পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে প্রস্তাবিত ঠুরগা জল বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে হাইকোর্টে ধাক্কা খেল রাজ্য সরকার। প্রকল্পের জন্য সংশ্লিষ্ট গ্রামসভাগুলির অনুমতি মিলেছে দাবি করে পুরুলিয়ার জেলাশাসকের দেওয়া যে শংসাপত্র রাজ্য আদালতে জমা দিয়েছিল, মঙ্গলবার তা খারিজ করে দেন কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাক। নতুন করে গ্রামসভার অনুমতি নিতে হবে বলে বিচারক জানিয়েছেন। আইনজীবীদের দাবি, আইনমাফিক গ্রামসভার অনুমতি না নেওয়াতেই এই সিদ্ধান্ত। একই যুক্তিতে  রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থা ওই প্রকল্পের জন্য কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রক থেকে গত বছর যে অনুমতি পেয়েছিল, বিচারপতি বসাক সে অনুমতিও খারিজ করেছেন।

বিদ্যুৎমন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এ দিন বলেন, ‘‘নিয়ম অনুযায়ী, বিভিন্ন ছাড়পত্র নিয়ে ওই প্রকল্পের জন্য এগনো হয়েছিল। হাইকোর্ট যা নির্দেশ দিয়েছে, সেই অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ করা হবে।’’ পুরুলিয়ার জেলাশাসক রাহুল মজুমদার বলেন, ‘‘আদালতের নির্দেশ হাতে পাইনি। নির্দেশ পেলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’

অযোধ্যা পাহাড়ে দেড় দশক আগে পুরুলিয়া পাম্প স্টোরেজ প্রকল্প (পিপিএসপি) তৈরি করার পরে এ বার সেখানে দ্বিতীয় জল বিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করতে আগ্রহী রাজ্য সরকার। প্রশাসন সূত্রে খবর, ঠুরগা নালাকে ঘিরে প্রায় ২৩৪ হেক্টর জমিতে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ২৫০ মেগাওয়াট করে চারটি ইউনিটে মোট ১,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জলাধারের পাশে রয়েছে বাড়েলহর, তেলিয়াভাসা, হাতিনাদা, টাঁড়পানিয়া, ভুঁইঘড়া, শালডি প্রভৃতি গ্রাম।

ওই সব গ্রামের বাসিন্দাদের একটা বড় অংশের বক্তব্য, প্রকল্পের জন্য জঙ্গল কাটা পড়লে পরিবেশের যেমন ক্ষতি হবে, তেমনই জঙ্গলের উপরে নির্ভরশীল স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকাও বিপন্ন হবে। গত জানুয়ারিতে বাসিন্দাদের কিছু না জানিয়ে প্রকল্পের সমীক্ষার জন্য গাছকাটা হয় বলে অভিযোগ ওঠে। গ্রামবাসীর পাশে দাঁড়ান কিছু পরিবেশ কর্মীও। ওই প্রকল্পে গাছ কাটা যাবে না বলে ১৬৫ জন বাসিন্দা জেলাশাসক, বিদ্যুৎ দফতরে চিঠি দেন। তার পরেই বনভূমি ও বনভূমি সংরক্ষণ আইন মেনে স্থানীয় গ্রামসভার ৫০ শতাংশ সদস্যের অনুমতি নেওয়া হয়নি, এই অভিযোগ তুলে হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়।

মামলা করেন এলাকার আদিবাসী নেতা রবি বেসরা-সহ কয়েকজন। তাঁদের পক্ষের আইনজীবী অম্বর মজুমদার ও শান্তনু চক্রবর্তী জানান, মামলার আবেদনে বলা হয় রবিবাবুদের জীবন-জীবিকা এলাকার বনভূমির উপরে নির্ভরশীল। প্রকল্পের প্রয়োজনে নির্বিচারে গাছ কাটা হবে কি না, কেন্দ্রীয় বন আইনের নির্দেশিকা মেনে সে ব্যাপারে গ্রামসভার পূর্ণ সম্মতি নেওয়া হয়নি। প্রথম পর্যায়ে গাছকাটার উপরে স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছিল। পরে তা বাড়িয়ে ৩১ অগস্ট পর্যন্ত স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে।

ইতিমধ্যেই ওই প্রকল্পের বিরোধিতা করে জেলার সমস্ত ব্লক থেকে জেলাশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছে আদিবাসী সংগঠন ‘ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল’। আদালতের রায়ে খুশি আন্দোলনকারীদের অন্যতম পরিবেশকর্মী রাকেশ মুদলির দাবি, ‘‘গ্রামসভার নামে কিছু মানুষকে ডেকে সই-সাবুদ করানো হয়েছিল। সেটাই আদালতে জমা পড়েছিল। তা নিয়েই আমাদের আপত্তি ছিল। বনাধিকার আইন অনুযায়ী, এ ধরনের কোনও প্রকল্প করতে গেলে গ্রামসভা ডেকে প্রকল্পের সমস্ত কথা স্পষ্ট করে জানিয়ে পঞ্চাশ শতাংশ মানুষের সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে তা হয়নি।’’ যদিও জেলা প্রশাসন সে প্রসঙ্গে কোনও মন্তব্য করতে চায়নি।