সব রাজনৈতিক দলকে নিয়ে চলার পক্ষপাতী ছিলেন তিনি। মৃত্যুতেও নকুল মাহাতো সব দলের নেতৃত্বকে মিলিয়ে দিলেন।

বর্ষীয়ান সিপিএম নেতা নকুল মাহাতোকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে বৃহস্পতিবার পুরুলিয়ার নামোপাড়ার দলীয় অফিসে বামফ্রন্টের শরিক নেতারা তো বটেই, অ-বাম নেতারাও এসেছিলেন। ফুলের মালা হাতে ভিড় করেন বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য ও আমজনতাও। মরদেহের সঙ্গে জনতার ভিড় ছিল পুরুলিয়া শহর, বলরামপুর, বরাবাজার, মানবাজার হয়ে পুঞ্চার নপাড়ায় তাঁর শেষকৃত্যে পর্যন্ত।

পঞ্চায়েত নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই তাতছে রাজ্য-রাজনীতি। শাসক-বিরোধী তরজায় উত্তাপ ছড়াচ্ছে। কিন্তু এ দিন নকুলবাবুকে শ্রদ্ধা জানাতে আসা বিভিন্ন দলের নেতাদের দেখে, তা মালুম হল না।

জ্বর গায়েই ঝালদা থেকে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি তথা বাঘমুণ্ডির বিধায়ক নেপাল মাহাতো। কিছু আগেই ঘুরে গিয়েছেন বিজেপি-র কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য বি পি সিংহদেও। ফুল নিয়ে আসেন তৃণমূলের পুরুলিয়ার সাংসদ মৃগাঙ্ক মাহাতো, জেলা সভাধিপতি সৃষ্টিধর মাহাতো, দুই সাধারণ সম্পাদক নবেন্দু মাহালি, গৌতম রায়। বামফ্রন্টের জেলা নেতৃত্ব তো বটেই, শ্রদ্ধা জানাতে আসেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর দুই সদস্য অমিয় পাত্র ও দীপক দাশগুপ্ত। বিভিন্ন দলের নেতারা একে অন্যের সঙ্গে কথাও বলেন।

তাঁদের কথোপকথনে উঠে আসে, নকুলবাবু কী ভাবে অন্য দলের নেতাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন। নেপালবাবু বলছিলেন, ‘‘ওঁর সঙ্গে রাজনৈতিক মত পার্থক্য ছিলই। কিন্তু এলাকার উন্নয়নে যখনই কোনও সমস্যা নিয়ে তাঁকে জানিয়েছি, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।’’ তিনি জানান, ইচাগের একটি জুনিয়র হাইস্কুলকে উন্নীত করতে চেয়ে জেলাপ্রশাসনের কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন। অনুমোদন মিলছিল না। নকুলবাবুকে সে কথা জানাতেই দ্রুত কাজ হয়ে যায়। একই মত বিজেপি-র কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সদস্য বি পি সিংহদেও-র।

প্রাক্তন কংগ্রেস মন্ত্রী সীতারাম মাহাতোর ছেলে মৃগাঙ্কবাবু মনে করান, ‘‘বাবার মুখেই শুনেছি অত্যন্ত সহজ সরল সাধারণ জীবনযাপন করতেন নকুলবাবু। সাধারণের সঙ্গে মিশে তাঁদের সমস্যা বুঝে উন্নয়নের কাজ করার চেষ্টা করতেন। তাঁর কাছে অনেক কিছুই শেখার ছিল।”

এ দিন তাঁর দেহ শেষ বারের জন্য দেখতে যে ভাবে জেলার বিভিন্ন এলাকায় লোকজন শববাহী গাড়ির কাছে ছুটে এসেছে, তা নতুন করে দেখিয়ে দিল, তাঁর জনসংযোগ কতখানি ছিল।

মাঠের কাজ ফেলে বরাবাজারের সিন্দরি বাজারে মরদেহ যাওয়ার পথে ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন স্থানীয় ফতেপুর গ্রামের বংশীধর মাহাতো। দূর থেকে গাড়ির সারি দেখে ভিড়ের মধ্যে রোল উঠল— ‘‘নকুলবাবু আসছেন’’। বংশীধর বলেন, ‘‘কোনও দিন কোনও দলের মিছিলে হাঁটিনি। কয়েক দশক আগে একবার আমাদের গ্রামে মিছিল হচ্ছিল। মিছিলের সামনে থাকা এক প্রৌঢ় ঘেমেনেয়ে আমার মাটির বারান্দায় বসে পড়ে জল চেয়েছিলেন। ঘটিতে জল দিয়েছিলাম। পরে জেনেছিলাম উনি সিপিএম নেতা নকুল মাহাতো!’’ তাঁর পড়শি সদানন্দ মাহাতো বলেন, ‘‘ওঁর সম্পর্কে অনেক কথা শুনেছি। মানুষটাকে শেষবারের মতো দেখে নিই। আর তো কোনওদিন দেখা হবেনা।’’

সিপিএমের জেলা সম্পাদক মণীন্দ্র গোপ বলেন, ‘‘জেলার বিভিন্ন প্রান্তের সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। সেই সব মানুষ হাত উঁচিয়ে অনেক জায়গায় গাড়ি থামিয়েছেন।’’ অমিয়বাবু বলেন, ‘‘সব দলকে প্রাপ্য সম্মান দিতেন তিনি। শেষযাত্রায় সেই প্রাপ্য সম্মানটাই নকুলবাবু ফেরত পেলেন।’’

টানা ৪৭ বছর দলের জেলা সম্পাদকের পদ ছাড়ার পরে সে ভাবে মঞ্চে আর তাঁকে দেখা যায়নি। কিন্তু জনতার মন থেকে মুছে যাননি। নানা স্মৃতিতে এ ভাবেই পুরুলিয়ার শহরের পথে, প্রত্যন্ত গ্রামের মাটির দাওয়ায় স্মৃতি হয়ে থাকবেন নকুলবাবু।