।”

ডিএইচআর ইন্ডিয়া সাপোর্ট গ্রুপের সেক্রেটারি জেনারেল রাজ বসু বলেন, “টয়ট্রেনের ইতিহাস, ঐতিহ্য ধুলোয় মিশতে দেওয়া যায় না। নিয়মিত টয় ট্রেনের লাইনে নজরদারি দরকার। লাইনের দু’পাশে জবরদখল যেভাবে হয়েছে, তাতে লোকালয়ে কোনও দিন দুর্ঘটনা ঘটলে তো মারাত্মক ঘটনা ঘটে যাবে। রেলকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলে চিঠিও দিয়েছি। পর্যটন মহলে খারাপ বার্তা যাচ্ছে।” ইস্টার্ন হিমালয়ান ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশনের  কার্যকরী সভাপতি সম্রাট সান্যাল জানান, রেল কর্তৃপক্ষকে সব জানিয়ে চিঠি দেওয়া হবে।

১৮৭৯ সালে দার্জিলিং স্টিম ট্রামওয়ে কোম্পানির নতুন ট্রেন হিসেবে টয়ট্রেনের আত্মপ্রকাশ। পরে ডিএইচআর কোম্পানি মাধ্যমে ১৯৪৮ সালে রেলের হাতে যায়। একসময় রাস্তার জন্য যাত্রা বন্ধ থাকায় বিশ্ববিখ্যাত টয়ট্রেন তার গৌরব ওর্য়াল্ড হেরিটেজ হারাতে বসে। পরে জয় রাইডগুলি চালু করে তা সামাল দেয় রেল। উত্তর পূর্ব সীমান্ত রেলের মুখ্য জনসংযোগ আধিকারিক সুগত লাহিড়ী বলেন, “আমরা টয়ট্রেন নিয়ে সব সময় সক্রিয়। যা ঘটেছে সেগুলি বিক্ষিপ্ত ঘটনা। তদন্ত হচ্ছে। রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে কোনও সমস্যা নেই। তবে জবর দখলের দিকটা দেখা হচ্ছে। আইন মেনে পদক্ষেপ করা হবে।”

দার্জিলিং অ্যাসোসিয়েশন ফর ট্যুর এজেন্টসের সাধারণ সম্পাদক প্রদীপ লামা জানান, টয় ট্রেনে যদি নিরাপত্তা না থাকে, তা হলে বহু পর্যটক দার্জিলিং থেকে মুখ ফেরাবেন। রেলকে সেটা জানানো হয়েছে। টয়ট্রেন প্রেমীরা হিমালয়ান রেলওয়ে ফোরাম গড়েছেন ২০০৮ সালে। তাঁরা জানান, রেল বোর্ডকে সব জানানো হয়েছে। দার্জিলিঙের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার ভরত প্রকাশ রাইয়ের মতে, “নিয়মিত লাইন দেখভাল হয় না বলেই বেলাইন হওয়ার ঘটনা ঘটে। এখনও ডিএইআর কর্তৃপক্ষের টনক না নড়লে ওয়াল্ড হেরিটেজ ঐতিহ্য হাতছাড়া হতে পারে।”