বেশ কিছু দিন ধরে কেরলে কাজ করছিলেন। সেখান থেকে গ্রামে ফেরার পথে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে প্রচণ্ড মারধর খেলেন ঘোকসাডাঙার পুর্ব মুকুলডাঙা গ্রামের দিলীপ বর্মন ও বিনোদ বর্মন ও তাঁদের পাশের গ্রামের তিন বন্ধু। এই ঘটনায় উদ্বেগ বেড়েছে প্রশাসনের। গুজব এতটাই শক্তিবৃদ্ধি করেছে যে, এলাকার খুবই পরিচিত মুখও অনেকদিন পরে ফিরলে তাঁকেও নিস্তার দেওয়া হচ্ছে না।

দিলীপবাবুরা জানিয়েছেন, তাঁরা পরিচয়পত্র দেখানোরও সুযোগ পাননি। যেখানে মারধর করা হয়েছে, সেখানকার কিছু বাসিন্দার কথায়, দিলীপবাবুরা ওই এলাকা থেকে তিন চার কিলোমিটার দূরের একটি গ্রামের বাসিন্দা। তাই তাঁদের সকলে চেনেন না। পুলিশ অবশ্য জানিয়েছে, পরে কিছু লোক দিলীপবাবুদের চিনতে পারেন। তবে তার আগেই দিলীপবাবুদের গাড়ির চালক তাঁদের ইউনিয়নের লোকজনকে ফোন করলে তাঁরা এসে মারধরে বাধা দেন। ততক্ষণে অবশ্য সকলেই গুরুতর জখম হয়ে গিয়েছেন। এই ঘটনায় পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। প্রহৃত চার জনকে ফালাকাটা হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

গ্রামে সচেতনতা বাড়াতে মাইকে প্রচার শুরু করেছে পুলিশ। কিন্তু পাশের জেলার ধূপগুড়িতেই ছেলেধরার গুজবকে কেন্দ্র করে মাত্র আট-নয় দিনের ব্যবধানে পরপর তিনটি গণপিটুনির ঘটনার পরে প্রশ্ন উঠেছে, প্রশাসন কতটা তৎপর? বারোঘড়িয়ার ঘটনাতে পুলিশ পাঁচ জনকে গ্রেফতার করেছে। ঘটনায় মূল অভিযুক্ত জলপাইগুড়ির বিজেপির জেলা সম্পাদিকা তারামণি রায় এখনও অধরা। তবে জেলা সভাপতি দেবাশিস চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘তারামণি মোটেই মারধরে ইন্ধন দেননি। তিনি ছেলেধরা সন্দেহে প্রহৃতকে বাঁচাতে গিয়েছিলেন।’’

ভাঙচুর গাড়ি। নিজস্ব চিত্র

সোমবার দুপুরে ধূপগুড়ির ঝারআলতা ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাউকিমারিতে গণপিটুনির ঘটনাতে কেউ এখনও গ্রেফতার হয়নি। মঙ্গলবার গাদং ২ গ্রাম পঞ্চায়েতের পশ্চিম শালবাড়িতে ছেলেধরার গুজব ছড়ানোর পর গ্রামবাসীদের হাতে চার যুবকের আটক হওয়ার ঘটনাতেও মামলা করেনি পুলিশ। অথচ গণপিটুনি সংক্রান্ত একটি মামলায় ১৭ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট যে নির্দেশিকা দিয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে গণপিটুনির ঘটনায় পুলিশকে দ্রুত এফআইআর করতে হবে। এ ছাড়া সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘৃণা বা বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার করা হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ পুলিশের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করার নির্দেশও দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

ওই নির্দেশিকা ইতিমধ্যে পুলিশের কাছেও পৌঁছেছে। ধূপগুড়ি থানার আইসি সঞ্জয় দত্ত বলেন, ‘‘বারোঘড়িয়ায় ভিডিও ফুটেজ থেকে অপরাধীদের চিহ্নিত করা সহজ হয়েছিল। কিন্তু ডাউকিমারি বা পশ্চিম শালবাড়িতে যারা গুজব ছড়িয়েছিল বা মারধর করেছিল তাদের এখনও চিহ্নিত করার কাজ চলছে।’’ তবে পুলিশ জানিয়েছে ডাউকিমারির ঘটনায় পাঁচজনকে মূল অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রায় কুড়ি জনকে অপরাধে যুক্ত সন্দেহে চিহ্নিত করা হয়েছে।

 

১৬ জুলাই

 

কোথায়: বারোঘরিয়া পঞ্চায়েতের বটতলায় এক মানসিক ভারসাম্যহীন মহিলাকে গণপিটুনি। মারের জেরে তার মাথা ফেটে

কী ব্যবস্থা: এলাকার বিজেপির জেলা সম্পাদিকা তারামণি রায় সহ সাত জনের নামে মামলা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া গণপিটুনির একটি ভিডিও দেখে আরও ৩০ জনের নামে মামলা দায়ের।  ভারতীয় দন্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩২৫ ও ৩০৮ ধারায় মামলা হয়। ঘটনায় মোট পাঁচজন গ্রেফতার হয়। এখনও ফেরার তারামণি রায়।

২৩ জুলাই

কোথায়: ধূপগুড়ির ঝাড়আলতা ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের ডাউকিমারি বাজারে ছেলেধরা সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে আটক চার মহিলা। অভিযোগ, বিবস্ত্র করে মারধর করা হয় এক মহিলাকে। 

কী ব্যবস্থা: উদ্ধার হওয়া মহিলাদের কথা বার্তায় অসঙ্গতি থাকায় চোর সন্দেহে তাদের গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে মারধরের ঘটনায় মোট ২৫ জনের নামে মামলা দায়ের করে পুলিশ। ভারতীয় দন্ডবিধির ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩২৫, ৩০৮, ৩৫৪ ধারায় মামল দায়ের করা হয়। এখনও পর্যন্ত মারধরকারীদের গ্রেফতার করা হয়নি।

২৪ জুলাই

কোথায়: ধূপগুড়ির গাদং ২ পঞ্চায়েতের পশ্চিম শালবাড়িতে। বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করতে এসে ছেলেধরা সন্দেহে গ্রামবাসীর হাতে আটক অসমের এক যুবক ও তাঁর তিন সঙ্গী।

কী ব্যবস্থা: পুলিশের দাবি, আটক করলেও মারধর করা হয়নি। কারও বিরুদ্ধেই মামলা দায়ের করেনি পুলিশ। পুলিশের দাবি, সচেতনতার জেরেই তাদের ধরা হলেও মারধর করা হয়নি।

২৫ জুলাই

কোথায়: কেরল থেকে কাজ করে বাড়ি ফেরার পথে ধূপগুড়িতে ভোরে ট্রেন থেকে নেমে যাচ্ছিলেন পাঁচ জন। মাথাভাঙার ঘোকসাডাঙায় ছেলেধরা সন্দেহে মারধর তাঁদের। ওই এলাকা থেকে মাত্র তিন-চার কিলোমিটার দূরে তাঁদের বাড়ি হলেও মারধর থেকে নিস্তার মেলেনি।

কী ব্যবস্থা: পুলিশ দু’জনকে গ্রেফতার করেছে। গ্রােম সচেতনতা বাড়াতে মাইকে প্রচার করেছে পুলিশ। তবে প্রায় প্রতিদিন এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় পুলিশি ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জলপাইগু়ড়ি জেলা পুলিশের হেল্পলাইন: ০৩৫৬১-২৩০৭২৫

হোয়াটসঅ্যাপ: ৯৭৭৫১৫০০০১