দিন-বদল
বারবার গ্রাম-দখলের রাজনীতিতেই অশান্তি
শাসকদলকে টক্কর দিতে তাই এক সময়ের বাম কর্মী-সমর্থকেরা আশ্রয় হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন পদ্মফুলকেই। একটা সময় পাড়ুই ও ইলামবাজারে তৃণমলের সংগঠনে ভাঙন ধরতে শুরু করে।
Panrui

রণক্ষেত্র: অশান্ত পাড়ুইয়ে নিরাপত্তাবাহিনী। ফাইল চিত্র

বাম জমানায় ছিল কেশপুর-নন্দীগ্রাম। তৃণমূলের শাসনে তখন পাড়ুই!

সময়টা ২০১৪ সালের লোকসভা ভোটের লোকসভা ভোটের পরে পরেই। ছবি সেই নন্দীগ্রামের মতোই। গ্রাম জুড়ে সশস্ত্র দুষ্কৃতীদের তাণ্ডব। বোমার ধোঁয়ায় ঢাকা চারপাশ। মাস্কেট থেকে মুহূর্মুহূ গুলি। রক্তাক্ত লাশ আর শয়ে শয়ে আতঙ্কিত মুখ। লড়াইয়ের নেপথ্যে এ রাজ্যের সেই চেনা এলাকা দখল-পুনর্দখলের রাজনীতি। মারের জবাবে পাল্টা মারের রাজনীতিতে পাঁচ বছর আগের সেই সময়ে উত্তাল পাড়ুই। লোকসভা ভোটের পর থেকেই এই জেলাতেও তৃণমূলের মধ্যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। পাড়ুইও তার ব্যতিক্রম ছিল না। যতদিন গিয়েছে এলাকায় এলাকায় শাসকদলের দ্বন্দ্ব ক্রমশ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল শাসকদলের এক শ্রেণির নেতাদের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্য, দুর্নীতির অভিযোগ।

তখন সিপিএমের সংগঠন তলানিতে। শাসকদলকে টক্কর দিতে তাই এক সময়ের বাম কর্মী-সমর্থকেরা আশ্রয় হিসাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন পদ্মফুলকেই। একটা সময় পাড়ুই ও ইলামবাজারে তৃণমলের সংগঠনে ভাঙন ধরতে শুরু করে। একাধিক সংখ্যালঘু-প্রভাবিত গ্রামে বিজেপি-র উত্থান তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্বেরও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।  ওই তল্লাটের বাম সমর্থকদের বড় অংশ তো বটেই, বহু বিক্ষুব্ধ তৃণমূল নেতা-কর্মী ও সমর্থকরা যোগ দিতে শুরু করেন গেরুয়া শিবিরে। সেই সময় বীরভূম বিজেপি-র সভাপতি তথা এ বারের লোকসভা ভোটের প্রার্থী দুধকুমার মণ্ডলের হাত ধরে এ রাজ্যে বিজেপির মুখ হিসেবে উঠে এসেছিল পাড়ুই। ২০১৪ সালের জুলাইয়ে বোলপুর ডাকবাংলো মাঠের  জনসভা থেকে সেই সময়কার বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী বলে পরিচিত কসবা অঞ্চলের  নিমাই দাস, হৃদয় ঘোষ, নিখিল পাল, নারায়ণ ভান্ডারী, সাওোর অঞ্চল থেকে শেখ রেজাউল, শেখ অমর, পাড়ুই থেকে দেবকুমার মুখোপাধ্যায়, শেখ সামাদ, অবিনাশপুর অঞ্চল থেকে লালবাবু সেখ, মঙ্গলডিহি অঞ্চল থেকে সদাই শেখ, শেখ আনন্দ-সহ প্রায় ৫০০ জন কর্মী বিজেপিতে যোগদান করেন। 

বিজেপি যত বাড়তে থাকল, ততই অশান্ত হল এলাকা। শুরু হল গ্রাম দখলের রাজনীতি। তৃণমূল-বিজেপির রক্তক্ষয়ী টক্কর। বোমা-গুলির লড়াই এবং পরপর প্রাণহানির জেরে তখন টানা সংবাদ শিরোনামে থেকেছে এই জনপদ। এমন একটা দিন ছিল না, যখন রাতবিরেতে ঘুম ভাঙত না বোমা গুলির শব্দে! মঙ্গলডিহি, কসবা, বাতিকার,  বনশঙ্কা, অবিনাশপুর, মাখড়া, চৌমণ্ডলপুরের মতো গ্রাম তখন জ্বলছে হিংসার রাজনীতিতে। ২০১৪ সালে ২৪শে অক্টোবর মাখড়ায় এই সংঘর্ষ চরম আকার নেয়। গ্রাম দখল নেওয়ার জন্য আসা মাস্কেট বাহিনীর সঙ্গে বিজেপি কর্মীদের লড়াইয়ে এক দিনে তিনটি প্রাণ চলে যায়। রাজ্য রাজনীতি জ্বলে ওঠে ওই ঘটনায়। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরব হয় বিজেপি তথা বিরোধী দলগুলি। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে বদল হয়েছেন পাড়ুই থানার ছ-ছ’জন ওসি! 

একের পর এক বিরোধী নেতানেত্রী সেই সময় পাড়ুইয়ের  মাটিতে পা রাখতে শুরু করেন। যদিও ঘটনা হল, বিজেপি ওই সময় পাড়ুইয়ে যে সংগঠন গড়ে তুলেছিল, তা পরে আর ধরে রাখতে পারেনি। একটা সময় যে বিজেপি নেতাদের নিত্য আনাগোনা ছিল পাড়ুইয়ে, আস্তে আস্তে তাঁদের পা-পড়াও বন্ধ হয়ে গেল। এলাকাতেও যোগ্য নেতৃত্বের অভাবে ভাঙন ধরতে লাগল সংগঠনে। পাড়ুইয়ের ভোল বদলাতে শুরু করল কয়েক মাস পর থেকেই। আবার একটা লোকসভা ভোটের মুখে মাখড়া, চৌমণ্ডলপুর ঘুরে গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলতেই ধরা পড়ল তাঁদের ক্ষোভ। কসবার নিখিল পাল, বিকাশ মণ্ডলেরা বলে দিলেন, ‘‘মিথ্যা মামলা দিয়ে বহু বিজেপি সমর্থককে সেই সময় জেলে পুরে দেওয়া হল। কিন্তু, পরে তাঁরা কেমন আছেন, তার খোঁজ পর্যন্ত নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেননি দলের নেতারা!’’ 

এই ক্ষোভ তৃণমূলের ঘুরে দাঁড়ানোয় সাহায্য করেছে। ঠিক এক বছরের মাথায় বিজেপিতে চলে যাওয়া অসংখ্য গ্রামবাসী ২০১৫ সালের জুলাইয়ে অনুব্রত মণ্ডলের হাত ধরে ফের তৃণমূলে যোগদান করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কসবা অঞ্চলের হৃদয় ঘোষও। যাঁর বৃদ্ধ বাবা সাগরচন্দ্র ঘোষকে ২০১৩ সালের পঞ্চায়েত ভোটের ঠিক পরে গুলি করে খুনের অভিযোগ উঠেছিল শাসকদলের বিরুদ্ধেই।  হৃদয় তার পরেই যোগ দিয়েছিলেন বিজেপি-তে। এখন আবার তৃণমূলে কেন? হৃদয়ের স্পষ্ট জবাব, ‘‘বিজেপিতে যাওয়া একটা ভুল হয়েছিল। যার জন্য জীবনের অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গিয়েছে। ওই সময় বিজেপি করার জন্য অনেক মিথ্যা মামলার আসামি করে দেওয়া হয়েছিল আমাকে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার তৃণমূলে ফিরে এসেছি।’’ 

এখন আর পাড়ুইয়ে বিরোধীরা দাঁত ফোটাতে পারেন না বলেই তৃণমূল নেতৃত্বের দাবি। যদিও পাড়ুইয়ের বিজেপি নেতা শেখ সামাদের বক্তব্য, ‘‘২০১৫-র শেষ দিকে অনেক বিজেপি সমর্থক তৃণমূলে যোগদান করেন, সেটা ঠিকই।  সেই সময় কিছুটা হলেও সংগঠন ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু আবার আমরা ধীরে ধীরে পাড়ুই অঞ্চলে সংগঠন গড়ে তুলছি।’’ 

সত্যিই কি তাই?