শিল্প-ভাস্কর্য না জংলা ঝোপ? না বললে, চেনাই দায়! বর্ষার জল পেয়ে কোথাও বুনো লতায় ঢেকেছে শিল্পকর্ম, কোথাও ভাস্কর্য থেকে খুলে পড়ছে সিমেন্ট-নুড়ি-পাথর! তার দিয়ে বেঁধে রাখা ভাস্কর্যের শরীর। এমনই বেহাল দশা শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্কর কিংবা পেরুমল জি’র মতো বিশিষ্ট শিল্পীদের শিল্পকৃতিগুলির।
সম্প্রতি এক ড্রপ গেট থেকে অন্য ড্রপ গেট ঘুরে ঘুরে নাকাল হচ্ছিলেন কলকাতার সল্টলেকের এক পর্যটক। আশ্রম মাঠে হাতিপুকুর লাগোয়া এলাকায় থাকা হাতির ভাস্কর্যের কথা শুনেছিলেন তিনি। কিন্তু দেখতে গিয়ে তাঁর যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তাতে রীতিমতো ক্ষুব্ধ তিনি। কলাভবনের ভাস্কর্য বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, পঞ্চাশের দশকে ভাস্কর্য বিভাগের শিক্ষক অরুণাচল পেরুমল ওড়িশার কোনারকের সূর্য মন্দিরে থাকা হাতির আদলে শান্তিনিকেতনের আশ্রম মাঠে ওই হাতির ভাস্কর্যটি গড়ে তোলেন। সেকালের পড়ুয়া, গবেষক থেকে শুরু করে বর্তমান প্রজন্মের শিল্পের পাঠ নিতে আসা পড়ুয়াদের কাছে এটিই তাঁর একমাত্র শিল্প নিদর্শন। সকলের অগোচরে, এহেন গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যের পাদদেশ ঢাকা পড়েছে আগাছাতে। সিমেন্টে জমেছে শ্যাওলাও।

রামকিঙ্করের ভাস্কর্যগুলিও দীর্ঘ দিন ধরে খোলা আকাশের নীচেই ছিল। পরে ছাউনির ব্যবস্থা হয়। চিড় ধরা বা সিমেন্ট খুলে পড়া আগেই শুরু হয়েছিল। দিন দিন তা বেড়েছে। কলাভবন ঢোকার মুখে গেটের পাশে বাঁ দিকের কলের বাঁশি-ই হোক বা ডান দিকের ধান ঝাড়াই, একটু এগিয়ে গিয়ে কালো বাড়ির সামনের বুদ্ধ মূর্তি— বেশির ভাগ ভাস্কর্যের বেহাল দশা। কেরলের এক পর্যটক ঘুরতে এসে অভিযোগ করে বললেন, ‘‘এহেন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে থাকা শিল্পীদের শিল্পকর্মের রক্ষণাবেক্ষণ এবং নজরদারির বড় অভাব রয়েছে শান্তিনিকেতনে। শুধু এখানেই নয়, শ্রীনিকেতনেও বেশ কিছু শিল্প কর্ম অবহেলায় এমন ভাবেই পড়ে রয়েছে। শ্রীনিকেতনে বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য দূর থেকে অবয়বও বোঝা যায় না। কেন না, গাছগাছালি এবং আগাছাতে কার্যত ওই সব ভাস্কর্যের পাদদেশ ঢেকে দিয়েছে। কোন কোন শিল্প কর্মে জমেছে শ্যাওলা।’’

অভিযোগ মিথ্যে নয়। কোনও কোনও ভাস্কর্য তার দিয়ে কোনও রকম বেঁধে রাখা হয়েছে। শিল্পীদের শিল্প কর্ম গুলির এমন দৈন্য দশায় ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়লেও, কতৃর্পক্ষের রোষের মুখে পড়ার ভয়ে তাঁরা নাম বলতে নারাজ। তাঁরা জানান, খুবই হতবাক আমরা। এত টাকা আসে কেন্দ্র থেকে, এত বাড়ি-ঘর নির্মাণ হচ্ছে, অথচ এই অমূল্য ভাস্কর্যগুলি ক্ষয়ে যাচ্ছে। শান্তিনিকেতন জুড়ে শিল্পী রামকিঙ্কর বেজের কাজ ছড়িয়ে রয়েছে। শুধু তাই নয়, কলাভবন চত্বরে থাকা শিল্পী সুষেন ঘোষের ভাস্কর্য, খেলার মাঠ লাগোয়া ছাত্রীদের হস্টেলের সামনে থাকা বিশিষ্ট শিল্পী সুরেন দে’র ভাস্কর্য নৃত্যরত মহিলা-সহ একাধিক শিল্প কর্মও একই অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কালোবাড়িতে প্রয়োজনীয় সংস্কারের অভাবে জল গড়িয়ে পড়ছে মেঝেতে। নজর নেই আশ্রম মাঠ লাগোয়া গৌর প্রাঙ্গনের পিছনে থাকা চৈত্যতেও।

কলাভবনের প্রাক্তন অধ্যক্ষ শিশির সাহানা বলেন, “শিল্প উপযুক্ত বিধি মেনে সংরক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং তাতে প্রয়োজনীয় সংস্কার করার জন্য বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বার কয়েক সংশ্লিষ্ট বিশেজ্ঞরা এসে পরীক্ষা এবং যাচাই করে রিপোর্ট দিয়েছেন। খুব দ্রুতই সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে আলোচনা ও পরামর্শ মেনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

কেমনভাবে রক্ষা করা যায় শিল্প-সামগ্রীগুলি?

শান্তিনিকেতনেরই কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন, প্রথিতযশা শিল্পীদের সম্মান জানিয়ে তাঁদের শিল্পকর্মের ব্রোঞ্জ কাস্টিং দর্শকদের সামনে তুলে ধরা হোক। আসলগুলি মিউজিয়ামে সংরক্ষিত হোক। কলাভবনের অধ্যক্ষ অধ্যাপক দিলীপ মিত্র সঙ্গে বহু চেষ্টা করে যোগাযোগ করা যায়নি। প্রাক্তন অধ্যক্ষ শিশিরবাবুর দাবি, ‘‘৩ জুলাই এএসআই-এর একটি তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল আসছেন। ভারতীয় পুরাতত্ত্ব সর্বেক্ষণে প্রাক্তন অধিকর্তা সুরজিৎ মাইতির নেতৃত্বে বিশেজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’’