আর পাঁচ জন বধূর মতো সংসারের গণ্ডির মধ্যে বেঁধে ফেলেননি নিজেকে। বরং চেনা ছক ভেঙে এলাকার মহিলাদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। এলাকার মহিলাদের স্বনির্ভর করার লক্ষ্যে কয়েক বছরের চেষ্টায় অনেকাংশেই সফল ইন্দাসের মমতা পালিত। অক্লান্ত পরিশ্রম আর জেদ নিয়ে সরকারি সাহায্যে গড়েছেন ‘কড়িশুণ্ডা উইমেন এসএইচজি সবুজ সঙ্ঘ প্রাইমারি সমবায়’।

রাজ্য সরকারের কাছ থেকে পাওয়া ১৩ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে তৈরি সমবায় দু’বছরেই গোষ্ঠীগুলিকে ঋণ দিয়ে এখন প্রায় ১৮ লক্ষ টাকার মূলধন তৈরি করে ফেলেছে। শুধু তাই নয়, সহায়ক মূল্যে চাষিদের কাছ থেকে ধান কিনে চালকলে পৌঁছে দেওয়ার কাজও সুষ্ঠু ভাবে করছে এই সমবায়। কড়িশুণ্ডা পঞ্চায়েতের ২৩৭টি মহিলা স্বনির্ভর গোষ্ঠীর অবলম্বন হয়ে উঠেছে এই সঙ্ঘ সমবায়। গোবিন্দপুরে সঙ্ঘ সমবায়ের দোতলা পাকা অফিসে ১০টা-৪টে নানা কাজে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের আনাগোনা লেগেই রয়েছে। আর সবাইকে রোজগারের দিশা দেখাতে সেখানে রয়েছেন সঙ্ঘনেত্রী— ‘মমতাদি’। তাঁর নেতৃত্বদানের ক্ষমতার প্রশংসা করেছেন বিডিও (ইন্দাস) মানসী ভদ্র চক্রবর্তীও। 

বছর পঁয়তাল্লিশের মমতার বাড়ি কড়িশুণ্ডা পঞ্চায়েতের দশরথবাটি গ্রামে। সংসারের কাজ সেরে পৌঁছে যান সমবায়ে। তিনি বলেন, ‘‘এই পদে পরিশ্রম আছে, বেতন নেই। লক্ষ্য একটাই— নিজের সঙ্গে এলাকার সব মহিলাদের স্বনির্ভর করা।’’

স্বামী টানা অসুস্থ। তাই সংসারের হাল ধরতে পাট ও উলের হস্তশিল্প তৈরি করতে স্বনির্ভর গোষ্ঠীতে নাম লিখিয়েছিলেন মমতা। ২০০৬ সালে সেই শুরু। সেখান থেকেই নজর টানেন সরকারি আধিকারিকদের। তাঁদের পরামর্শে গোষ্ঠীগুলিকে এককাট্টা করে চার বছরে গড়ে তোলেন সঙ্ঘ। স্বনির্ভর গোষ্ঠীর এক জন সাধারণ সদস্য থেকে হয়ে ওঠেন ২৩৭টি স্বনির্ভর গোষ্ঠীর ‘সঙ্ঘনেত্রী’। 

তাতেই থেমে যাননি। সরকারি অফিসে-অফিসে দৌড়ঝাঁপ করে তৈরি করেন সঙ্ঘ সমবায়। মমতা জানান, ২০১৭ সালে সমবায়ের রেজিস্ট্রেশন পান তাঁরা। বিস্তর কাঠখড় পুড়িয়ে জোগাড় করেন অফিস তৈরির জমি। জেলা সদর বাঁকুড়ায় বারবার ছুটে গিয়ে সঙ্ঘের জন্য অফিস তৈরির অনুদান নিয়ে আসেন। পাশে পেয়েছেন স্থানীয় পঞ্চায়েতকে। 

মমতার কথায়, ‘‘আগে মিটিং করতে হত গাছতলায় কিংবা পঞ্চায়েতের ছাদে। এখন একটা ছাদ হয়েছে। প্রায় দু’হাজারের বেশি মহিলা কাজ করছেন এক সঙ্গে। কোনও গোষ্ঠী সহায়ক মূল্যে ধান কিনে মিলে পৌঁছে দিচ্ছে। বিনিময়ে তারা কমিশন পাচ্ছে। আবার কেউ সমবায় থেকে ঋণ নিয়ে তৈরি করছেন উল, পাটের তৈরি সামগ্রী। বিভিন্ন সরকারি প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা প্রচারের কাজ করেও অনেকে রোজগার করছেন। সম্প্রতি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রগুলির জন্য বিভিন্ন ডালের ছাতুর বল তৈরি এবং স্যানিটারি ন্যাপকিন তৈরির অনুমোদনও পেয়েছি আমরা।’’ 

স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্যদের বুঝিয়ে নিয়ে এসেছেন সরকারি আওতায় থাকা দুর্ঘটনা বিমা ও অটল পেনশন যোজনায়। 

বিডিও বলেন, ‘‘অনেক সঙ্ঘনেত্রীই ভাল কাজ করেন। কিন্তু মমতার মধ্যে নেতৃত্বদানের ক্ষমতা আছে। সবার উন্নতিই তাঁর লক্ষ্য।’’ আর মমতার নিজের কথায়, ‘‘মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুব দরকার। নিজের দুই মেয়ের মতো বাকিদেরও এই কথা বলি। এক দিন আমি থাকব না। এই সমবায় থেকে যাবে। এটা ভেবেই আমি খুশি।’’