সন্ধ্যা নামলেই ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অন্ধকারে ডুবে যায় মেয়েদের হস্টেল। পাশের বটগাছ থেকে ভেসে আসে পেঁচাদের ডাক। মোবাইল টাওয়ার থেকে শোনা যায় শকুনের চিৎকার। জানলায় পড়ত ঢিল। সে সব শুনে রক্ষী ও পাঁচিল ঘেরা হস্টেলে থেকেও কেঁপে উঠত ছাত্রীরা। তাতেই ইন্ধন জুগিয়েছে, সাধুর নিদান— ‘হস্টেলে মন্দ হাওয়া লেগেছে’। সে সবের জেরে পাঁচমুড়া মৃণালকান্তি বালিকা বিদ্যালয়ের আবাসিকেরা হস্টেল ছেড়ে ভয়ে বাড়ি পালিয়েছে বলে দাবি করেছেন হস্টেল সুপার ও কর্মীরা।

এই স্কুলে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সাতশোর উপর ছাত্রী পড়াশোনা করে। পাঁচমুড়া তো বটেই, আশপাশের আদকড়া, রক্তবেড়া, লোহা জঙ্গল, রেসাগোড়া, শ্যামসুন্দরপুর, জামবেদিয়ার মতো গ্রাম থেকে পাঁচ-সাত কিলোমিটার পথ সাইকেলে মেয়েরা স্কুলে আসে। দূর থেকে আসা মেয়েদের কথা ভেবেই ১৬ অগস্ট স্কুল লাগোয়া জমিতে চালু হয় দোতলার হস্টেল। রয়েছে পাঁচিল, জেনারেটর, রক্ষীও। ৫০ জনের থাকার ব্যবস্থা থাকলেও থাকত ৪৮ জন। কিন্তু, চালু হওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই গোলমালের শুরু।

রবিবার গিয়ে দেখা গেল, হস্টেলের দরজায় তালা ঝুলছে। কর্মীরা জানান, গত কয়েক দিন ধরেই একে একে হস্টেল ছেড়ে বাড়িমুখো হচ্ছিল ছাত্রীরা। শনিবার এক সঙ্গে ২২ জন বাড়ি চলে যায়। 

কিন্তু কেন? 

ছাত্রীরা বলছে, ‘‘পরিবেশটা ভাল না। ভয় লাগে। থাকতে পারলাম না।’’ হস্টেলের রাঁধুনি তপু দুলে, কর্মী সন্তোষী চক্রবর্তী বলেন, ‘‘পাঁচিল থাকলে কী হবে, চারদিক ঝোপে ভরা। তার উপরে ঘন ঘন লোডশেডিং। জেনারেটর খারাপ হয়ে পড়ে রয়েছে। শকুনের চিৎকার, পেঁচার ডাকে গা ছমছম করত। জানলাতেও ঢিল পড়তে শুরু করেছিল। সব মিলিয়ে মেয়েগুলো খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে।’’

হস্টেল সুপার তথা স্কুল শিক্ষিকা অনিতা ভুঁই নিজেও ছিলেন না। ফোনে তিনি বলেন, ‘‘কিছু দিন আগে লোহা জঙ্গল গ্রামের অষ্টম শ্রেণির এক পড়ুয়া অসুস্থ হয়ে পড়ে। বাড়ি নিয়ে গিয়ে তাকে ডাক্তার না দেখিয়ে স্থানীয় এক সাধুর কাছে নিয়ে যায়। তাবিজ দিয়ে সেই সাধু জানিয়েছেন, হস্টেলে নাকি বাজে হাওয়া লেগেছে! ছাত্রীরা রাতে নানা শব্দে এমনিতেই ভয়ে ছিল। ওই কুসংস্কারে ভয় আরও বেড়ে যায়।’’ তিনি জানান, এত কিছুর পরেও জনা চারেক ছাত্রী হস্টেলে থেকে গিয়েছিল। খামোখা আতঙ্কে থাকবে বলে তাদের বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সোমবার আসতে বলেছি।’’

অসুস্থ ছাত্রীর বাবার দাবি, ‘‘২৫ অগস্ট মেয়েকে বাড়ি ফিরিয়ে আনি। দিদিমণিরা বলেছিলেন, সোমবার স্কুলে ডাক্তার যাবে। মেয়েকে সে দিন নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু, ডাক্তার আর যায়নি। তাই সাধুর কাছে নিয়ে যাই। সাধু জানান, হস্টেলের খারাপ হাওয়া লেগেছে। তাই মেয়েকে আর স্কুলে পাঠাইনি।’’

স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন, এক সময় স্কুলের ভিতর নেশাড়ু ও দুষ্কৃতীদের আড্ডা ছিল। হস্টেল শুরু হতেই আসার উঠে যায়। তাঁদের ধারণ, দুষ্কৃতীরা ভয় দেখাতে হস্টেলে ইট-পাটকেল ছুড়তে পারে। হস্টেল সুপারের অভিযোগ, ‘‘জেনারেটর সারানো থেকে নিরপত্তা বাড়ানোর জন্য বহুবার জানিয়েছি। বিডিওকেও (তালড্যাংরা) বলেছি। 

স্কুলের পরিচালন সমিতির সভাপতি জয়দেব গড়াই দাবি করেন, ‘‘জেনারেটর সারানো হবে। তবে হস্টেলে সিভিক কর্মী পাহারা দেন। পাঁচিল থাকায় দুষ্কৃতীরা আসতে পারে না। কুসংস্কার ছড়ানোর জন্য ওই সাধুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্কুলের পরিচালন সমিতির বৈঠক ডাকা হচ্ছে।’’ অনেকে বলছেন, সময়ে স্কুলে ডাক্তার এলে ওই ছাত্রীকে হয়তো সাধুর কাছে নিয়ে যাওয়া হতো না। ডাক্তার এল না কেন? ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা গীতা হাঁসদাকে চেষ্টা করেও ফোনে ধরা যায়নি। 

সব শুনে বিডিও (তালড্যাংরা) সৌরভ মজুমদার বলেন, ‘‘সমস্যাটা শুনেছি। কোনও কারণে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। এক সপ্তাহ কাজে যোগ দিয়েছি। জেনারেটরের সমস্যার কথা জানতাম না।’’ তিনি জানিয়েছেন, আজ, সোমবার স্কুলে যেতে পারেন। বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মীদের নিয়ে নিয়ে ছাত্রীদের সচেতন করা ও স্বাস্থ্য শিবিরও করা হবে।