একসময় ‘জঙ্গল দুবরাজপুর’ নামেই পরিচিত ছিল আজকের পুরশহর দুবরাজপুর। শহরের প্রস্তুরীভূত ভূখণ্ড পাহাড়েশ্বর পর্যটন কেন্দ্র তখনও সুবিদিত নয়। নাম তখনও ‘মামা-ভাগ্নে’ হয়নি।

বেশ কয়েক শতাব্দী আগে এই জনপদ ছিল সেই সময়কার অধিবাসী সাঁওতালদের দখলে। জনবসতির ইতিহাস বলে, এরপর রাজনগরের মুসলিম রাজা, হেতমপুর রাজাদের হাত ঘুরে পাহাড়েশ্বর আসে দুবরাজপুরের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা ভূপানন্দ মহারাজের হাতে।

আশির দশকের শেষ দিকে দুবরাজপুর পুরসভার হাতে পাহাড়েশ্বরকে তুলে দেন মহারাজ। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, প্রাকৃতিক সম্পদ পাহাড়েশ্বরের মূল আকর্ষণ মামা-ভাগ্নে (দুটি পাথর) সহ প্রস্তুরীভূত ভূখণ্ডকে আরও সাজিয়ে মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করে তোলা। যাতে যারা এখানে বেড়াতে আসেন, তারা আনন্দ পান। আশির দশকের শেষ ভাগে পুরসভার হাতে তুলে দেওয়া হলেও পাহাড়েশ্বরে সৌন্দর্যায়নে হাত পড়ে ২০০০ সালের পরে। ওই সময় পাহাড়েশ্বর সংলগ্ন একটি চিল্ডেন পার্ক বানানো হয়। পাহাড়েশ্বরকে ঘিরে ফেলার কাজ শুরু হয় সেই তখন থেকেই। সে সময় ক্ষমতায় ছিল বাম বোর্ড। ২০০৩-এ কংগ্রেস বোর্ড ক্ষমতায় আসার পর সেই পার্ক আরও বড় হয়েছে। পাহাড়েশ্বরকে ঘিরে ফেলার কাজ এগিয়েছে আরও কিছুটা। শীতকালে এলাকা ও এলাকার বাইরের বেশ কিছু পিকনিক পার্টি এখন এখানে আসে। বিতর্ক সে সব নিয়েই!

একটা সময় এই বাড়িটি সাধুদের আশ্রয় স্থল ছিল। বর্তমানে সেটি বেহাল।

কংক্রিটের আড়ালে পাহাড় যে অবহেলিত এমন মনে করেন শহরবাসী থেকে পরিবেশবিদ সকলেই। তাঁদের দাবি, এক) পাহাড়েশ্বরের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা নানা মাপের পাথরখণ্ডের অন্যরকম প্রাকৃতিক পরিবেশ যা মানুষকে টানত, রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে সেই সব জায়গায় পৌঁছতে গেলে এখন সমস্যায় পড়তে হয় পর্যটকদের। প্রচুর আগাছা জন্মে পায়ে চলার পথটাই গিয়েছে হারিয়ে। দুই) পুরসভার মধ্যে হলেও পাহাড়েশ্বর সংলগ্ন এলাকার বহু পরিবারেই শৌচাগার না থাকায় সেই সব পরিবারের পুরুষ মহিলা সকলের শৌচকর্ম করার জায়গা এখন পাহাড়েশ্বর। ফলে মূল মামাভাগ্নে পাহাড় পর্যন্ত পৌছতে গেলে নোংরার মধ্য দিয়ে হাঁটতে হয়। তিন)  পুরসভার সঠিক নজরদারির অভাবে পাহাড়েশ্বর এলাকায় এখন নেশারুদের ভিড় বাড়ছে। এতে নিজেদের মান বাঁচাতে অনেকেই ভয় পান এখানে বেড়াতে আসতে। চার) একসময় পাহাড়েশ্বরে ব্রততীর্থ নামে সাধু সন্তদের রাত্রিবাসের জায়গা করে দিয়েছিলেন দুবরাজপুরের শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা। রক্ষণাবেক্ষনের অভাবে সেও এখন ধ্বংসের মুখে। পাঁচ) প্রবেশ পথের সামনেই পুরসভা নির্মিত শৌচাগার মোটেও শোভন নয় বলে মনে করেন অনেকেই। ছয়) পাহাড়েশ্বরকে ঘিরে সৌন্দর্যকে শিকল পরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও মনে করেন পরিবেশ সচেতন মানুষ। সাত) এক সময় এখানে পাহাড়েশ্বরে শিব মন্দির ছিল। সেই মন্দির ভেঙে ১৪২.৮ ফুট উচ্চতার মন্দির তৈরি হচ্ছে যা শহরের সবচেয়ে উঁচু। পাহাড়েশ্বরের টিলা পাথরের উচ্চতার থেকে যা কিছুটা বেমানানও বটে বলে মনে করেন পরিবেশ সচেতন মানুষ। পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে গিয়ে বেঢপ নির্মাণ-ই মুখ্য হয়ে পড়েছে পাহাড়েশ্বরে। আসল দিক থেকেই নজর ঘুরিয়ে নিয়েছে পুরসভা বলে মনে করেন অনকেই।

পুরপ্রধান পীযূষ পাণ্ডে অবশ্য সব অভিযোগ মানছেন না। তাঁর দাবি, “নেশা করার বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা হয়ত ঘটে। পাথরের উপর বসে নেশা করার বিষয়টি যাতে বন্ধ করা যায়, সেটা আমরা দেখছি। শৌচকর্ম বন্ধের জন্য যে দিকটা ঘিরতে হত সেটা এখনও হয়ে উঠেনি। আমরা অচিরেই তা করব। তবে বাম বোর্ডে রাস্তার দিক থেকে না ঘিরে পেছন দিক থেকে ঘিরলেই ভাল করত।” যাঁর আমলে এ কাজ শুরু হয়েছিল, সেই সিপিএম পুরপ্রধান মধুসূদন কুণ্ডু বলেন, “প্রথমত সীমানা প্রাচীর দিয়ে পাহারেশ্বরকে না ঘিরলে, জমি অবৈধ দখল হয়ে যাচ্ছিল। বর্তমান বোর্ড যেভাবে পাহাড়েশ্বরকে দেখছে, আমাদের ভাবনা তেমন ছিল না। পরিবেশকে অক্ষুণ্ণ রেখে মামা-ভাগ্নে পাথর পর্যন্ত একটি ঝোলা ব্রিজ করার ইচ্ছে ছিল আমাদের। বর্ষার জল ধরে একটি জলাশয়ের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সে কাজ করা যায়নি।” পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত  বলেন, “পর্যটন কেন্দ্র পরের কথা, আগে প্রকৃতিকে আগলে রাখা জরুরি। এখানে পাহাড়েশ্বর যেটা মানুষের কাছে অকর্ষণের জায়গা ছিল যেটাই আড়ালে চলে যাচ্ছে। ব্যক্তিগতভাবে কংক্রিটের আড়ালে প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে এভাবে ঢেকে ফেলারও বিরোধী আমি।” 

 —নিজস্ব চিত্র।

কেমন লাগছে আমার শহর? আপনার নিজের শহর নিয়ে আরও কিছু বলার থাকলে আমাদের জানান।
ই-মেল পাঠান district@abp.in-এ। Subject-এ লিখুন ‘আমার শহর-বীরভূম’।
অথবা চিঠি পাঠান, ‘আমার শহর’, বীরভূম বিভাগ, জেলা দফতর, আনন্দবাজার পত্রিকা,
৬ প্রফুল্ল সরকার স্ট্রিট, কলকাতা- ৭০০০০১