একটা সোনার মেডেল কী কী দিতে পারে? আর পাঁচজনে হয়তো বলবেন সম্মান। কিন্তু জলপাইগুড়ির পাতকাটা ঘোষপাড়ার বাসিন্দাদের অভিজ্ঞতা একটু অন্যরকম। তাঁরা জানাচ্ছেন, সোনার মেডেল পাকা রাস্তা দিতে পারে। বারবার ঘুরেও না হওয়া শংসাপত্রের কাজ বাড়িতে বসেই হয়ে যেতে পারে। আবার দীর্ঘ দিনের অভিমান ভুলে কাছে এনে দিতে পারে কোনও নিকটাত্মীয়কেও। হয়েছেও তাই। 

দু’দশকে যে রাস্তার কাজ শুরু হয়নি, তা এক দিনে শেষ করে ফেলার নির্দেশ এসেছে। স্বপ্না বমর্ণের জন্য জাতিগত শংসাপত্রের আবেদন নিয়ে বারবার সরকারি অফিসে হত্যে দিয়েছিলেন তাঁর মা, কাজ হয়নি। কিন্তু সোনা জেতার পরেই সেই আবেদন নিতে বাড়িতে এসেছেন খোদ সরকারি কর্তারা। আর মান-অভিমান ভুলে চোদ্দো বছর পরে বোন বাসনা বর্মণের বাড়িতে পা পড়েছে তাঁর দাদার।  

স্বপ্নার বাড়ির কাছ দিয়েই একটি ভাঙাচোরা রাস্তা গিয়েছে। সেখান থেকে একটি গলি নেমে তা গিয়েছে স্বপ্নার বাড়ি পর্যন্ত। বারবার আবেদনেও সেই গলি কখনও রাস্তা হয়ে ওঠেনি। এক দশক আগে রাস্তা হবে বলে পাথরের টুকরো ছড়ানো হয়েছিল মাত্র। তাতে পাতকাটার ঘোষপাড়ার শখানেক পরিবারের যাতায়াত আরও দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। স্বপ্নার সোনাজয়ের পরে শনিবার সকাল থেকে ওই গলিকে কংক্রিটের রাস্তা করার কাজ শুরু হয়েছে। সরকারি নির্দেশ এসেছে, যে ভাবেই হোক স্বপ্না বর্মণ গ্রামে পৌঁছনোর আগে রাস্তা তৈরি করে দিতে হবে।

রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব, এসজেডিএ-এর চেয়ারম্যান সৌরভ চক্রবর্তী গত বৃহস্পতিবার স্বপ্নার বাড়িতে এসেছিলেন। সেসময় জল-কাদা ভরা গলি দেখে সৌরভবাবু রাস্তা তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। শনিবার স্বপ্নার বাড়িতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা দার্জিলিঙের বিজেপি সাংসদ সুরেন্দ্র সিংহ অহলুওয়ালিয়া। প্রতিবারই স্বপ্নার মা বাসনা দেবী জোড় হাতে জানিয়েছেন, তাঁদের কিছু চাই না। বাসনা দেবী বলেন, “মেয়েটা কলকাতায় খেলে। আমি কতবার অফিসে বললাম শংসাপত্র দিতে। ওরা খালি বলেছে মেয়েকে নিয়ে আসুন।” গত শুক্রবার গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসের কর্মীরা নিজেরা বাড়িতে এসে আবেদন পত্র নিয়ে গিয়েছেন। তখন অবশ্য স্বপ্নাকে আনার প্রয়োজন হয়নি।

মেয়ের সোনা জয়ের মুহূর্তে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন বাসনা দেবী। এ দিন বলেন, “সেদিন চোখের জলে দুঃখই বেশি ছিল। মেয়েটাকে ভাল করে খেতে পর্যন্ত দিতে পারিনি। তখনও সবাই জানত ও খেলে। সরকারি কোনও সাহায্য কিন্তু পাইনি।”

শনিবার দুপুরে এক আগুন্তুক আসেন স্বপ্নার বাড়ি। তাঁকে দেখেই বাসনা দেবী দৌড়ে গিয়ে ঘরে নিয়ে আসেন। বলেন, “১৪ বছর পরে আমার দাদা বাড়িতে এল।” ক্রমাগত জল পড়ছিল দাদা মানব রায়ের চোখ দিয়েও। বললেন, “ভাগনিটা সোনা পেয়েছে। এমন দিনে, আমি কী করে পুরনো অভিমান নিয়ে বসে থাকতে পারি।’’ এক পড়শি শান্তি রায়বর্মনের মন্তব্য, “মেয়েটা সোনা জিতে সব জায়গায় সোনার কাঠি ছুঁয়ে দিচ্ছে।”