হোমে-যজ্ঞে লাগছে না, অথচ মাসে মাসে গুনতে হচ্ছে থোক টাকা। বাঁকুড়া জেলার কিসান মান্ডিগুলির অবস্থার কথা বলতে এমনই আক্ষেপ শোনা যাচ্ছে জেলা প্রশাসনিক কর্তাদের একাংশের গলায়। রাখঢাক না রেখে অনেকেই বলছেন, ‘‘জেলায় কিসান মান্ডি গড়ে এখন দফতরের কার্যত হাতি পোষার দশা!

কৃষকেরা যাতে ফসলের ন্যায্য দামে ফসল বিক্রি করতে পারেন, সে জন্যই মুখ্যমন্ত্রীর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে প্রতিটি জেলায় বেশ কয়েকটি করে কিসান মান্ডি গড়ে তোলা হয়। সেখানে ফসল বিক্রি ছাড়া, অন্য দোকান এবং ফসল সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা করা হয়। তা হলে সেগুলি চলছে না কেন? 

জেলা কৃষি বিপণন দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে, বাঁকুড়া জেলায় ‌মোট ন’টি কিসান মান্ডি তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে বাঁকুড়া শহরের নতুনচটি এলাকার কিসান মান্ডিটি বাদ দিলে, বাকি আটটি কার্যত বন্ধ। জয়পুর ব্লকের কিসান মান্ডিতে কিছু স্টল ব্যবসায়ীরা খুললেও, বাকি সাতটি কিসান মান্ডি একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়ে রয়েছে। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, মান্ডিগুলির পরিকাঠামো উন্নত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সে সবের অবস্থান লোকালয় থেকে দূরে। ফলে, দোকান খুললেও ক্রেতা পাওয়া মুশকিল।

অথচ প্রতিটি মান্ডিতেই বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। রাতে বাতিও জ্বালানো হয়। যার জন্য মাস পোহালে বিদ্যুতের বিলই আসছে ৮০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা! যা গুনতে হচ্ছে কৃষি বিপণন দফতরকে। 

ওই টাকা তুলতে গত দু’বছর ধরে জেলার কিসা নমান্ডিগুলিকে ‘লিজে’ দেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে দফতর। সে জন্য একাধিক বার তারা নোটিসও দেয়। কিছু ব্যবসায়ী এগিয়ে আসেন। কিন্তু নানা কারণে ‘লিজ’ দেওয়ার প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব হয়নি। 

দফতরের আধিকারকদের একাংশ এর কারণ হিসেবে জানাচ্ছেন, মান্ডিগুলি চলছে না দেখে পরিস্থিতির সুযোগ নিতে ব্যবসায়ীরা জলের দরে ‘লিজ’ নিতে চাইছেন। যা দফতরের পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এই পরিস্থিতিতে কী করণীয় তা ভেবে পাচ্ছেন না কৃষি বিপণন দফতরের আধিকারিকেরা। বাঁকুড়া জেলা কৃষি বিপণন দফতরের এক আধিকারিকের স্বীকারোক্তি, “কিসান মান্ডিগুলি যেন আমাদের ঘাড়ে যেন পাহাড় প্রমাণ বোঝা হয়ে উঠেছে।”

যদিও তা মানতে নারাজ কৃষি বিপণন দফতরের জেলা আধিকারিক আকবর আলি বলেন, “কিছুই হচ্ছে না, এমনটা বলা যাবে না। কারণ, বছরে কয়েক মাস ধান কেনার জন্য বন্ধ থাকা মান্ডিগুলি খোলা হয়।”

 কিন্তু কিসান মান্ডিতে ধান বিক্রি করতে কৃষকেরাও তো আগ্রহ তেমন দেখান না বলে অভিযোগ। সেই প্রসঙ্গ টেনে কৃষকসভার বাঁকুড়া জেলা সম্পাদক যদুনাথ রায় বলেন, “নদী, নালা, খাল, জঙ্গল পার হয়ে মোটা অঙ্কের গাড়ি ভাড়া খরচ করে কোন চাষি মান্ডিতে ধান বিক্রি করতে যাবেন? শেষে ধান পরিবহণের যা খরচ পড়বে, সেই টাকাই উসুল হবে না।” 

তিনি যুক্ত করেন, “আমরা প্রথম থেকেই বলে আসছিলাম, কিসান মান্ডিগুলির স্থান নির্ণয় ঠিক হচ্ছে না। এর থেকে জেলার চালু হাটগুলির উন্নয়ন ঘটালে চাষিরা প্রকৃতই উপকৃত হতেন।” 

চাষিদের তরফে স্থানীয় হাটগুলির উন্নয়নের দাবি তোলা হচ্ছে বলে বলে মানছেন জেলার উপকৃষি অধিকর্তা সুশান্ত মহাপাত্রও। জেলা কৃষি বিপণন দফতর সূত্রে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চালিয়ে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের ৯০টি হাটের তালিকা তৈরি করা হয়েছে কৃষি বিপণন দফতর থেকে। ওই হাটগুলির বর্তমান অবস্থার রিপোর্ট রাজ্যের কাছে দফতর পাঠিয়েছে বলে সূত্রের খবর।

রাজ্যের অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের ভাইস চেয়ারম্যান তথা বাঁকুড়া জেলা পরিষদের সহ-সভাধিপতি শুভাশিস বটব্যাল বলেন, “সমস্যাটি আমাদের নজরে রয়েছে। ব্যবসায়ীরা যদি ন্যায্য মূল্য দিয়ে লিজ নিয়ে মান্ডিগুলিতে ব্যবসা করতে চান, তা হলে ভাল, না হলে ছাতনার কিসানমান্ডিটি আমরা শুশুনিয়া কৃষি মহাবিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে ভাবছি। বাকিগুলিও কী ভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে।”