কারও বাড়ির দেওয়াল ভেঙে পড়েছে, কারও বাড়িতে ভেঙেছে চালের কাঠামো। যে কোনও সময় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়তে পারে সে সব বাড়ি। কিন্তু নতুন বাড়ি তৈরি বা পুরনোর সংস্কারের আর্থিক সার্মথ্য নেই সে সব পরিবারের। অভিযোগ, মেলেনি সরকারি সাহায্যও। স্থানীয় সূত্রে খবর, তাই নানুরের রুইপুর গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে বিপজ্জনক ভাবে থাকছেন কয়েকটি পরিবার। প্রশাসনের সে দিকে নজর নেই বলে অভিযোগ।

প্রশাসনিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, দুঃস্থ ও গৃহহীন পরিবারের বাড়ি তৈরির জন্য কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য সরকারের বিভিন্ন আবাসন প্রকল্প রয়েছে। তার মধ্যে অন্যতম প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা বা এ রাজ্যে বাংলা আবাস যোজনা, গীতাঞ্জলি, আমার ঠিকানা, নিজভূমি নিজগৃহ আবাসন প্রকল্প। এ ছাড়াও সংখ্যালঘু স্বামীহারা মহিলাদের বাড়ি তৈরির জন্য বিশেষ অনুদানও বরাদ্দ রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় ২০১১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের পারিবারিক সমীক্ষায় তালিকাভুক্ত পরিবারগুলি আর্থিক স্থিতির ক্রমানুসারে বাড়ি তৈরির জন্য চার দফায় ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা করে পায়। শুধু তাই নয় , ওই বাড়ি তৈরির জন্য শ্রমিকের বেতনও জবর্কাডের মাধ্যমে বরাদ্দ করা হয়। রাজ্য সরকারের গীতাঞ্জলি ও আমার ঠিকানা প্রকল্পে বিপিএল তালিকাভুক্ত ও তার বাইরে থেকে যাওয়া প্রকৃত দুঃস্থ ও গৃহহীন পরিবারগুলিকে দু’দফায় ৭০ হাজার টাকা বাড়ি তৈরির জন্য অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়। তবে ওই তিনটি আবাসন প্রকল্পের ক্ষেত্রেই বাড়ি তৈরির জন্য উপভোক্তা পরিবারের বৈধ কাগজপত্র সহ নিজস্ব জায়গা থাকা প্রয়োজন৷ নিজভূমি নিজগৃহ প্রকল্পে নিজস্ব জায়গা না থাকলেও চলে। প্রশাসন ওই সব উপভোক্তা পরিবারের নামে বাড়ি তৈরির জন্য খাসজমি পাট্টা দেওয়ার পাশাপাশি ৭০ হাজার টাকা অনুদান দেয়।

কিন্তু রুইপুর গ্রামের কয়েকটি পরিবার ওই সব আবাসন প্রকল্পের বাইরে থেকে গিয়েছেন বলে অভিযোগ। প্রশাসনিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই গ্রামে প্রায় ৩৪০টি পরিবারের বাস। তার মধ্যে ১৪০টি পরিবার দারিদ্রসীমার নীচে রয়েছে। রেশিরভাগের জীবিকাই দিনমজুরি।

গ্রামবাসীদের একাংশের দাবি, বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পে বিভিন্ন সময় ওই গ্রামের প্রায় ৩০টি পরিবার বাড়ি তৈরির জন্য সরকারি অনুদান পেয়েছে। অন্য পরিবারগুলির মধ্যে কয়েকটি ভগ্নপ্রায় বিপজ্জনক বাড়িতে বসবাস করছে। অভিযোগ, প্রশাসনের সব স্তরে জানিয়েও বাড়ি তৈরির অনুদান মেলেনি।

অনেত দিন আগে স্বামী ও ছেলেকে হারিয়েছেন ৬৫ বছরের ভাগ্যবতী দাসবৈরাগ্য। মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। ছাগল পালন করে কোনও ভাবে তাঁর সংসার চলে। তিনি জানান, অনেক দিন আগে থেকেই তাঁর মাটির বাড়ির দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। চালের কাঠামোর একাংশ ভেঙে পড়েছে। বাড়িটি আস্তে আস্তে বসে যাচ্ছে। ওই বাড়িতে থাকছেন ওই বিধবা। একই অবস্থা ৫৫ বছরের বিপদতারণী কর্মকারের বাড়িরও। তিনিও দীর্ঘদিন আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। পরের বাড়িতে মুড়ি ভেজে পেট চলে। দু’জনেই বলেন, ‘‘বিপদ মাথায় নিয়ে ভাঙা বাড়িতে থাকছি। বাড়ি তৈরির জন্য সরকারি অনুদান পাইনি।’’ গোঁরাচাদ ভাণ্ডারি, অঞ্জলি থান্দার জানান, প্রশাসনের সব স্তরে আর্জি জানিয়েও বাড়ি তৈরির অনুদান মেলেনি। তাই গ্রামের কয়েকটি পরিবারকে বিপজ্জনক বাড়িতে থাকতে হচ্ছে।

বিজেপির নানুর মণ্ডল কমিটির সভাপতি বিনয় ঘোষের অভিযোগ, শুধু রুইপুর গ্রাম নয়, আশপাশের অনেক গ্রামেই প্রকৃত প্রাপকেরা বাড়ি তৈরির অনুদান পাচ্ছেন না। শাসকদল টাকাপয়সা লেনদেনের ভিত্তিতে নিজেদের পছন্দের লোকেদের অনুদান পাইয়ে দিচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার করে নানুর পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি মধুসূদন পাল বলেন, ‘‘প্রকৃত দুঃস্থ পরিবারগুলিকেই বাড়ি তৈরির অনুদান দেওয়া হয়। ওই গ্রামের ক্ষেত্রে কী হয়েছে তা খোঁজ না নিয়ে বলতে পারব না।’’ দাসকলগ্রাম-কড়েয়া ১ পঞ্চায়েতের প্রধান মৃন্ময় মাঝি বলেন, ‘‘প্রকৃত গৃহহীন পরিবারের নাম ব্লকে পাঠিয়েছি। কেন এখনও ওই সব পরিবার অনুদান পায়নি তা ব্লক অফিসই বলতে পারবে।’’

নানুরের বিডিও অরূপ মণ্ডল জানান, ওই বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দেখে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।