স্টেশনে ঢুকেই থমকে যাচ্ছে পা। চোখ আটকে যাচ্ছে ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িতে। নীল টলটলে জল। তার উপরে এক পায়ে দাঁড়িয়ে তাল গাছ। পাশে পৃথিবীর দুই রূপ— খরায় ফুটিফাটা মাটি ও শস্য-শ্যামলা ধরিত্রী। ছবিতে ফুটওভারব্রিজের সিঁড়ি রঙিন করে জল সংরক্ষণের বার্তা দিতে চাইছে রেল। পুরুলিয়া স্টেশনের এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে এসে তাই চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে রেলযাত্রীদের। 

ফুটওভার ব্রিজের সিঁড়িতে জল বাঁচানোর বার্তা ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী শিবরাম বাউরি। তিনি পেশায় রেলকর্মী। দক্ষিণ-পূর্ব রেলের আদ্রা ডিভিশনে চিফ টিকিট ইন্সপেক্টর পদে কর্মরত। কিন্তু, তাঁর নেশা ছবি আঁকা। রং-তুলি হাতে নিলেই শিবরাম একেবারে অন্য মানুষ। চিফ টিকিট ইন্সপেক্টরের পরিচয় ছাপিয়ে শিবরাম এখন সহকর্মীদের কাছে শিল্পী হিসেবেই বেশি পরিচিত।

গত বছর পুরুলিয়া, আদ্রা ও বরাভূম স্টেশনের ফুটওভারব্রিজের সিঁড়ি জুড়ে তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন স্থানীয় সংস্কৃতি ও নিসর্গ প্রকৃতির ছবি। আদ্রা ডিভিশনের তিনটি স্টেশনের সিঁড়ি জুড়ে তেলরঙে তাঁর কাজ রেলমন্ত্রকেরও প্রশংসা পেয়েছে। তাঁর এই কাজকে পুরস্কৃত করেছেন স্বয়ং রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। গত ১২ জুলাই দিল্লিতে রেলমন্ত্রকের একটি অনুষ্ঠানে শিবরামকে পুরস্কৃত করেছেন রেলমন্ত্রী। 

দক্ষিণ-পূর্ব রেলের জেনারেল ম্যানেজারের কাছ থেকেও পুরস্কৃত হয়েছেন কাজের সুবাদে।

শিবরামের কথায়, ‘‘গতবার পরীক্ষামূলক ভাবে স্থানীয় সংস্কৃতি ও পুরুলিয়ার প্রকৃতিকে তুলে ধরেছিলাম। দেখেছিলাম অনেকেই সিঁড়িতে ওঠার মুখে দাঁড়িয়ে দেখছেন, কেউ ছবিও তুলছেন। সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়া মারফত ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুযোগটাকেই কাজে লাগাতে চেয়েছি এ বার। এ বার তাই ছবির বিষয় ‘জল সংরক্ষণ করুন ও সবুজ বাঁচান’। লোকের কাছে এই বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে, মানুষজন পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে এলেই আমার পরিশ্রম সার্থক হবে।’’ 

হঠাৎ এই বিষয় কেন নির্বাচন করলেন? শিবরাম জানান, কিছু দিন আগে সংবাদপত্রে দেখেন, উষ্ণায়নের জেরে পৃথিবী বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে। এই পরিস্থিতিতে সবাই যদি সচেতন না হন, তাহলে বিপদকে আমন্ত্রণ করা হবে। তাই সবারই নিজের মতো করে পরিবেশ বাঁচানোর কাজ এখনই শুরু করা উচিত বলে মনে করেন শিবরাম। তাঁর কথায়, ‘‘ছবিতে দেখিয়েছি জলের অভাবে পৃথিবীর একটি দিক কী ভাবে শুকিয়ে মরুভূমির মতো হয়ে যাচ্ছে, আর যে দিকে গাছপালা রয়েছে, সেদিকটা সবুজ রয়েছে। পৃথিবীর দু’টি রূপ তুলে ধরে মানুষকে সচেতন করতে চেষ্টা করেছি।’’

পুরুলিয়ার বিধায়ক সুদীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘পরিবেশ রক্ষার বার্তার পাশাপাশি সিঁড়িতে এ রকম ছবি থাকলে তা দৃষ্টিনন্দনও বটে। শিল্পী খুব সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।’’ শহরের বাসিন্দা ছাত্রী সুস্মিতা সরকার বলেন, ‘‘ফুটওভারব্রিজের সিঁড়িতে এত সুন্দর ছবি দেখে মন ভরে যায়। তবে, সেই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার বার্তাও সবাইকে ভাবাচ্ছে।’’ পুরুলিয়ার স্টেশন ম্যানেজার সুমিত গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, ‘‘শিবরামবাবুর আঁকা স্টেশনের পরিবেশটাই যেন পাল্টে দিয়েছে। তাঁর ডাকে সবাই পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে এলে আমাদের ভালই লাগবে।’’