জলদাপাড়ায় গন্ডার খুনের ঘটনায় কি উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনও রাজ্যের চোরাশিকারিরা জড়িত? গন্ডারকে গুলি করার ধরন দেখে এমনটাই সন্দেহ করছেন বনকর্তাদের একাংশ। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়েছে স্থানীয় দু’জনকে।

গন্ডার নিধনের ঘটনাতেও খোঁজখবর শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো। তবে আপাতত গোটা ঘটনার তদন্তভার হাতে রেখেছে রাজ্য বন দফতরই। কেন্দ্রীয় সরকারি ব্যুরো সূত্রের দাবি, এক দশক আগেও অসমে কাজিরাঙায় পরপর গন্ডার শিকার হয়েছিল। তার পরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন দফতরের কড়াকড়ি বেড়েছে। তখন থেকেই তরাই-ডুয়ার্সের জঙ্গলে নজর পড়ে চোরাশিকারিদের।

বন দফতর সূত্রের খবর, মূলত মণিপুর ও নাগাল্যান্ডের চোরাকারবারিরা এই অঞ্চলে ঢুকছে। মাসখানেক আগেও মণিপুরের এক পুলিশকর্মী গন্ডারের খড়্গ-সহ ধরা পড়ে। আগেও উত্তর-পূর্বের বহু চোরাকারবারি গন্ডারের খড়্গ পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছে।

চলছে চোরাশিকার

সাম্প্রতিককালে গন্ডার নিধন

অক্টোবর ২০১৪: গরুমারার ধূপঝোরা বিটে গন্ডারের দেহ উদ্ধার। গন্ডারটিকে খুন করা হয় বলে দাবি।

জুলাই ২০১৫: জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের চিলাপাতা রেঞ্জে গন্ডার হত্যা হয়। গন্ডারের মৃতদেহ থেকে খড়্গ পাওয়া যায়নি।

এপ্রিল ২০১৭: গরুমারার গরাতি বিটে জোড়া গন্ডারের দেহ উদ্ধার। লোপাট খড়গ।

ফেব্রুয়ারি ২০১৮: জলদাপাড়ার কোদালবস্তির জঙ্গলে একটি গন্ডারকে খুন করা হয়।

ডিসেম্বর ২০১৮: গরুমারায় গন্ডারের দেহ উদ্ধার। খুন করার পরে খড়গ কেটে নেওয়া হয়।

অক্টোবর ২০১৯: জলপাড়ায় গুলি করে গন্ডার খুন। লোপাট খড়্গ।

তবে এই ঘটনায় স্থানীয় কেউ কেউ যে যুক্ত, সে ব্যাপারেও নিশ্চিত তাঁরা। বন দফতর সূত্রের খবর, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে ফালাকাটার উমাচরপুর গ্রামের বাসিন্দা শ্যামল সুবা নামে হলং-এর কাছে একটি রিসর্টের কর্মী ও শেখর কার্জী নামে আর এক জনকে জলদাপাড়া জঙ্গল লাগোয়া খাউচাঁদপাড়া এলাকা থেকে গ্রেফতার করেছে বন দফতর। তবে চক্রের মূল পাণ্ডারা অবশ্য এখনও অধরা। উদ্ধার হয়নি গন্ডারের খড়্গও।

বন দফতর সূত্রে খবর, শ্যামলকে এর আগেও গন্ডার চোরাশিকারের ঘটনায় গ্রেফতার করেছিল বন দফতর। দুই বছর জেলও খাটেন তিনি। এ দিন আদালত চত্বরে শ্যামল অবশ্য দাবি করেন, ঘটনার দিন তিনি রিসর্টেই ছিলেন, গন্ডার খুনের ঘটনাও তাঁর জানা নেই। রাজ্যের প্রধান মুখ্য বনপাল রবিকান্ত সিনহা জানিয়েছেন, ধৃতদের জেরা করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার ভোরে জলদাপাড়া উত্তর রেঞ্জের ৫০ ফুট বিটের জঙ্গল থেকে পূর্ণবয়স্ক একটি স্ত্রী গন্ডারের দেহ উদ্ধার করেন বনকর্মীরা। যার খড়্গটি ধারাল অস্ত্র দিয়ে কেটে পালিয়েছিল চোরাশিকারীরা। বন দফতরের কর্তাদের কথায়, বুধবার বিকালে ওই এলাকাতে দুটি গুলির শব্দ পাওয়া গিয়েছিল। তার পরে তল্লাশি শুরু হয়। গন্ডারের দেহ মেলে।

গন্ডারের মাথায় ও শরীরের এক পাশে দু’টি গুলির ক্ষত চিহ্ন পাওয়া গিয়েছে। সেই ক্ষত চিহ্ন থেকে দেখে বন দফতরের কর্তারা নিশ্চিত খুব কাছ থেকে গন্ডারটিকে গুলি করা হয়েছে। গন্ডার নিধনের ঘটনাতেও খোঁজখবর শুরু করেছে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ব্যুরো। তবে আপাতত গোটা ঘটনার তদন্তভার হাতে রেখেছে রাজ্য বন দফতরই।  বনকর্তাদের একাংশ রাজ্যের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের নিরাপত্তার ফাঁকফোকর নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্য, উত্তরবঙ্গের জঙ্গলে গন্ডার যেমন বেড়েছে, তেমনই নজরদারির ফাঁক তৈরি হয়েছে। তার পিছনে মূল দায়ী নিচুতলার কর্মী সঙ্কট।

    (সহ প্রতিবেদন: পার্থ চক্রবর্তী)