বোমার ঘায়ে এক বিজেপি কর্মী খুন হয়েছিলেন শনিবার রাতে। লাভপুরের মীরবাঁধ গ্রামের ওই ঘটনাকে ঘিরে রবিবার তপ্ত হয়ে উঠল স্থানীয় হাতিয়া গ্রাম। বিজেপি ও তৃণমূলের মধ্যে বোমাবাজি হয়। আহত হন বেশ কয়েক জন। 

পুলিশ জানিয়েছে, নিহত বিজেপি কর্মীর নাম ডালু শেখ ওরফে হিলাল শেখ (৫০)। বাড়ি মীরবাঁধ ডাঙাপাড়ায়। শনিবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ বাড়ি থেকে প্রায় ৩০০ মিটার দূরে তাঁকে পরপর দু’টি বোমা মেরে খুন করা হয় বলে অভিযোগ। তার পরও গভীর রাত পর্যন্ত ওই গ্রামে বোমাবাজি চলে বলে গ্রামবাসীরা জানিয়েছেন। খুনের ঘটনায় নিহতের পরিবার ও বিজেপি নেতৃত্ব তৃণমূলের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। বিজেপি-র জেলা সভাপতি শ্যামাপদ মণ্ডল অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে এ দিন লাভপুর থানায় কথা বলতে যান। সেখানে দাঁড়িয়ে তিনি অভিযোগ করেন, ‘‘ডালু শেখ ওই এলাকায় আমাদের সংগঠন বৃদ্ধির কাজ করছিলেন। 

সেই আক্রোশেই তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা ওঁকে বোমা মেরে খুন করেছে।’’ অভিযোগ উড়িয়ে তৃণমূলের লাভপুর ব্লক সভাপতি তরুণ চক্রবর্তী বলেন, ‘‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন অভিযোগ। আমাদের কেউ ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কারণে আমাদের নামে মিথ্যা অভিযোগ করা হচ্ছে।’’ 

হাতিয়া গ্রামে ইটবৃষ্টি। —নিজস্ব চিত্র

নিহতের পরিবার ১৩ জনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করেছে। একই সঙ্গে তৃণমূলের জেলা সহ সভাপতি আব্দুল মান্নান হোসেন, দলের দাঁড়কা অঞ্চল কমিটির সভাপতি কাজল রায়, মীরবাঁধ গ্রাম কমিটির সভাপতি আহাদুর শেখ-সহ ১৭ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ডালুকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ দায়ের হয়েছে। তাতে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে ওই বিজেপি কর্মীকে তৃণমূলে যোগ দিতে বলা হচ্ছিল। কিন্তু তিনি তা উপেক্ষা করে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছিলেন ওই নেতারা। 

আব্দুল মান্নান অবশ্য বলেন, ‘‘আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ ওঠার কথা নয়। তাই খোঁজ না নিয়ে কিছু বলতে পারব না।’’ পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগ খতিয়ে দেখে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। আপাতত দু’জনকে আটক করা হয়েছে। উত্তেজনা থাকায় এলাকায় পুলিশ টহল চলছে।

সোমবার সকালে ডাঙাপাড়ায় দিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশীরা ভিড় জমিয়েছেন নিহতের বাড়িতে। বিঘে কুড়ি জমির পাশাপাশি তাঁদের একটি ট্রাক্টর রয়েছে। স্ত্রী, তিন ছেলে, এক মেয়ে, বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিয়ে ছিল ডালু শেখের সংসার। তাঁর বড় ছেলে জসিমুদ্দিন শেখ বলেন, ‘‘শনিবার রাতে বাবা ট্রাক্টরে জমি চাষ করার বাকি টাকা তুলতে গিয়েছিলেন। হেঁটেই বাড়ি ফিরছিলেন। 

বাড়ি থেকে কিছুটা দূরেই তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা তাঁকে লক্ষ্য করে বোমা মারে। বোমার শব্দ শুনে ছুটে গিয়ে দেখি, পড়ে রয়েছে বাবার নিথর দেহ। রক্তে ভেসে যাচ্ছে রাস্তা।’’ 

স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, রাতেই খবর পেয়ে নিহত বিজেপি কর্মীর দেহ উদ্ধার করতে যান লাভপুর থানার পুলিশকর্মীরা৷ তবে নিহতের পরিবার দেহ উদ্ধারে বাধা দেয়।  মৃতের পরিবারের লোকেরা তাদের আত্মীয়স্বজন না আসা পর্যন্ত দেহ আটকে রাখার দাবিতে অনড় থাকেন। মৃতদেহ দীর্ঘক্ষণ রাস্তায় পড়ে থাকে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে লাঠিচার্জ করে পুলিশ। নিহতের স্ত্রী হাসিনা বিবির অভিযোগ, ‘‘পুলিশ দুষ্কৃতীদের ধরার পরিবর্তে আমাদেরই লাঠিপেটা করে এ দিন মৃতদেহ তুলে নিয়ে যায়।’’ পুলিশ অবশ্য লাঠিচার্জের অভিযোগ মানেনি। 

ওই ঘটনার জেরে এ দিন তৃণমূল-বিজেপি’র বোমাবাজিতে তেতে ওঠে লাভপুরেরই হাতিয়া গ্রাম। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ডালু খুনে অভিযুক্তদের গ্রেফতারের দাবিতে এ দিন লাভপুর থানায় বিক্ষোভ কর্মসূচি ছিল বিজেপি-র। তাতে যোগ দিতে গাড়িতে লাভপুর থানা অভিমুখে আসছিলেন দলের কর্মী-সমর্থকেরা। অভিযোগ, তাঁদের আটকাতে তৃণমূলের দুষ্কৃতীরা মুড়িমুড়কির মতো বোমাবাজি করে। পাল্টা বোমাবাজির অভিযোগ ওঠে বিজেপি-র বিরুদ্ধেও। এক তৃণমূল কর্মীর বাড়িতেও বোমা ছোড়া হয় বলে অভিযোগ। 

এ দিন হাতিয়া গ্রামে গিয়ে দেখা গেল পাকা রাস্তায় শতাধিক বোমা বিস্ফোরণের চিহ্ন। তখনও পড়ে বেশ কিছু তাজা বোমা, সুতলি। বাতাসে বারুদের গন্ধ। তৃণমূল কর্মীর বাড়ির দেওয়ালেও বোমা ফাটার দাগ। বিজেপি-র জেলা সহ-সভাপতি বিশ্বজিৎ মণ্ডলের দাবি, বোমায় তাঁদের ১০-১২ জন আহত হয়েছেন। তাঁদের লাভপুর হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে তৃণমূলের দাবি, বিজেপি-ই বোমাবাজি করেছে।