শহর জুড়ে মাইকে প্রচার শুরু হয়েছে, বাইরে বের হলে কোনও বিষয়ে বিতর্কে জড়াবেন না। কোনও রকম শোনা কথা বা গুজব প্রচার করবেন না। সোশ্যাল মিডিয়ায় সাম্প্রদায়িক বা সংবেদনশীল কোনও পোস্ট করবেন না। বরং বিতর্কিত বিষয়ে কোনও খবর পেলেই আইন নিজের হাতে তুলে না নিয়ে  পুলিশকে জানান। বুধবার দুবরাজপুর থানা এলাকায় এমনই প্রচার করল পুলিশ।

রাজ্য জুড়ে একদিকে স্বঘোষিত ‘দেশভক্ত’দের দাপাদাপি অন্যদিকে, গুজব আর ভুয়ো খবরের জেরে মারামারি, গণপিটুনির ঘটনাও ঘটেছে। যদিও বীরভূমে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটলেও পরিস্থিতি তুলনায় অনেক ভাল। কিন্তু আগাম সতর্কতা হিসাবে এভাবেই মাইকে প্রচার শুরু করল বীরভূম জেলা পুলিশ। রাজ্যে বিদ্বেষ রুখতে পুলিশের সব স্তরের কর্মীদেরকে কড়া হতে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তারপরেই তৎপরতা বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট মহল সূত্রে জানা গিয়েছে।  

 জেলার পুলিশ সুপার শ্যাম সিংহ বলেন, ‘‘জেলার বিভিন্ন থানায় প্রচার চলছে। আমরা সব সময় সতর্ক আছি। তবে এটাই প্রথম এমন নয়, প্ররোচনায় বিভ্রান্ত না হওয়া, শান্তি বজায় রাখা ও নিজের হাতে আইন তুলে না নেওয়ার বিষয়ে সচেতন করতে এমন প্রচার পুলিশের তরফে হয়ে থাকে।’’

তবে পুলিশের একটা অংশ বলছে কাশ্মীরে জওয়ানদের নিহত হওয়ার ঘটনার পরে গোটা দেশই উত্তাল হয়েছে। বিভিন্ন পোস্ট ও বক্তব্য ছড়িয়েছে। আর এই পরিস্থিতি সামলাতেই এমন পদক্ষেপ। এমনিতেই  রাজ্যের বিভিন্ন  অঞ্চলে  গুজবের জেরে কখনও ছেলেধরা, চোর সন্দেহে গণপিটুনি চলছেই। অন্য বিষয়টি হল, সাম্প্রদায়িক স্থিরতা নষ্ট করতে ফেসবুক,  টুইটার, হোয়াটস-অ্যাপের মতো নানা সোশ্যাল মিডিয়াকে হাতিহার করে কখনও ইচ্ছাকৃত, কখনও বা না বুঝেই বিতর্কের সৃষ্টি করছেন অনেকে। 

গত ১৪ তারিখ পুলওয়ামায় জঙ্গি হানার পর থেকে বিদ্বেষ ছড়ানোর প্রবণতা আরও বেড়েছে বলে মত প্রশাসনের করতাদের। পড়শি রাষ্ট্র ও কাশ্মিরীদের লক্ষ্য করেও বিদ্বেদ ছড়ানো হচ্ছে। অভিযোগ, যাঁরা তার প্রতিবাদ করছেন বা বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করছেন, তাঁদের বাড়িতে চড়াও হয়ে হামলা করছেন এক দল উগ্র ‘দেশপ্রেমিক’। সোশ্যাল মিডিয়ায় খুন, ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হচ্ছে, ছড়ানো হচ্ছে নানান গুজব।

কোনও বিষয়ে মন্তব্য বা মত প্রকাশের স্বাধীনতা এ দেশে যতই সাংবিধানিক অধিকার হোক, পুলওয়ামা কাণ্ডের পরে   সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের বক্তব্য রাখতে গিয়ে  বা কোনও পোস্ট নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন অনেকেই। জেলা পুলিশের এক কর্তা বলেন, ‘‘ক্রমাগত এমন ঘটনা ঘটতে থাকায় অসহিষ্ণুতা বাড়ছে। তাই একটা খবর পাওয়ার পরেই, সেটা ঠিক না ভুল যাচাই না করেই  সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন সাধারণ মানুষ। এটা ছোঁয়াচে রোগের মতো। একবার শুরু হলে থামানো কষ্টকর হয়ে যায়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অশান্তি রুখতে সচেতনতা প্রচারই সবচেয়ে ভাল উপায়। দু- একটি ঘটনায় দোষীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দিতে পারলেই এই প্রবণতা  অনেকটাই রোখা যাবে।’’  

জেলা পুলিশ সূত্রে খবর পুলওয়ামা কাণ্ডের পরে কারও কারও নামে ভুয়ো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলেও বিদ্বেষ ছড়ানোর চেষ্টা চলছে। সিউড়ি থানায় বুধবারই এক তরুণী এই মর্মে লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। ওই তরুণীর দাবি নিজের অজান্তেই তাঁর নামে একটি ভুয়ো ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। সেই অ্যাকাউন্টে পুলওয়ামা কাণ্ডের একটি আপত্তিকর ও সংবেদশীল পোস্টের সমর্থনে আপত্তিকর কমেন্ট করায় সবাই ভাবছেন তিনিই করেছেন। তাঁর দাবি, ‘‘আমাকে বিপদে ফেলতেই এটা করা হয়েছে। কে করেছে জানি না।’’ 

জেলা পুলিশের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, এ ভাবেই পুলিশের সহায়তা চাইলে অনেক সহজ হয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করা। সেই কারণেই সচেতনতার প্রচার চালানো শুরু হয়েছে।