বিয়ে করার নামে তরুণীকে ফুঁসলিয়ে নিয়ে গিয়ে গণধর্ষণের পরে বিক্রি করে দিয়েছিল ‘প্রেমিক’। তারপরে হাত বদলে সেই তরুণী বিক্রি হন উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজস্থানে। সেই অপরাধে ‘প্রেমিক’-সহ ছ’জনকে দশ বছর কারাদণ্ড দিল পুরুলিয়া আদালত। বুধবার এই রায় ঘোষণা করেন পুরুলিয়া আদালতের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক (ফাস্ট ট্র্যাক ১) বিনয়কুমার প্রসাদ।

ঘটনাটি চার বছর আগের। মামলার সরকারি আইনজীবী গৌতম চট্টোপাধ্যায় জানিয়েছেন, পুরুলিয়া মফস্‌সল থানার দান্দুডি গ্রামের বাসিন্দা এক তরুণীর সঙ্গে ২০১৪ সালের এপ্রিল মাসে ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খরসঁওয়া জেলার গামারিয়া থানার কুলুডির বাসিন্দা বীরসিং মান্ডি নামে এক যুবকের আলাপ হয়। পরে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এরপরে বীরসিং ওই তরুণীকে ১ অগস্ট পুরুলিয়া স্টেশনে আসতে বলে। তরুণী নিজের এক বান্ধবীকে নিয়ে পুরুলিয়া স্টেশনে নিয়ে যান। সেখানে বীরসিং ওই তরুণীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। তার কথা বিশ্বাস করে তরুণী। তাঁকে ফুঁসলিয়ে পুরুলিয়া থেকে ঝাড়খণ্ডের সরাইকেলা-খরসঁওয়া জেলার আদিত্যপুর থানার শান্তিনগর এলাকায় এক বন্ধুর বাড়িতে নিয়ে গিয়ে তোলে বীরসিং।

এ দিকে সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজ করেও মেয়েকে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পরিজনেরা। পরে একটি সূত্রের ভিত্তিতে ২৪ অগস্ট তরুণীর বাবা পুরুলিয়া মফস্‌সল থানায় বীরসিংয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগ পেয়ে তদন্তে নামে পুলিশ। 

ঘটনার তদন্তকারী অফিসার রামগোপাল পাল অভিযোগের তদন্তে ঝাড়খণ্ডে যান। পরের দিনই বীরসিং মান্ডিকে এবং শান্তিনগরে যার বাড়িতে ওই তরুণীকে তোলা হয়েছিল সেই অজয় দাসকে গ্রেফতার করে আনে পুলিশ। তাদের নিজেদের হেফাজতে নেয় পুলিশ। জেরায় ধৃতেরা পুলিশের কাছে স্বীকার করে সেখানে ওই দু’জনের সঙ্গে তাদের দুই বন্ধু শঙ্কর তাঁতি এবং হরিপদ কুমারও ছিল। তারা চার জন মিলে ওই তরুণীকে গণধর্ষণ করে। তারপরে ট্রেনে উত্তরপ্রদেশের ঝাঁসিতে নিয়ে যায়। ঝাঁসি থেকে মধ্যপ্রদেশের শিবপুরিতে নিয়ে গিয়ে মহেশ শর্মা ওরফে পাপ্পুর কাছে ওই তরুণীকে তারা বিক্রি করে দেয়। পাপ্পুর হাত থেকেও ওই তরুণী ফের বিক্রি হয়ে যান। এরপরে তাঁকে রাজস্থানের বারাং জেলার কসবা থানা এলাকার বুরোনোনেরো গ্রামের বাসিন্দা মনু শর্মা নামে এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে ওই গ্রামেরই আরেক বাসিন্দার কাছে বিক্রি করা হয় ওই তরুণীকে।

পুলিশ প্রথমে দু’জনকে গ্রেফতার করার পরে তাদের জেরা করে ঝাঁসি, শিবপুরি এবং রাজস্থানের বারাং জেলার বুরোনোনেরা গ্রামে গিয়ে বাকি অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে। তবে শেষ যাকে বিক্রি করা হয়েছিল, সেই অভিযুক্তকে অবশ্য পুলিশ গ্রেফতার করতে পারেনি। সেই ব্যক্তি পালিয়ে গেলেও পুলিশ তার বাড়ি থেকে সেপ্টেম্বর মাসে ওই তরুণীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে। 

অভিযোগ পাওয়ার পরে একে একে অক্টোবর মাসের মধ্যেই অভিযুক্তদের গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। শেষের সেই ব্যক্তিকে পলাতক দেখিয়েই পুলিশ ধৃত ছ’জনের বিরুদ্ধে ওই বছরেরই নভেম্বর মাসে আদালতে চার্জশিট দেয়। মামলার শুনানি চলাকালীন কোনও অভিযুক্তকেই জামিন দেয়নি আদালত। 

গৌতমবাবু জানান, এ দিন বিচারক অভিযুক্ত ছ’জনকেই দশ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ হাজার টাকা করে জরিমানার আদেশ দিয়েছেন। অনাদায়ে ছ’মাস কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

পুরুলিয়ার পুলিশ সুপার জয় বিশ্বাস বলেন, ‘‘এই ঘটনা বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। পুলিশ এ ক্ষেত্রে ভাল কাজ করেছে। পাশাপাশি, কেউ যাতে এই ধরনের ফাঁদে পা না দেন সে জন্য আমরা প্রচার করব।’’ তিনি জানান, এই মামলার তদন্তকারী আধিকারিককে পুরস্কৃত করা হবে।