জনসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু বলরামপুরে নাগরিক পরিষেবা এখনও তিমিরেই। স্বাস্থ্য থেকে নিকাশি নানা সমস্যায় মানুষ জেরবার। সেই সঙ্গে ধুলো রীতিমতো দূষণের কারণ হয়ে উঠেছে।

রাজ্যের দক্ষিণ সীমানা ছুঁয়ে থাকা বলরামপুর অনেক আগে থেকেই শিল্পের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল লাক্ষা শিল্পের জন্য। তারপরে ১৮৮৯ সালে আদ্রা-পুরুলিয়া-সিনি রেলপথ যখন বলরামপুরকে (স্টেশনের নাম বরাভূম) ভারতীয় রেল মানচিত্রে জুড়ল, তখন এর পরিচিতি আরও বাড়ে। পরে এই জনপদের উপর দিয়ে তৈরি হয় ৩২ নম্বর জাতীয় সড়ক। ওই রাস্তা ধানবাদ, বাকারো, জামশেদপুর ও চাইবাসার মতো শিল্পশহরের সঙ্গে বলরামপুরকে জুড়ে দেয়।

১৯৬২ সালে পৃথক ব্লক সদর হিসেবে স্বীকৃতি পায় বলরামপুর। কালের নিয়মেই বলরামপুর বেড়েছে আড়েবহরে। একদা যে বলরামপুর ছিল লাক্ষা শিল্পের অন্যতম কেন্দ্র, শতবর্ষ পেরিয়ে জীবনযাপন বা নাগরিক পরিষেবার প্রশ্নে সেই জনপদে এখন নানা সমস্যার কথা শোনা যায়।

বর্তমানে যেখানে বলরামপুর বাসস্ট্যান্ড রয়েছে, একসময় সেখানে হাট বসত। কিন্তু বাসস্ট্যান্ডের বিশেষ উন্নতি নজরে পড়ে না। যাত্রী প্রতীক্ষালয় একটি থাকলেও সেখানে পুলিশ শিবির করে রয়েছে। ফলে রোদ-বৃষ্টির মধ্যে খোলা আকাশের নীচে যাত্রীদের অপেক্ষা করতে হয়। নেই শৌচাগারও। এক কলেজ ছাত্রীর কথায়, “দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হলে কখনও কখনও শৌচাগার না থাকায় সমস্যায় পড়তে হয়। মহিলাদের কথা ভেবে অন্তত এই কাজটি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে করা উচিত।”

নিকাশি নিয়েও বলরামপুরে কান পাতলে সর্বত্র একই অভিযোগ শোনা যায়। নিকাশি নালার নোংরা জল নালা ছাপিয়ে রাস্তার উপরে বইছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ, জাতীয় সড়কের দু’পাশে নিকাশি নালা ছিল। কিন্তু রাস্তা চওড়া করতে গিয়ে তা বুজিয়ে দেওয়া হয়। ফলে শুধু বর্ষাকালই নয়, বছরের অন্য সময়েও রাস্তা জল-কাদায় ভরে থাকে। যাতায়াত করতে পথচারীরা বিপাকে পড়ছেন।

বলরামপুরের বুক চিরে চলে যাওয়া জাতীয় সড়কে দিনরাত গাড়ির যাতায়াতে ধুলোয় বাসিন্দারা অতিষ্ঠ। এই সমস্যা দীর্ঘদিনের। এলাকায় যক্ষা বিষয়ে কাজ করা একটি সংস্থার মুখপাত্র সুধাকর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “বলরামপুরের ধুলো অন্যতম প্রধান সমস্যা। এ জন্য পরিবেশ বেশ দূষিত হচ্ছে।” তাঁর মতোই বাসিন্দাদের অনেকে ধুলো নিয়ন্ত্রণের দাবি তুলেছেন। 

মঙ্গলবারের সাপ্তাহিক হাটের উপর বলরামপুর ব্লকের বিস্তীর্ণ এলাকার অনেকে নির্ভরশীল। এই হাট দীর্ঘদিনের। প্রবীণ বাসিন্দা বিমল মহান্তির কথায়, “এই হাট ঠিক কত বছরের পুরনো তা বলা মুশকিল। এলাকার একশোরও বেশি গ্রামের মানুষজন এই হাটের উপর নির্ভরশীল।” তিনি জানান, সাপ্তাহিক হাটের এই দিনে এলাকার মানুষজন প্রায় সারা সপ্তাহের কেনাকাটা সারতেন। শাকসব্জি, ঘর গেরস্থালির জিনিসপত্র, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুর বেচাকেনা হত। একদা বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও এই হাট বর্তমানে সরকারি ছত্রছায়ায়। কিন্তু প্রাচীন এই হাটের সবার্ঙ্গে অযত্নের ছাপ। যাঁরা দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসা করতে আসেন তাঁদের জন্য ন্যূনতম পরিকাঠামোও নেই।

ঝাড়খণ্ডের চক্রধরপুর থেকে গবাদি পশুর হাটে এসেছিলেন তফাজুল আনসারি ও রমজান আনসারি। বিকেলে ফিরে যাওয়ার আগে তাঁর বলেন, “এই হাটে পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই। রাত্রিবাসেরও সুযোগ নেই। নেই শৌচাগারও।” গবাদি পশুর খাবার জলেরও অভাব রয়েছে। তা সত্ত্বেও কেনাবেচা বেড়েছে। ফলে হাটের বাইরে রাস্তার উপরেও চলে এসেছে পসরা। বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, একে রাস্তার উপর ঘনঘন গাড়ি, ট্রাকের যাতায়াত তার উপরে সেই পথের ধারেই বেচাকেনা চলায় দুর্ঘটনার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আশঙ্কায় থাকেন ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই। হাটে পোশাক কিনতে এসে এক মহিলা জানান, কিছুদিন আগে এ রকম ভাবে কেনার সময়ে তাঁকে একটি মোষ ধাক্কা মারে। এলাকার সামগ্রিক সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন বলরামপুরের বিডিও সুচেতনা দাস। তাঁর আশ্বাস, “বাসস্ট্যান্ড ও হাটে শৌচাগার না থাকায় সমস্যা যে হচ্ছে তা জানি। আমরা তিনটি সুলভ শৌচালয় গড়ার প্রকল্প নিয়েছি। একটি বাসস্ট্যান্ডে এবং বাকি দু’টি গবাদি পশুর  হাটে তৈরি করা হবে।” তিনি জানান, হাটের সংস্কার করা হবে। বলরামপুর পঞ্চায়েত সমিতির সহ-সভাপতি সুদীপ মাহাতো বলেন, “কৃষক বাজার তৈরি হয়েছে। তাতেই সমস্যা অনেকটা মিটে যাবে আশা করছি।”

ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়েও বাসিন্দাদের অভিযোগের শেষ নেই। চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। সাধারণ রোগের চিকিৎসা হলে অবস্থা একটু জটিল হলেই তাঁকে অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তাই স্বাস্থ্যের জন্য বাসিন্দারা পুরুলিয়া সদর নয়তো পাশের ঝাড়খণ্ডের টাটানগরের উপরে নির্ভরশীল।

এই সমস্যা শুনে এলাকার বিধায়ক তথা রাজ্যের স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বনিযুক্তি প্রকল্প দফতরের মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো বলেন, “স্বাস্থ্যকেন্দ্র নিয়ে কিছু সমস্যা ছিল। এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিকাঠামোর উন্নতি ঘটানো হচ্ছে। শয্যার সংখ্যাও বাড়ানো হবে। পাঁচ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। কাজও শুরু হয়েছে।”