• নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

কখনও হাল না ছাড়ার মন্ত্রে জীবনযুদ্ধে সফল

kajol
অবিচল: আলিপুরদুয়ারে নিজের ঘরে কাজলকান্তি সাহা। নিজস্ব চিত্র

শৈশবে ভাঙাচোরা কাঠের ছোট্ট একটা ঘর থেকে লড়াইটা শুরু হয়েছিল তাঁর৷ যে ঘর থেকে জেলার প্রশসানিক ভবনটির দূরত্ব মাত্র কয়েকশো মিটার৷ কিন্তু সামান্য দূরত্বে থাকা ঝা চকচকে সেই বাড়িটিতে পৌঁছতে কম লড়াই করতে হয়নি তাঁকে৷ তার জন্য কিশোর অবস্থাতেই কখনও পড়াশোনা চালাতে ছাত্র পড়িয়েছেন, কখনও বা মামাদের সঙ্গে কাপড় নিয়ে হাটে যেতে হয়েছে৷ একটা বড় সময় নিজেই ঘুড়ি তৈরি করতেন বাড়িতে বসে। আর প্রতিদিন বাজারে গিয়ে সেই ঘুড়ি বিক্রি করেছেন তিনি৷ তবুও হাল ছাড়েনি সে দিনের সেই ছেলেটি৷

ভাঙাচোরা কাঠের ঘরে বড় হওয়া সেই কিশোর এখন মধ্য বয়সে পৌঁছে গিয়েছেন৷ কর্মক্ষেত্রে বসতে হয় সেই ঝা চকচকে প্রশাসনিক ভবনের ছ’তলার সাজানো অফিসে৷ নিজের অফিসের জানালা দিয়ে নিজের শৈশবে হারিয়ে গেলেন সেদিনের সেই ঘুড়ি বিক্রেতা, “পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেন, হাল ছাড়া চলবে না৷ তাহলে সাফল্য আসতে বাধ্য৷” তিনি কাজলকান্তি সাহা। যে আলিপুরদুয়ারে তাঁর জন্ম, বড় হওয়া, আজ সেই জেলাতেই অতিরিক্ত জেলাশাসকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি৷

তবে তাঁর আসল বাড়ি অবশ্য অসমের গৌরীপুরে৷ বাবা কমলকুমার সাহার ছোট্ট একটি মুদির দোকান ছিল৷ যেখান থেকে হওয়া আয়ে চার ছেলেমেয়েকে বড় করা সম্ভব ছিল না তাঁর৷ তাই জন্মের পর থেকে আলিপুরদুয়ার শহরের নিউটাউন পাড়ায় মামাবাড়িতেই থেকে যান কাজলবাবু৷ মামাদের আর্থিক অবস্থা ভাল না হলেও, ভাগ্নেকে ফেলতে পারেননি তাঁরা৷ তখন থেকেই মামাবাড়িতে থেকে লড়াই শুরু কাজলবাবুর৷ মামাদের হাটে কাপড় বিক্রির ব্যবসা ছিল৷ মামাদের আপত্তি থাকলেও, উপায় না থাকায় শৈশব কাটতে না কাটতেই তাদের সঙ্গে কাপড় নিয়ে হাটে যেতে হয়েছে তাঁকে৷ সেই ব্যবসাতেও আয় খুব বেশি ছিল না৷ ফলে গোবিন্দ হাইস্কুলে মাধ্যমিক দেওয়ার আগেই পড়াশোনার খরচ জোগাতে টিউশন করা শুরু করেন তিনি৷ এভাবেই লড়াই করে এর পর ম্যাকউইলিয়াম স্কুল থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও আলিপুরদুয়ার কলেজ থেকে স্নাতক হন তিনি৷ 

এর পর মামাবাড়ির হাল ধরতে সরকারি চাকরির চেষ্টায় নেমে পড়েন তিনি৷ চাকরির জন্য বিভিন্ন সরকারি পরীক্ষাও দেন তিনি৷ কিন্তু প্রতিবারই সাফল্যের কাছাকাছি এসেও ব্যর্থ হতে হয় তাঁকে৷ বারবার ব্যার্থতা আসতেই তাঁর মনে জেদ চাপে ডব্লিউবিসিএস অফিসার হওয়ার৷ শুরু করেন প্রস্তুতি৷ সেই সঙ্গে শুরু হয় আর এক প্রস্থ লড়াই৷ বাড়িতে নিজের হাতে ঘুড়ি বানিয়ে নিউটাউন বাজারে তা নিয়ে  গিয়েছেন বিক্রি করতে৷ একসময় ১৯৯৭ সালে ডব্লিউবিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন তিনি৷ দু’বছর পর মালদায় বিডিও হিসাবে কাজে যোগ দেন৷ তারপর নানা জেলা ঘুরে এখন নিজের ছোটবেলার স্মৃতিঘেরা আলিপুরদুয়ারের অতিরিক্ত জেলাশাসক তিনি৷

ডুয়ার্সকন্যার ছ’তলায় তাঁর ঘরের জানালা দিয়ে মামাবাড়ি যাওয়ার সেই রাস্তাটা স্পষ্ট দেখা যায়৷ সেই দিকে তাকিয়েই কাজলবাবু বলেন, ‘‘আজ আমি যা হয়েছি, তার কৃতিত্ব আমার মামাদেরও৷ আমার লড়াইয়ে, তাঁদের উৎসাহ আর ভালবাসার কোনও খামতি ছিল না।’’ 

আলিপুরদুয়ারের জেলাশাসক নিখিল নির্মলের কথায়, “জেলায় অনেক ছেলেমেয়েকে পড়াশুনা চালাতে অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে হয়৷ খেলাতেও এমন অনেক প্রতিভা রয়েছে যাদের পরিবার ততটা স্বচ্ছল নয়। তারা এখন কাজলবাবুকে দেখে লড়াইয়ের উৎসাহ পাবেন৷” আর কাজলবাবু শোনালেন তাঁর জীবনের মন্ত্র, ‘‘যাই হোক, হাল ছাড়া চলবে না৷’’

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন