তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখনও মাঠের কিছুটা ফাঁকা। মঞ্চে বসেই মোবাইল কানে নেতারা ঘনঘন ফোন করে মাঠ ভরাতে কর্মীদের নির্দেশ দিচ্ছিলেন। কিছুক্ষণ পরেই আরও লোকজন আসায় নেতাদের যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে। কানায় কানায় ভরা মাঠ দেখে পুলিশ কর্তারা দাবি করলেন, অন্তত এক লক্ষ। আর দলের নেতারা দাবি করলেন, এক লক্ষেরও ঢের বেশি মানুষ এসেছেন।

বনগাঁ-কৃষ্ণগঞ্জ জয়ের দিনেই সোমবার দুপুরে হুড়ার লধুড়কায় চণ্ডেশ্বর মন্দির মাঠে বক্তব্য রাখতে উঠে এই ভিড় দেখে স্বভাবতই উচ্ছসিত মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রথমেই তিনি বলেন, “বড় কাজ করতে এসেছি আমরা। বাঁকুড়া-পুরুলিয়া জেলার মধ্যে ‘৬০ এ’ জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আমাদের সরকার আরও ঝকঝকে রাস্তা করছে। এই রাস্তা হলে বিভিন্ন অঞ্চল সংযুক্ত হবে। এই রাস্তা আপনাদের অনেক কাজে লাগবে। মনে রাখবেন এটা খুব বড় কাজ।”

পুরুলিয়া শহর থেকে ঢের দূরে এই প্রশাসনিক জনসভা হলেও মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ আগামী পুরভোট। তাই পানীয় জলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, “পুরুলিয়া শহরের জলের প্রকল্পটি তাড়াতাড়ি করতে হবে। এটা জেলাশাসককেও বলব।” পাশাপাশি এই জেলায় ১২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে পানীয় জলের প্রকল্প হচ্ছে বলে তিনি জানান (আগের বারই ঘোষণা করেছিলেন তিনি)। মুখ্যমন্ত্রী জানান, ওই প্রকল্প হয়ে গেলে মানুষের জলের সমস্যা আর থাকবে না।

জেলার একগুচ্ছ প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করে তিনি বলেন, “এখানে আটটি পর্যটন প্রকল্পের কাজ চলছে। আজ ইকো ট্যুরিজমের অযোধ্যা ও জয়চণ্ডী প্রকল্পের উদ্বোধন হল।” অযোধ্যা পাহাড়ে সাহারজুড়ি থেকে মুরগুমা (১১ কিমি রাস্তা পশ্চিমাঞ্চল উন্নয়ন দফতর তৈরি করেছে) রাস্তার উদ্বোধনের কথাও মানুষজনকে জানিয়েছেন তিনি। ঝালদা-বাঘমুণ্ডি রাস্তায় কুটিডি ও পুরুলিয়া-বাঘমুণ্ডি রাস্তায় শোভা নদীর উপরে সেতুর কাজ হচ্ছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পুরুলিয়ায় মাল্টি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল আর বছর দেড়েকের মধ্যে হয়ে যাবে। তখন আপনাদের ভেল্লুরে বা কলকাতায় চিকিত্‌সার জন্য দৌড়তে হবে না। এখান থেকেই চিকিত্‌সা পাবেন।”

শুশুনিয়ায় যুব আবাসের উদ্বোধন।

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে পুরুলিয়া হোমিওপ্যাথি কলেজ। হাসপাতালটি খোলার জন্য দীর্ঘদিন ধরে রাজ্য সরকারের কাছে আবেদন জানানো হয়। এ দিন মুখ্যমন্ত্রী জানান, রাজ্য সরকারের পক্ষে ওই হাসপাতালটি খোলার অসুবিধা রয়েছে। তিনি বলেন, “পিপিপি মডেলে করতে পারি। চেষ্টা করছি।” বিধায়ক কেপি সিংহ দেওয়ের কাছে থেকে পুরুলিয়ায় হিন্দি স্কুলের দাবির কথা শুনে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন,এখানে ২০টি মডেল স্কুল হচ্ছে। তারমধ্যে একটি হিন্দি স্কুল হবে।

মমতার বক্তব্যে এ দিনও প্রত্যাশামাফিক জঙ্গলমহলের আগের অবস্থার কথা উঠে এসেছে। তিনি বলেন, “আগে কী ছিল? শুধু রক্ত, চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ। এই পুলিশ ধরে নিয়ে গেল, জঙ্গল থেকে মাও এল। আজকে তপশিলি জাতি, উপজাতি, সংখ্যালঘু সকলেই ভাল আছেন। এর চেয়ে বেশি কিছু চাই না।” আদ্রা রেলশহরের উচ্ছেদ নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “স্বপন (কাশীপুরের বিধায়ক) আমাকে বলছিল রেলের কোনও প্রকল্পের জন্য উচ্ছেদ করা হচ্ছে। এ ভাবে গরিব মানুষকে ছুঁড়ে ফেলে দিতে নেই।” এই বিষয়টি তিনি জেলাশাসককে দেখতে বলে যান। মঞ্চে ছিলেন রাজ্যের দুই মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়, শান্তিরাম মাহাতো, সাংসদ মুনমুন সেন প্রমুখ।

হুড়ার সভাস্থল থেকে বিকেলে মুখ্যমন্ত্রী ফেরেন শুশুনিয়ায়। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত
জেলার বিভিন্ন রাস্তায় চলে যান নিয়ন্ত্রণ। বিপাকে পড়ে যান পথচারীরা। বিষ্ণুপুরের বাঁকাদহে নিজস্ব চিত্র।

তবে এ দিন মুখ্যমন্ত্রীর ৬০ এ জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ তাঁর সরকার করছে বলে তিনি যে দাবি করেছেন, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। জাতীয় সড়ক প্রশস্তিকরণের এই প্রকল্প কী রাজ্য সরকারের?  মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য শোনার পরে এই প্রশ্ন তুলেছেন জেলা বিজেপি সভাপতি বিকাশ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “রাজ্য সরকার কাজ করলেও তহবিল তো কেন্দ্রের। আর এটা জাতীয় সড়ক। স্বভাবতই সেই সড়ক সংস্কার বা প্রশস্তিকরণে কেন্দ্রই অর্থ দেবে। কিন্তু তিনি এই কাজকে রাজ্য সরকার করবে বলে উল্লেখ করলেন কী ভাবে? একবারও কেন্দ্রের নাম অবধি নিলেন না!” যদিও জাতীয় সড়ক দফতরের এক কর্তা বলেন, “এই প্রকল্পের তহবিল কেন্দ্রের। তবে কাজটি করবে রাজ্য সরকার।”

তৃণমূলের জেলা নেতারা অবশ্য এ নিয়ে মাথা ঘামাতে রাজি নন। সারদা-তদন্ত নিয়ে প্রবল চাপের মধ্যে এবং সম্প্রতি মুকুলের ডান ছাঁটা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড় হওয়ার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীকে এই ভিড় দেখাতে পেরে তাঁরা আনন্দে আত্মহারা। তাই সভার শেষে জেলা পরিষদের পূর্ত কর্মাধ্যক্ষ সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায় একগাল হেসে দাবি করেছেন, “উফ্ প্রচুর লোক হয়েছে!”