একে দলের পরাজয়ের পরে বলরামপুরের তৃণমূল কর্মীরা মুষড়ে পড়েছিলেন। তারই মধ্যে দু’দিনের ব্যবধানে দুই দলীয় কর্মীর মৃত্যুর জেরে বলরামপুরে বিজেপি নেতৃত্বের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় তৃণমূল কর্মীদের অনেকেই কিছুটা হলেও চাপে পড়ে গিয়েছিলেন। শুক্রবার দুপুরে যখন কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী তথা বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় বলরামপুরে গেলেন, তার ঘণ্টাখানেক পরেই এক ঝাঁক নেতাদের সঙ্গে দলের কর্মীদের নিয়ে বলরামপুরে মিছিল করলেন জেলা তৃণমূল সভাপতি তথা মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো। 

পুরুলিয়ার বলরামপুরের সুপুরডি গ্রামের বিজেপি কর্মী ত্রিলোচন মাহাতোর ঝুলন্ত দেহের টি-শার্টে লেখা ছিল— ‘১৮ বছর বয়সে বিজেপি করা, এ বার বোঝ।’ সেই ঘটনার দু’দিনের ব্যবধানে বলরামপুরেরই ডাভা গ্রামের বিজেপি কর্মী দুলাল কুমারের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। ত্রিলোচনের ক্ষেত্রে পুলিশ খুনের মামলা রুজু করলেও, দুলালের দেহের ময়না-তদন্তের রিপোর্ট দেখিয়ে তারা দাবি করে, তিনি আত্মঘাতী হয়েছেন। যদিও দু’টিই খুন বলে দাবি বিজেপি নেতৃত্বের। সিবিআই তদন্ত চেয়ে মঙ্গলবার থেকে পুরুলিয়ায় জেলাশাসকের অফিসের সামনে বিজেপি নেতৃত্বের চার দিনের অবস্থান শুক্রবারই শেষ হয়েছে। 

এ দিন বলরামপুরে দাঁড়িয়েও বাবুল অভিযোগ করেন, ‘‘এখন সবাই জানে যা তৃণমূল তাই পুলিশ। তাই পুলিশের উপরে কারও আর ভরসা নেই। সিআইডি লোক দেখানো তদন্ত করছে।’’ এর পরেই তিনি বলেন, ‘‘মনে রাখতে হবে কেন্দ্রে একটা শক্তিশালী সরকার আছে। এই সন্ত্রাসের যোগ্য জবাব মানুষ দেবেই। আর দোষীরা যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায়, তার জন্য আমরা আইনিপথে লড়াই শুরু করেছি। সে জন্য যতদূর যেতে হয়, যাব।”

আর জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদে মিছিল করে শান্তিরাম দাবি করলেন, ‘‘বিজেপির নেতারা বলরামপুরে এসে রাজনীতি করে হাওয়া গরম করার চেষ্টা করছেন। বিজেপি আমাদের বিরুদ্ধে তদন্তে প্রভাব খাটানোর ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। ময়না-তদন্তের রিপোর্ট নিয়ে অভিযোগ তুলছে। দেশের সর্বত্র বিজেপি শাসিত রাজ্যে যে ভাবে ময়না-তদন্ত হয়, সে ভাবেই এখানেও ময়না তদন্ত করা হয়েছে। রাজনৈতিক রং না দেখে মৃত্যুর তদন্ত করতে পুলিশকে বলা হয়েছে।” 

বলরামপুরে তৃণমূলের পথসভায় মন্ত্রী শান্তিরাম মাহাতো। 

শান্তিরাম ছাড়াও মিছিলে ছিলেন দলের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজয় বন্দ্যোপাধ্যায়, সাংসদ মৃগাঙ্ক মাহাতো, মন্ত্রী সন্ধ্যারানি টুডু প্রমুখ। পুলিশের হিসেবে হাজার পাঁচেক লোক হয়েছিল। যদিও বিজেপির জেলা সভাপতি বিদ্যসাগর চক্রবর্তীর কটাক্ষ, ‘‘বলরামপুরে তৃণমূলের লোক কোথায় যে তারা বড় মিছিল করবে? বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক নিয়ে গিয়ে মুখ রক্ষার চেষ্টা করেছে তৃণমূল।’’

ওই দুই কর্মীর সঙ্গে ভোটের আগে দলীয় কর্মী জগন্নাথ টুডুর মৃত্যু নিয়েও সিবিআই তদন্তের দাবি তুলেছেন বিজেপি নেতৃত্ব। সেই দাবিতে পুরুলিয়া শহরে চার দিন ধরে রাজ্য নেতৃত্ব উপস্থিত থেকে মিছিল ও অবস্থান করে গিয়েছেন। রাজ্য নেতা সায়ন্তন বসু, লকেট চট্টোপাধ্যায় ছিলেন। বৃহস্পতিবার সেখানে আসেন দলের কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিংহ, এ দিন যোগ দেন বাবুল। তার আগে বজরং দলের সদস্যদের নিয়ে মোটরবাইকে বাবুল বলরামপুরে মিছিল করেন। 

বাবুলকে সামনে পেয়ে দুলালের বড় ছেলে আদিত্য তার কাছে দাবি করে, ‘‘বাবাকে যারা মেরেছে, তাদের যে ভাবেই হোক শাস্তি দিতে হবে।’’ দুলালের স্ত্রী মনিকা বাবুলকে জানান, তিন সন্তান নিয়ে স্বামীকে হারিয়ে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন। জানা গিয়েছে, বাবুল তাঁদের আশ্বাস দেন, এই ঘটনার পিছনে যারা রয়েছে, তারা যাতে উপযুক্ত শাস্তি পায়, দল সেই চেষ্টা চালাচ্ছে। গ্রামবাসীও দোষীদের কঠোর সাজা দেওয়ার দাবি তোলেন বাবুলের কাছে।

সুপুরডিতে এ দিন ত্রিলোচনের ক্ষৌরকর্ম ছিল। ত্রিলোচনের বড়দা বিবেকানন্দ বলেন, ‘‘বাবুল সান্ত্বনা দিতে এসেছিলেন। আমরা তাঁর কাছে একটাই দাবি জানিয়েছি, যারা ভাইয়ের এই পরিণতির জন্য দায়ি, তাদের এক জনও যেন ছাড়া না পায়, তা সুনিশ্চিত করতে হবে।’’ ত্রিলোচনের দাদা শিবনাথ দাবি করেন, সিবিআই তদন্ত হলেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব বলে তাঁরা মনে করেন। 

ছবি: নিজস্ব ও সুজিত মাহাতো