সবুজে ঢাকা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়েছে নদী। পাথরে ধাক্কা খেতে খেতে ঢেউ তুলে বইছে জলঢাকা। এমন অপরূপ নিসর্গের পটভূমিতে নিজস্বী তুলতে তো ইচ্ছে করবেই। আর অসাবধানতায় এই ইচ্ছেই কাল হল। পা হড়কে নদীতে পড়ে তলিয়ে গেল সপ্তম শ্রেণির ছাত্র।

মঙ্গলবার দশমীর বিকেলে কালিম্পঙের বিন্দুতে এই দুর্ঘটনার পরে বুধবার দিনভর নদীতে তল্লাশি চালিয়েও খোঁজ মেলেনি আরমান কবীর নামে ওই ছাত্রের। উত্তর ২৪ পরগনার হাড়োয়া থেকে আরমানের বাবা মইউদ্দিন মোল্লা এবং তাঁর বন্ধু রবিউল ইসলাম সপরিবারে ডুয়ার্স বেড়াতে এসেছিলেন। লাটাগুড়ির একটি বেসরকারি রিসর্টে ছিলেন দুই পরিবারের সাত জন। দশমীর দিন সকালে ঝালং ঘুরে তাঁরা ভুটান সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ি গ্রাম বিন্দুতে এসেছিলেন।

বিন্দুর পাশ দিয়েই ভুটান থেকে ভারতে ঢুকেছে জলঢাকা নদী। বড় বড় পাথর দিয়ে ঘেরা জলঢাকা নদীর সৌন্দর্যই বিন্দুর অন্যতম আকর্ষণ। তার টানেই নদীর খুব কাছে চলে গিয়েছিলেন তাঁরা। সেই সময়েই পরিবারের সকলের অলক্ষ্যে কিছুটা দূরে চলে গিয়েছিল আরমান। নিজের স্মার্টফোন দিয়ে পাথরের ধার ঘেঁষে তাকে নিজস্বী তুলতে শেষবার দেখেছিলেন পরিবারের সদস্যেরা। কিন্তু তার পর থেকেই আর কোনও খোঁজ মেলেনি আরমানের। মঙ্গলবার বিকেল থেকেই দ্রুত তল্লাশি শুরু করে জলঢাকা থানার পুলিশ। জলঢাকা খানার ওসি পঙ্কজ সরকারের নেতৃত্বে পুলিশ, সিভিক ভলান্টিয়ার সকলে মিলে বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীতে তল্লাশি চালিয়েও কোনও হদিশ পাননি।

বস্তুত, নিজস্বী তুলতে গিয়ে দুর্ঘটনা এ দেশে নতুন নয়। মঙ্গলবারই উত্তরপ্রদেশের বাগপতে নিজস্বী তুলতে গিয়ে নাগরদোলার চাকায় চুল জড়িয়ে গুরুতর জখম হয় বছর ষোলোর এক ছাত্রী। বেখেয়ালে নাগরদোলার চাকার খুব কাছে চলে গিয়েছিল সে। তখনই এই বিপত্তি ঘটে। এক মার্কিন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী নিজস্বী-বিপত্তিতে দুর্ঘটনায় মৃত্যু ভারতে সবচেয়ে বেশি। নিজস্বী-হিড়িকে দুর্ঘটনা বাড়তে থাকায় গত ফেব্রুয়ারিতেই মুম্বইয়ের ১৬টি জায়গায় নিজস্বী তোলা নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন।

এ বার বিন্দুতে এমন ঘটনার পরে দুশ্চিন্তায় পর্যটন ব্যবসায়ীরাও। গরুমারা ট্যুরিজম ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কার্যকরী সভাপতি অনিন্দ্য মুখোপাধ্যায় বুধবার থেকেই বিন্দুর ঘটনার কথা জানিয়ে পর্যটকদের সতর্ক করার কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘ডুয়ার্সে বেড়াতে আসা প্রচুর পর্যটক একদিনের জন্যে ঝালং, বিন্দুতে বেড়াতে যান। এ সময় যে পরিমাণ বৃষ্টি হচ্ছে তাতে পাহাড়ি নদীর ধারে যাতে কেউ না যান সে বিষয়ে পর্যটকদের সতর্ক করছি।’’

বিন্দু এলাকায় জলঢাকায় মোট চারটি বাঁক রয়েছে। সারা বছরই ওই জায়গায় স্রোতের টান প্রবল। তবে শুখা মরসুমে কেউ নদীতে পড়লে চারটি বাঁকের যে কোন একটিতে আটকে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু গত ৪৮ ঘণ্টায় পাহাড়ে কয়েক দফার বৃষ্টিতে জলঢাকার স্রোত কয়েকগুণ বেড়েছে। তল্লাশি দলের আশঙ্কা, প্রবল স্রোতের টানে দেহটি দূরে ভেসে গিয়েছে।

আরমান মইউদ্দিনের একমাত্র সন্তান। মইউদ্দিন এবং রবিইল ইসলাম দু’জনেই রাজারহাট এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক। একমাত্র ছেলের নিখোঁজ হওয়ায় শোকে বাকরুদ্ধ মইউদ্দিন মোল্লা। বুধবার রবিউল জানান, জঙ্গলের সঙ্গে পাহাড় দেখতেই একবেলার জন্যে তাঁরা বিন্দুতে এসেছিলেন। আজ বৃহস্পতিবার বাগডোগরা হয়ে দমদম ফেরার কথা ছিল তাঁদের।