বাড়িতেই বাবার বইয়ের দোকান। শৈশব থেকে সেই বইয়ের স্তূপে বসেই  ‘বর্ণপরিচয়’-এর স্রষ্টার সঙ্গে পরিচয়। সেই পরিচয়ের পথ পেরিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি আগ্রহ সেই বইঘরে বসেই। বইয়ের সঙ্গে সখ্যের শুরু সেই ছোটবেলা থেকেই। সেই সখ্যই যেন পূর্ণতা পেল বৃহস্পতিবার। এ বছরের মাদ্রাসা বোর্ডের পরীক্ষায় (মাধ্যমিক সমতুল) মালদহ জেলায় প্রথম হয়েছে সামসি রতনপুরের রৌনক জহান। ৮০০ নম্বরের মধ্যে ৭৫৬ পেয়ে রাজ্যের নিরিখে যুগ্ম ভাবে তৃতীয় হয়েছে সে। 

অথচ রৌনক যেখানে পড়াশোনা করেছে, সামসির মোতিগঞ্জ এলাকার সেই বেসরকারি মাহাদ মাদ্রাসা আজও সরকারি অনুমোদন পায়নি। তাই চাঁচলের চান্দুয়া দামাইপুর হাই মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষা দিয়েছিল সে। বাংলায় সে পেয়েছে ৯১, ইংরেজি ৯০, অঙ্ক ৯৯, ভৌতবিজ্ঞান ৯৭, জীবনবিজ্ঞান ৯৭, ইতিহাস ৯৩, ভূগোল ৯২ ও ইসলাম পরিচয়ে ১০০। এ হেন রৌনককে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে মালদহের সামসিতে তার বাড়িতে, স্কুলে, পাড়ায়। মা অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, বাবা বই বিক্রেতা মহম্মদ । রৌনকের বক্তব্য, তার এই সাফল্যের পিছনে যেমন বইয়ের সঙ্গে আশৈশব সখ্য রয়েছে, তেমনি তাতে মায়ের অবদানও কম নয়। তাই এ দিন নিজের যাবতীয় কৃতিত্ব মা নার্গিস পারভিনকেই দিতে চেয়েছে মেয়ে। তবে বাবা ও স্কুল শিক্ষকদের অবদানও কম নয় বলে তার সংযোজন।

এ দিন রতনপুরের নজরুলপল্লির বাড়িতে বসে রৌনক জানাল, এত ভাল ফল হবে, তা অবশ্য সে ভাবেনি। তবে ভাল ফল করার একটা জেদ ছিল বরাবর। তার একজন মাত্র গৃহশিক্ষক ছিল। তিনি অঙ্ক ও ভৌত বিজ্ঞান পড়াতেন। বাকি সব বিষয় নিজেই পড়েছে। নিজের প্রতি এত আস্থা ছিল? একটু হেসে রৌনক জানাল, বইয়ে সে মোটেই ভয় পায় না কোনওদিনই। হয়তো এটা ছোটবেলা থেকেই বইয়ের প্রতি তার স্বভাব-ঘনিষ্ঠতার জের। তাই অঙ্ক আর ভৌতবজ্ঞান ছাড়া অন্য বিষয়গুলো সে নিজেই সামলে নিতে পেরেছে। বাড়ির সামনে একতলায় বইয়ের দোকান রয়েছে বাবা মহম্মদ রেজাউল্লার। তবে এখন পাঠ্যবই ছাড়া গল্পের বইয়ের তেমন কদর নেই, জানাচ্ছেন রেজাউল্লা। তবে অবসর সময়ে গল্পের বই পড়া ছাড়া অন্য কোনও শখ নেই রৌনকের। রবীন্দ্রনাথ তার প্রিয় লেখক ও কবি।    

রৌনকের ফল বেরোনোর দু’দিন আগেই কলকাতার কলেজে বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার ঘটনা। বর্ণপরিচয়ের স্রষ্টার মূর্তি ভাঙা নিয়ে রাজ্য জুড়েই হইচই, ধিক্কার চলছে। কথায় কথায় সে-প্রসঙ্গ উঠতেই রৌনকের বাবা রেজাউল্লা বললেন, ‘‘মেয়ে ভাল ফল করায় আমরা গর্বিত, আনন্দিত। কিন্তু যার হাত ধরে শুধু মেয়ে কেন, আমারও হাতেখড়ি তার মূর্তি যে কেউ ভাঙতে পারে, তা ভাবতেই পারছি না। এটা আমাদের সংস্কৃতির পরিপন্থী।’’ কলকাতার ওই ঘটনা যে কখনওই ঘটা উচিত নয়, তা জানিয়েছে রৌনকও। ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চায় সে। এলাকার মানুষের দুর্দশা ঘোঁচাতে চিকিৎসক হয়ে নিজের এলাকাতেই মানুষের সেবা করতে চায় সে। এর মধ্যেই উলুবেড়িয়া আল আমিন মিশনে বিজ্ঞান নিয়ে ভর্তি হয়ে গিয়েছে সে। 

মোতিগঞ্জ মাহাদ মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক আব্দুল ওয়াহাব ও চান্দুয়া দামাইপুর হাই মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মীর মদম্মদ মুশারাফ হোসেন একসঙ্গেই জানালেন, রৌনক তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম বাড়িয়েছে। তার ফলাফলে তাঁরা গর্বিত।