মিনিট পনেরোর শিলাবৃষ্টি। আর তার জেরেই মাথার উপরে ছাদ হারিয়েছেন পুরুলিয়া শহরের বহু এলাকার মানুষজন। ক্ষতিগ্রস্তদের একাংশ সোমবার দ্বারস্থ হলেন জেলা প্রশাসনের।

এ দিন শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে মহিলারা হাজির হয়েছিলেন জেলাশাসকের দফতরে। তাঁরা জেলাশাসকের গাড়ি বারান্দার কাছে মহিলারা বসে পড়েন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে তাঁদের অন্য পাশে সরিয়ে দেয়। বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে ওই মহিলাদের হয় কোনও ওয়ার্ডের কোনও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন। অনেককে আবার নিয়ে এসেছিলেন বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতারা।

রবিবার শেষ বিকেলে আকাশ কালো করে ঝড় শুরু হয় পুরুলিয়া শহরে। ঝড় বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। তার মাঝেই শুরু হয়ে যায় শিলাবৃষ্টি। মিনিট পনেরোর টানা শিলাবৃষ্টিতে তছনছ হয়ে যায় শহরের বিভিন্ন এলাকা। নিমটাঁড়, ভুইয়াঁপাড়া, সিন্দারপট্টি, কার্তিকডি, বেলগুমা, ভাটবাঁধ, মুন্সেফডাঙ্গা, আমডিহা, তেলকল পাড়া, চিড়াবাড়ি, রেনি রোড-সহ শহরের বিভিন্ন এলাকায় শিলের আঘাতে প্রচুর বাড়ির মাটির খোলার চালা, অ্যাসবেস্টস ও টালির চালা ফুটো হয়ে যায়। ভেঙে যায় পাকা বাড়ির জানলার কাচ। ফুটো হয়ে গিয়েছে বেশ কিছু বাড়ির ছদের উপরে থাকা জলের ট্যাঙ্কও। পুরভোটের মুখে শিলাবৃষ্টির দাপটে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির ক্ষোভ বাড়তে পারে, সেটা আঁচ করে রবিবার রাতেই বিভিন্ন ওয়ার্ডের ভোট প্রার্থীরা নিজের নিজের মতো করে ক্ষতিপূরণ বা ত্রাণ দেওয়ার কাজে আসরে নেমে পড়েন।

  এ দিন জেলাশাসকের অফিস চত্বরে দাঁড়িয়েছিলেন সিন্দারপট্টি এলাকার বেলি বাউরি, রেশমা বেগম, লক্ষ্মী বাউরি, প্রতিমা বাউরিরা। তাঁদের স্বামীরা কেউ রিকশা চালান, কেউ পুরসভার অধীনে ঝাড়ুদারের কাজ করেন, কেউ বা ফ্ল্যাটে পাহারাদারের কাজ করেন। ওই মহিলাদের কথায়, ‘‘শিলাবৃষ্টিতে আমাদের ঘরের চালা ভেঙে গিয়েছে। চালা সারানোর মতো আমাদের আর্থিক সামর্থ্য নেই। তাই জেলা প্রশাসনের সাহায্য চাইছি।’’ বিধবা হিমানী বাউরি বলেন, ‘‘আমার টালির চালা পুরো ফুটো হয়ে গিয়েছে। দু’টি ছোট বাচ্চাকে নিয়ে কোনও রকমে রাতটা কাটিয়েছি।’’ ওই এলাকারই বাসিন্দা বন্দনা মুখোপাধ্যায়, পান্থী বাউরিরা আবার জানিয়ে দেন, ভাঙা ছাদ সারিয়ে না দিলে তাঁরা ভোটও দেবেন না। ইদগামহল্লা থেকে ডিএম অফিসে এসেছিলেন শেখ চাঁদ। তিনি বললেন, ‘‘আমি রিকশা চালাই। মাটির খোলার চালা ভেঙে গিয়েছে। কী করে সারাব, জানি না।’’ ওই এলাকার কংগ্রেস প্রার্থী শেখ রাজুও তাঁর কথায় সমর্থন জানান। এক দল মহিলাকে নিয়ে এসেছিলেন সিপিএমের পুরুলিয়া শহর জোনাল কমিটির সম্পাদক কৌশিক মজুমদার। সঙ্গে অন্য নেতারাও ছিলেন। কৌশিকবাবু বললেন, ‘‘বিভিন্ন ওয়ার্ডে অনেক গরিব লোকের বাড়ির টালি বা অ্যাসবেস্টসের চালা শিলে নষ্ট হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে তাঁদের জন্য ত্রাণ চাইতে এসেছি।’’

একই অবস্থা শহরের নিমটাঁড় এলাকায়। সেখানকার বাসিন্দা পৃথ্বীরাজ দে বলেন, ‘‘রবিবার রাতের মতো অভিজ্ঞতা আমার আগে হয়নি। অ্যাসবেস্টসের চাল। তিনটি ঘরের চালাতেই একাধিক বড়বড় ফুটো হয়ে গিয়েছে। যখন শিলা পড়ছিল চালে প্রচণ্ড শব্দ হচ্ছিল। আচমকা দেখলাম চালা ফুটো করে ঘরের মেঝেতে শিল পড়তে শুরু করল। ভয় পেয়ে দেওয়ালে সিমেন্টের তাকের নীচে দাঁড়ালাম ঘরের সকলকে নিয়ে। মিনিট দশেক বা তার একটু বেশি সময় ধরে শিলাবৃষ্টি চলল। আরও কিছুক্ষণ চললে ক্ষতি বাড়ত।’’ ওই এলাকারই বাসিন্দা, সরস্বতী বাউরি বলেন, ‘‘বৃষ্টির সময়টা সময় খোলার চালাঘরে কী ভাবে বাচ্চা নিয়ে কাটিয়েছি, ঈশ্বর জানেন।’’ রবিবারের এই বৃষ্টি একই ভাবে ক্ষতি করেছে পুরুলিয়া ২ ও লাগোয়া হুড়া ব্লকের একাধিক গ্রামেও। বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জেলা পুলিশ অফিসও। এই অফিসের চালা অ্যাসবেস্টসের। পুলিশ সুপার রূপেশ কুমার বলেন, ‘‘আমাদের অফিসের চালাও শিলাবৃষ্টিতে ভালই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’’

জেলাশাসক তন্ময় চক্রবর্তী জানিয়েছেন, শিলাবৃষ্টিতে শহর ও লাগোয়া ব্লকগুলির কিছু জায়গায় বেশ কিছু চালাঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুরসভার নিবার্হী আধিকারিককে ত্রাণের বিষয়টি দেখতে বলা হযেছে। তাঁর আশ্বাস, ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ দেওয়া হবে। প্রয়োজনে আরও ত্রাণ আনানো হবে। পুরুলিয়া পুরসভার নিবার্হী আধিকারিক দিলীপকুমার পাল বলেন, ‘‘ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির আবেদনের ভিত্তিতে কাদের ত্রাণ দেওয়া হবে, তা দেখা হচ্ছে।’’