বমি ও পায়খানার উপসর্গ নিয়ে বুধবার থেকে ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি হচ্ছিলেন পরের পর রোগী। সেই উপসর্গ নিয়েই ভর্তি হওয়া এক বালিকার মৃত্যু ঘিরে ক্ষোভে ফেটে পড়ল মুরারই ২ ব্লকের পাইকর এলাকা। পাইকরেই রয়েছে মুরারই ২ ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। বৃহস্পতিবার রাতে পাইকর হালদার পাড়ার বাসিন্দা তৃষা ভাস্কর (৮) মারা যায় ওই স্বাস্থ্যেকেন্দ্রে। 

দ্বিতীয় শ্রেণির ওই ছাত্রীর মৃত্যুর জেরে শুক্রবার সকাল থেকে ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ঘিরে বিক্ষোভ দেখান উত্তেজিত গ্রামবাসী। তাঁরা চিকিৎসার গাফিলতির অভিযোগও তোলেন। পরে মুরারই থানা থেকে বড় পুলিশ বাহিনী এলাকায় পৌঁছে পরিস্থিতি সামাল দেয়। গ্রামবাসীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন থেকে গ্রামের জলের ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করা হয় না। ওই জল খেয়েই পেটের রোগ এমন মারাত্মক আকার নিয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, জনা কুড়ি রোগীকে প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ছেড়ে দিলেও বৃহস্পতিবার সকাল থেকে একই উপসর্গ নিয়ে ২৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন। আট জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় রামপুরহাট সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। তাঁদের মধ্যে তৃষার দিদিও রয়েছে। কিন্তু, তৃষাকে রেফার করা হয়নি। ওই বালিকার পরিবার ও গ্রামবাসীর অভিযোগ, চিকিৎসকের গাফিলতিতে তৃষার মৃত্যু হয়েছে। শুধু তাই নয়, মেয়েটির মৃত্যু শংসাপত্রে হাসপাতাল তারিখ ভুল লেখায় কাছাকাছি থাকা মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুর মহাশ্মশানে গিয়ে তৃষার পরিবারকে নাকাল হতে হয়। পরিবারের দাবি, মৃত্যু সার্টিফিকেটে ২ নভেম্বরের বদলে ২ ডিসেম্বর লেখেন চিকিৎসক। 

তৃষার বাবা কাজল ভাস্কর জানান, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাইকর হাসপাতালে দুই মেয়েকেই বমি, পায়খানা উপসর্গ নিয়ে ভর্তি করেছিলেন। জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ইঞ্জেকশন ও স্যালাইন দেন। কিছুক্ষণ পরে বড় মেয়ের বাড়াবাড়ি হলে ওকে রামপুরহাট হাসপাতালে আমার এক আত্মীয়াকে দিয়ে পাঠানো হয়। কাজলবাবুর আত্মীয় শ্যামলী ভাস্কর অভিযোগ করেন, ডাক্তারবাবুকে বারবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও উনি ওয়ার্ডে তৃষাকে পরীক্ষা করতে যাননি। কাজলবাবু বলেন, ‘‘ওয়ার্ডের সব রোগীকে দেখার পরে ডাক্তার আমার ছোট মেয়েকে পরীক্ষা করে দু’টো ওষুধ কিনে আনতে বলেন। ওষুধ কিনে নিয়ে যখন আসি, ততক্ষণে মেয়ের অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমাদের চোখের সামনে মেয়েটা মারা গেল!’’ পরিবারের দাবি, আগেই অন্য কোনও হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলে হয়তো মেয়েটি বেঁচে যেত।

মুরারই ২ ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক কার্তিক পাত্রের দাবি, তিনি ওই সময় অন্য ওয়ার্ডে রোগী দেখছিলেন। ফলে, ফিমেল ওয়ার্ডে যেতে পারেননি। 

আর এক গ্রামবাসী লাল্টু ভাস্কর জানান, বৃহস্পতিবার রাতে তাঁর দাদাকে রামপুরহাট হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি কোনও অ্যাম্বুল্যান্স পাননি। 

কানের দুল বিক্রি করে বেশি টাকা দিয়ে বাইরের গাড়ি ভাড়া করে যেতে হয়। হাসপাতাল তাঁরা 

কোনও সাহায্য পাননি বলে অভিযোগ। বস্তুত, এ দিন তৃষার মৃত্যুর পরে পাইকরের সমস্ত বাসিন্দা একযোগে ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উদাসীনতার অভিযোগ তুলে সরব হয়েছেন। এ দিন হালদারপাড়ায় তৃণার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা বারবার জ্ঞান হারাচ্ছেন। পড়শিরা ভিড় করে রয়েছেন বাড়িতে। শ্যামলীদেবীর ক্ষোভ, ‘‘চিকিৎসার গাফিলতিতে মা-বাবা সন্তান হারা হল। আমাদের অনুরোধ, এই ভাবে যেন আরও কারও চিকিৎসা না হয়।’’

তৃষার পরিবারের তরফে অবশ্য কোথাও লিখিত অভিযোগ হয়নি। রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলার উপ-মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক (২) স্বপন কুমার ঝা বলেন, ‘‘৫২ জন পর্যন্ত ভর্তি হয়েছিলেন। ১০ জন ছুটি নিয়েছেন। ৮ জনকে রেফার করা হয়েছে। তবে যে বালিকা মারা গিয়েছে, তার ডায়েরিয়ার পাশাপাশি জ্বরও ছিল।’’ চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হবে। গাফিলতির প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসককে শো-কজ করা হবে।’’