শীত পড়লেও আনাজের দাম নাগালের বাইরে। তারই মধ্যে মুরগির ডিমের দর তেড়েফুঁড়ে ওঠায় হেঁশেল টানতে নাকাল গৃহস্থ। কোনও কোনও পরিবার লুকোছাপা না করেই জানাচ্ছেন, আধখানা করে ডিম পাতে দিচ্ছেন। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে, সে ব্যাপারে কোনও আশা দিতে পারছেন না পোল্টি ফার্মের মালিকেরাও।

বাঁকুড়া জেলার বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গিয়েছে, ডিমের দর ওঠা নামা শুরু হয়েছিল গত দু’সপ্তাহ ধরেই। এখন প্রায় হাতের বাইরে চলে যেতে বসেছে। ছ’টাকা থেকে সাত টাকাতেও প্রতিটি ডিম বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্রেতারই বক্তব্য, ডিম যেন জুজু। কিনতে গেলেই চড়া দামের ভয় দেখাচ্ছে।

মধ্যবিত্তের পাতে কম খরচে আমিষের ছোঁয়া লাগাতে বড় ভরসা বলতে ছিল ডিম। তবে বাজার দরের যা অবস্থা, তাতে কার্যত মাছের সমকক্ষই হয়ে দাঁড়িয়েছে সে। বাঁকুড়ার বাজারে দু’সপ্তাহ আগেও সাড়ে চার টাকা দরে পোল্ট্রি মুরগির ডিম মিলছিল। কিছু দিন আগে তা পৌঁছে গিয়েছিল সাত টাকায়। সদ্য দর নেমে এসেছে ছ’টাকায়। ডিমের দর বাড়ার প্রভাব সার্বিক ভাবেই জেলার জনজীবনে পড়েছে। বাঁকুড়ার যোগেশ্বর পল্লির বাসিন্দা সুব্রত দত্ত বলেন, “ডিমের দর চার থেকে সাড়ে চার টাকার মধ্যে দেখতেই আমরা অভ্যস্ত। এখন যা পরিস্থিতি পরিবারের সকলের জন্য ডিম কিনতে গেলে গড়পড়তা মাছের থেকেও বেশি খরচ পড়ে যাচ্ছে।” বিষ্ণুপুরের বাহাদুরগঞ্জের তনিমা দে বলেন, ‘‘বড় সংসার। বাধ্য হয়ে গোটা ডিম খাওয়া ছেড়ে, অর্ধেক ডিম রান্না করছি।’’

এই অবস্থায় বাঁকুড়ার হোটেল মালিকেরাও খাবারের দাম কিছুটা বাড়াতে বাধ্য হয়েছেন। শহরের মাচানতলা সংলগ্ন একটি ছোট হোটেলের ব্যবসায়ী তরুণকুমার হালদার বলেন, “ডিম-ভাত ৩০ টাকা থেকে বেড়ে ৩২ টাকা করা হয়েছে। যাঁরা নিয়মিত ডিম-ভাত খেতেন, তাঁদের অনেকেই এখন নিরামিষ খাবার চাইছেন।’’ রাস্তার ধারের কিছু ফাস্ট ফুড ব্যবসায়ীও জানাচ্ছেন, ডিমের আইটেন তাঁরা কমিয়ে দিয়েছেন।

বিষ্ণুপুর বৈলাপাড়ার সুফল বাংলা বিপণীতে গিয়ে দেখা গিয়েছে, সেখানেও রীতিমতো পোস্টার সেঁটে মুরগির ডিম ছ’টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা উদয়ভানু মণ্ডল বলেন, ‘‘এক মাস আগেও এখানে সাড়ে চার টাকায় ডিম কিনেছিলাম। ভাবলাম সরকারি বিপণীতে খোলা বাজারের তুলনায় ডিমের দাম একটু কম থাকবে। কিন্তু কোথায় কী?’’

সাফাই দেন বাঁকুড়া জেলা সুফল বাংলার নোডাল অফিসার আকবর আলি। তিনি বলেন, ‘‘আসলে ডিমের জোগান কম হওয়াতেই দাম বেড়ে গিয়েছে। আমরাও আলোচনায় বসেছি। বাজারে দাম কমলে আমরাও কমাব।’’

স্বস্তিতে নেই ডিম ব্যবসায়ীরাও। বাঁকুড়ার মাচানতলা মোড়ের ব্যবসায়ী তরুণ দাস বলেন, “ডিমের বিক্রি এক ধাক্কায় কমে গিয়েছে অনেকটাই। কাটতি না হলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।” এই রকম হারে ডিমের দাম বৃদ্ধি গত ত্রিশ বছরে দেখেননি বলে জানাচ্ছেন বিষ্ণুপুর চকবাজারের ডিম ব্যবসায়ী শেখ আবদুল মান্নান। আর এক ডিম ব্যবসায়ী শিবদাস মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পোল্টি ফার্ম মালিকেরা যদি দাম কমান, তাহলে আমরাও একটু কমাতে পারি।’’

যদিও বিষ্ণুপুর শহর লাগোয়া এক ডিম খামারের মালিক রাজীব দে জানান, বিষ্ণুপুর বাজার-সহ আশপাশের গ্রামগুলিতে যা ডিমের চাহিদা, তা বিষ্ণুপুরের মড়ার পঞ্চায়েতের শিরোমণিপুর ও দ্বাদশবাড়ির তিনটি পোল্টি ফার্ম থেকে দৈনিক গড়ে ৬০ হাজার ডিম সরবরাহ করে সামলে দেয়।

তাঁর দাবি, ‘‘বাইরের রাজ্য থেকে এখানে ডিম আসে না। গরমে ডিম নষ্ট হয়ে গিয়ে লোকসান হয় বলে, শীতে কিছুটা দাম বাড়ায় পোল্ট্রি ফার্মগুলি। এ ছাড়া আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনাতেও ডিম উৎপাদন কিছুটা কমেছে। তাই এখন আমরা সামান্য দাম বাড়িয়ে প্রতিটি ডিম পাঁচ টাকা ছাব্বিশ পয়সা হিসেবে বিক্রি করছি। কিন্তু খুচরো ব্যবসায়ীরা সুযোগ বুঝে অনেকখানি দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।’’

এই পরিস্থিতিতে ডিমের দাম কেন প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করছে না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাসিন্দারা। যদিও বাঁকুড়ার প্রাণিসম্পদ বিকাশ দফতরের ডেপুটি ডিরেক্টর সোমনাথ মাইতি বলছেন, “অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ডিমের আমদানিতে কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল বলেই দর বেড়েছে। তবে এখন তা মিটে গিয়েছে। আশা করছি এ বার ডিমের দর থিতু হবে।” তবে দর না বাড়লেও পুরনো দামে কবে ডিম ফিরবে, তা নিয়ে ধন্দ কিন্তু কাটেনি।