এর আগেও অনেক বার পাহাড়ে বন্‌ধ হয়েছে, আগুন জ্বলেছে। কখনও আলাদা রাজ্যের দাবিতে, কখনও ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে পাহাড়ের দলগুলি একযোগে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করেছে। তবে শুক্রবারের বন্‌ধ সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। চা বাগান শ্রমিকদের বোনাসের দাবিতে এর আগে পাহাড়ের সব দল এক হয়ে কখনও বন্‌ধ ডেকেছে কিনা, মনে করতে পারল না বাগান মালিকদের একাংশ। শ্রমিক নেতারাও বলছেন, চা বাগানকে কেন্দ্র করে পাহাড়ে সব দলের এক হওয়া এই প্রথম। বিনয়পন্থী মোর্চা, তৃণমূল, সিপিএম, হিল কংগ্রেস, জাপ, গোর্খা লিগ, সিপিআরএম— এই সাত দল যৌথ ভাবে অনশন, বিক্ষোভ করছে। অনশন মঞ্চে উপস্থিত হয়ে আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়েছেন জিএনএলএফ সভাপতি মন ঘিসিং। মঞ্চে উপস্থিত না হলেও আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে শ্রমিকদের পাশে থাকার বার্তা দিয়েছেন বিমলপন্থী মোর্চার মুখপাত্র বিপি বজগাই। পাহাড়ের সব দল এক হলেও আন্দোলনে ‘নেই’ শুধুমাত্র বিজেপি। দার্জিলিঙের সাংসদ ও বিধায়ক দুজনেই যে দলের, সেই দল আন্দোলনে না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন অন্যরা। বিজেপির ভূমিকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চা শ্রমিকদের একটা বড় অংশ।

দিল্লি থেকে বুধবার শিলিগুড়িতে এসেছেন দার্জিলিঙের সাংসদ রাজু বিস্তা। বৃহস্পতিবার থেকে বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ পরিদর্শন করছেন তিনি। একাধিক পুজোর উদ্বোধনও করেছেন। সাংসদের শিলিগুড়ি আসার আগে থেকেই পাহাড়ের বোনাস নিয়ে সমস্যা চলছে। ইতিমধ্যে আন্দোলনও শুরু হয়েছে। তা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত কেন তিনি পাহাড়ে গেলেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। বিনয় তামাং বলেন, ‘‘উনি (রাজু বিস্তা) আগের বিজেপি সাংসদদের মতোই সমস্যা দেখলে পালিয়ে যান, আর দিল্লিতে বসে থেকে চিঠি লেখেন। শিলিগুড়ি থেকে দার্জিলিং যেতে ৩ ঘণ্টাও লাগে না। অথচ ওঁর কাছে সেই সময়টুকু নেই!’’ রাজুকে কটাক্ষ করে বিনয় আরও বলেন, ‘‘তিনি পুজোর আনন্দে মেতে আছেন। যে শ্রমিকরা তাঁকে ভোট দিয়ে জয়ী করেছেন, তাঁরা দুর্দিনে সাহায্য পাচ্ছেন না।’’ 

বিজেপির পাহাড় কমিটির সভাপতি মনোজ দেওয়ান বলেন, ‘‘দলের সাংসদ, বিধায়ক দু’জনেই চা শ্রমিকদের পাশে আছেন। আমরাও চাই শ্রমিকরা ২০ শতাংশ হারেই বোনাস পাক। আন্দোলনকে সমর্থন করছি। পাহাড়ে এখন পর্যন্ত আমাদের কোনও চা শ্রমিক সংগঠন তৈরি হয়নি। তাই আমরা শ্রমিক আন্দোলন থেকে পিছিয়ে আছি।’’  

পাহাড়ের ভোটারদের একটা বড় অংশ চা বাগান শ্রমিক। তাই তাদের সমস্যাকে ‘অবহেলা’ করতে চায়নি কোন দলই। গুরুত্ব বুঝে আগেই অনশনে বসার হুমকি দিয়ে রেখেছেন বিনয় তামাং। বিভিন্ন সভায় তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেছেন তাঁরা বন্‌ধের বিরোধী। তা সত্ত্বেও চা শ্রমিকদের বনধের আন্দোলনে শামিল হয়েছে তৃণমূল। দলের পাহাড় কমিটির সভাপতি লাল বাহাদুর রাই বলেন, ‘‘শ্রমিকদের দাবিকে উপেক্ষা করা যায় না। তাদের স্বার্থেই আমরা আন্দোলনে নেমেছি।’’ বিমলপন্থী মোর্চা ও জিএনএলএফ বিজেপির জোট সঙ্গী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সরাসরি দুই দলের নেতারা আন্দোলনে যোগ না দিলেও তাঁরা আন্দোলনকে সমর্থন করতে একপ্রকার বাধ্য হয়েছেন। চা শ্রমিকদের স্বার্থে একজোট হয়ে আন্দোলন পাহাড়ের রাজনীতিকে নতুন দিশা দেখাবে বলেই মনে করেছেন সিপিএম নেতা সমন পাঠক। 

তবে পাহাড়ে বন্‌ধের ফলে নতুন গোলমাল শুরু হবে কিনা, সেই আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে। পর্যটনমন্ত্রী গৌতম দেব বলেন, ‘‘চা বাগানের বোনাস সমস্যা সুষ্টু আলোচনায় মিটুক, সরকার প্রথম থেকেই সেই চেষ্টা করছে। কিন্তু ভরা পর্যটনের মরসুমে এ ভাবে বন্‌ধ করাটাকে সমর্থন করি না। এর ফলে পাহাড় সম্পর্কে ভূল বার্তা যাচ্ছে।’’