এক দিকে ধর্মঘটের সমর্থনে বাস চলাচল বন্ধ রাখার জন্য মাইকে প্রচার। পাল্টা হিসেবে বাস চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য মাইকে আহ্বান। ধর্মঘট সমর্থনকারী এবং ধর্মঘট বিরোধীদের প্রচারে সোমবার সরগরম ছিল রামপুরহাট শহর। মঙ্গলবার ধর্মঘটের প্রথম দিনে অবশ্য রামপুরহাট বাসস্ট্যান্ড থেকে কোনও বেসরকারি বাস চলেনি। সহায় ছিল সরকারি বাস, ট্রেকার, অটো, যন্ত্রচালিত ভ্যান এবং টোটো। তাতে দুর্ভোগ কমেনি। তবে প্রথম দিনের ধর্মঘটে তেমন প্রভাব পড়েনি বোলপুরে। প্রতিদিনের মতোই দোকান খোলা ছিল। আর পাঁচটা দিনের মতোই স্বাভাবিক ছিল জেলা সদর সিউড়িও। জেলাশাসক মৌমিতা গোদারা বসু জানিয়েছেন, এ দিন জেলায় সরকারি কর্মীদের হাজিরা ছিল ৯৯.৬ শতাংশ। পুলিশ সুপার শ্যাম সিংহ বলছেন, ‘‘ধর্মঘটে জেলার কোথাও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি হয়নি। তবে জোর করে ধর্মঘট পালনে বাধ্য করার জন্য রামপুরহাট ও নলহাটি সহ জেলায় মোট ১৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।’’

তবে ভাবনায় রেখেছে রামপুরহাট। আজ, বুধবারও যদি রামপুরহাট মহকুমায় বেসরকারি বাস না চলে সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি কী হবে তা ভেবে এখনই অনেকে শঙ্কিত। জাতীয় সড়কের ধারে রামপুরহাট বাসস্ট্যান্ড। সকাল দশটা নাগাদ বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে জাতীয় সড়কের ধারে বগটুই মোড় এলাকায় দেখা গেল, নিত্যযাত্রী থেকে সাধারণ যাত্রীরা দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে আছেন। এঁদের মধ্যেই ছিলেন স্থানীয় একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষক। পরীক্ষার সংক্রান্ত জরুরি কাজে সিউড়ি যাওয়ার কথা। বললেন, ‘‘প্রায় চল্লিশ মিনিট আগে সরকারি বাস চলে গিয়েছে। সেই থেকে দাঁড়িয়ে।’’ এ দিকে, ট্রেকার, অটোতেও উপচে পড়া ভিড়। বগটুই মোড় ছাড়িয়ে রামপুরহাট বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেল, অন্য দিনের তুলনায় যাত্রীদের ভিড়ও কম।

অথচ, সোমবার দিনভর বাসস্ট্যান্ডের অফিস থেকে ধর্মঘটের দু’দিন বাস চলবে বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। তৃণমূল প্রভাবিত শ্রমিক সংগঠনও শহরে প্রচার করেছিল। কিন্তু, একটিও বাস চলেনি। বাস মালিক সূত্রে জানা যায়, রামপুরহাটে ৩৪টি রুটে ১৫০টি বাস চলাচল করে। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখা গেল, ১৫টির মতো বাস দাঁড়িয়ে। জেলা বাস মালিক সমিতির রামপুরহাট শাখার সম্পাদক জামারুল ইসলাম জানালেন, চালক থেকে কর্মী, খালাসিরা না আসায় বাস চালানো যায়নি। সিআইটিইউ প্রভাবিত ধর্মঘটের পক্ষে থাকা বীরভূম জেলা পরিবহণ শ্রমিক ইউনিয়নের রামপুরহাট শাখার সম্পাদক খাইরুল আলম বলছেন, ‘‘রামপুরহাটে বাস কর্মীদের মধ্যে বর্তমানে সিআইটিইউ-এর সদস্য ৩২৬ জন। কংগ্রেসের সমর্থনে আছেন ৭৫ জন। বিপরীতে তৃণমূল সমর্থিত ইউনিয়নে হাতে গোনা কয়েক জন মাত্র সদস্য আছেন। তাই ধর্মঘটের বিরোধীতা করে মালিক পক্ষ যতই বাস চালু রাখার জন্য প্রচার করুক, কর্মীরা ধর্মঘটকে সমর্থন করে কাজে আসেননি। তাই বাস চলেনি।’’

প্রথম দিনের ধর্মঘটে তেমন প্রভাব পড়েনি বোলপুরে। সরকারি দফতর, স্কুল, কলেজে ক্লাস হয়েছে। বাস চলাচলও স্বাভাবিক ছিল। বীরভূম ডিস্ট্রিক্ট বাস এবং মিনিবাস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক সুজিতকুমার মণ্ডল জানান, রোজকার মতোই সব বাস চলেছে। ধর্মঘটকে সমর্থনের আর্জি জানিয়ে এ দিনও বোলপুর শহরে পদযাত্রা করেন তপন হোড়, তপন সাহা, গৌতম ঘোষ, সমীর ভট্টাচার্য সহ বেশ কিছু সমর্থক। তপন সাহা বলেন, ‘‘আমরা কাউকে জোর করে দোকান বন্ধ করতে বলিনি কিংবা স্বাভাবিক জনজীবনে ব্যাঘাত ঘটানোর চেষ্টা করিনি।’’ তবে বোলপুর বারের সমস্ত কাজ বন্ধ ছিল। বোলপুর বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেবকুমার দত্ত এবং সম্পাদক শ্যামসুন্দর কোঁয়ার জানান, তাঁরা ঠিক করেছেন যে দলই ধর্মঘট ডাকুক না কেন, তাঁরা সে দিন কাজ করবেন না। ইলামবাজারও এ দিন স্বাভাবিকই ছিল। তবে ব্যাঙ্ক বন্ধ থাকায় সমস্যায় পড়েন সাধারণ মানুষ। 

জেলাসদর সিউড়িতেও বেসরকারি বাস স্বাভাবিকের তুলনায় কম ছিল। স্কুল, কলেজ অফিস কাছাড়ি সবই খোলা ছিল। রাস্তাতেও লোকজনের  উপস্থিতি নজরে এসেছে। সরকারি বাস চলেছে পর্যাপ্ত। দিনের শুরুতে দু’একটি ট্রেন দেরিতে এলেও পরে স্বাভাবিক ভাবেই ট্রেন চলাচল করেছে। সিউড়ি জেলা সদরে সরকারি অফিস কাছারিতে সরকারি কর্মীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক।

ধর্মঘটের সমর্থনে থাকা বাম সংগঠনের নেতাদের অবশ্য অভিযোগ, শাসকদল প্রশাসনকে কাজে লাগিয়ে, হুমকি দিয়ে এবং মানুষকে ভয় দেখিয়ে পথে নামতে বাধ্য করেছে। তার পরেও যে সাড়া মিলেছে সেটা অভূতপূর্ব। বেসরকারি বাস চলেনি বললেই চলে। দোকানপাঠের একটা বড় অংশ খোলা ছিল না বেলা পর্যন্ত। দুবরাজপুর, রাজনগরেও ধর্মঘটের সমর্থনে মিছিল হয়েছে। মানুষও অন্য দিনের তুলনায় অনেক কম পথে নেমেছেন। দিনভর দফায় দফায় ধর্মঘটের সমর্থনে মিছিল হয়েছে। সিউড়িতে সকাল ছ’টা একটি মিছিল হয় ধর্মঘটের সমর্থনে। বেলা দশটাতেও ধর্মঘটের সমর্থনেই ফের মিছিল হয়। তবে মানুষকে পথে নামতে বাধ্য করার কথা মানতে চায়নি তৃণমূল। জেলা তৃণমূলের এক নেতার কথায়, ‘‘এ রাজ্যে বন্‌ধ, ধর্মঘট এখন ইতিহাস। এখন আর কাউকেই কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। মানুষ স্বভাবেই কর্মনাশা ধর্মঘটের বিপক্ষে।’’