বই চাই বই

মহানগর ছুঁয়ে

চল্লিশ ছুঁতে আর এক বছর। কলকাতা বইমেলার বয়স হতে চলল ঊনচল্লিশ। ১৯৭৬-এর ৩ মার্চ মোটে ৫৪টা স্টল নিয়ে বিড়লা তারামণ্ডলের উল্টো দিকে ছোট মাঠটায় যে বইমেলা শুরু হয়েছিল, সে কি চল্লিশের দোড়গোড়ায় পৌঁছে কিঞ্চিত বুড়ো হল? মনে হয় না। আর সেই তারুণ্যে শহরের পাশাপাশি জেলার কিছু তরুণ প্রকাশকেরও ভূমিকা আছে। কেবল বাজারের দিকে তাকিয়ে নয়, যথার্থ সম্পাদনায় মনে রাখার মতো কিছু কাজ করছেন জেলা থেকে আসা এই প্রকাশকেরা।  যেমন, ‘লালমাটি’র নিমাই গরাই আদতে বাঁকুড়ার মানুষ। মহানগরে প্রকাশক হয়ে এসে নিমাই শুধু বিক্রি আর লাভের অঙ্কই দেখেননি, মনে রেখেছেন বাংলা বইয়ের সমৃদ্ধ প্রকাশনা-ঐতিহ্যও। এ বার বইমেলার মুখে তাঁরা প্রকাশ করেছেন গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যঙ্গচিত্রের তিনটি বই। বিরূপবজ্র, অদ্ভুত লোক আর নবহুল্লোড় নামে এই তিনটি বই প্রায় একশো বছর আগে প্রকাশিত হয়েছিল থ্যাকার, স্পিঙ্ক অ্যান্ড কোম্পানি থেকে। তার পরে অমূল্য এই সংকলনগুলি অবিকল প্রকাশের কথা ভাবেননি কেউ। সম্প্রতি সেই আগের চেহারায় বইগুলিকে প্রকাশ করেছেন নিমাই। “চটজলদি বিক্রি হয়তো হবে না এই বইগুলি, কিন্তু বাংলা প্রকাশনায় এমন বইয়ের দরকার ছিল বলেই মনে হয়”— ব্যাখ্যা নিমাইয়ের।  ‘ধ্রুবপদ’-এর শিবনাথ ভদ্রও কৃষ্ণনগর-কলকাতা বিস্তর ছুটোছুটি করে প্রকাশ করে চলেছেন গবেষণামূলক কয়েকটি বই।

বাঁ দিকে গগনেন্দ্রনাথের আঁকা কার্টুন (বই থেকে)।

 তাঁর প্রকাশনা থেকে সদ্য বেরিয়েছে হিরণ্ময় নাথের উত্তর-পূর্ব ভারতের শৈব-নাথ সম্প্রদায়। শিবনাথ বললেন, “সাধারণত বাণিজ্যিক প্রকাশকেরা এ ধরনের বই করতে চান না। কিন্তু গবেষণামূলক বই প্রকাশেরও দরকার আছে। আমাদের মতো ছোট সামর্থ্যের প্রকাশকেরা চেষ্টা করছি কাজগুলো করে যেতে।” আছেন বিষ্ণুপুরের ‘টেরাকোটা’ প্রকাশনার প্রদীপ করও। তাঁর লোকসংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব নিয়ে মোনোগ্রাফগুলি প্রকাশের ধারাবাহিকতায় ছোট হলেও স্বপ্ন দেখায় বড়। তারাপদ সাঁতরার পশ্চিমবঙ্গের দুর্গ পরিক্রমা তাঁদেরই করা। জেলার প্রকাশকেরা থাকছেন মেলায়, হয়তো কিছুটা আড়ালেই।

 

 

রম্য ব্যাকরণ

‘ফুটে গেছে’ কথাটার মানে কি কেউ এমনি-এমনি বোঝে? বুঝতে গেলে আগে তো জেনে নিতে হয়, কে ফুটল? ফুল, ছিঁচকে চোর, না কি মায়ের ভোগের পথে পা বাড়িয়েই থাকা কোনও মাতাল? মায়ের ভোগে গেলে এক রকম, আবার সে-ই যদি খানিক বাড়তি আয়ু চেয়ে জোড়া পাঁঠা মানত করে মায়ের ভোগ দেয়, সে আর এক রকম। এই হল শব্দের রং-ঢঙ-ছেনালি। যেমন ‘নারায়ণ যখন মানুষের নাম, তখন বলছি ‘নারান’। ‘নারান গাঙ্গুলি’ বলছি, কিন্তু ‘নারান-পুজো’ বলছি না’— লিখছেন অসিত বিশ্বাস। লিখছেন, না কি গল্পের কুলোয় চেলে শব্দের খই বাছছেন, হলফ করে বলা মুশকিল। ‘এখন আমার শব্দকে খই বলে মনে হচ্ছে। জ্বলন্ত উনুনে চড়ানো খোলা থেকে খইয়ের আতসবাজি আমাকে মুগ্ধ করে’— ভণিতায় বলছেন তিনি নিজেই। যদিও ভণিতা তাকে ঠিক বলা যাবে না। কথার সুতো যে কখন শব্দের লাটাই থেকে বেরিয়ে গল্পের ঘুড়িকে লাট খাওয়াতে শুরু করেছে, খেয়ালই হয় না। লেখকের জন্ম জামুড়িয়ায়, ছোটবেলা কেটেছে সোনামুখীতে। সারা জীবন বাংলা পড়েছেন, পড়িয়েছেন। ব্যাকরণ তাঁর চিন্তার কেন্দ্রে, কিন্তু অনাবিল রসের ভিয়েনে তিনি অনায়াসে ডুবিয়ে নিয়েছেন খটমট সন্ধি-সমাস-প্রত্যয়। ছড়িয়ে দিয়েছেন অর্ধশতকের স্মৃতি-ছবির এলাচ-দারুচিনি। আঁচলে শব্দের খই (গাঙচিল) বইটির প্রচ্ছদেই জানানো হয়েছে গোত্র— ব্যাকরণভিত্তিক রম্যরচনা। এমন গোত্রের লেখা বেশি নেই।

 

 

নিজের বায়োস্কোপ

কারও পরোয়া না করে নিজের মর্জিমাফিক ছবি করার সময় বোধহয় এসে গিয়েছে। সদ্য জঁ লুক গদার তরুণ ছবি-করিয়েদের পরামর্শ দিয়েছেন আই-প্যাডে ছবি বানিয়ে আপলোড করার। বেশ কয়েক বছর ধরেই সামান্য পুঁজি সম্বল করে ‘জিরো বাজেট ফিল্ম’ বানাচ্ছেন নাছোড় তরুণেরা। বছরের গোড়ায় ইউটিউবে উঠে এসেছে তেমনই একটি আধঘণ্টার ছবি— বাবা, আমি আর বায়োস্কোপ। চন্দননগরের দুই যুবক, বেলুড়ের রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দিরের ইংরেজি বিভাগের প্রাক্তন ছাত্র প্রীতিময় দাস আর স্বপ্নেন্দু কর সাধারণ ডিজিট্যাল এসএলআর ক্যামেরায় সেটি তুলে ফেলেছেন। বর্তমানে পেশাদার সম্পাদক স্বপ্নেন্দু ছবি কাটাছেঁড়া এমনকী শব্দগ্রহণ ও সংযোজনার কাজ করেছেন বাড়িতেই। ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষক প্রীতিময় নির্দেশক। অভিনয় করেছেন তাঁদের বন্ধুরা। চিন্তার ক্ষেত্রে অভিনবত্ব নেই। চমকপ্রদ দৃশ্যনির্মাণ বা কারিগরি দক্ষতা দিয়ে গল্প বা অভিনয়ের খামতি কি ঢাকা যায়?

 

 

ব্যাকরণ কথা

‘ছোটদের উপরে এখন নানা বিষয় শেখার ভার। ব্যাকরণের অকার্যকর অংশগুলির ভার তাদের উপর থেকে কমানো গেলে ক্ষতি কী?’ বাংলা ব্যাকরণের প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে বললেন আশিস পাঠক। গবেষক অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায় বললেন বাঁকুড়ার ভাষায় বাড়তি ড়-বর্ণের আগম নিয়ে। বাংলা ব্যাকরণ নিয়ে তর্কবিতর্কে সদ্য জমে উঠল বাঁকুড়ার বিকনা-র ক্ষীরোদপ্রসাদ স্মৃতি বিদ্যাপীঠ। উপলক্ষ, রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সার্ধশত জন্মবর্ষ। ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক আশিস মুখোপাধ্যায়, স্কুল পরিদর্শক পঙ্কজ সরকার, দেবরাজ পাত্র প্রমুখ। আয়োজনে সহযোগী ‘কথা ও কাহিনী’। 

 

 

শরত্‌ নিয়ে

অভিমান ছিলই। বাগনানের পাণিত্রাসে ৪৩তম শরত্‌ মেলার উদ্বোধন করতে এসে তা উসকে দিলেন শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বললেন— “বাংলার বুদ্ধিজীবী মহলে একাংশের কাছে শরত্‌চন্দ্র তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা পাননি।” ১৯৩৮ সালে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত, জীবনের শেষ বারো বছর পানিত্রাসের পাশের গ্রাম সামতায় কাটিয়েছেন শরত্‌চন্দ্র। শীর্ষেন্দুবাবুর কথার খেই ধরেই আমতার বিধায়ক অসিত মিত্র দাবি করলেন, সামতায় সাহিত্য গবেষণায়‘শরত্‌চন্দ্র আকাদেমি’ গড়তে হবে। আজ বুধবারই মেলার শেষ দিন।

 

 

নরেন্দ্রর শিক্ষা

ব্রিটিশ শিক্ষাবিদ তথা দার্শনিক হার্বার্ট স্পেন্সারের ‘এডুকেশন: ইনটেলেচুয়াল, মরাল অ্যান্ড ফিজিক্যাল’ গ্রন্থের সংক্ষিপ্ত বঙ্গানুবাদ ১৮৮৫ সালে ছেপেছিল বসুমতী সাহিত্য মন্দির। অনুবাদকের নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। সন্ন্যাস-জীবনে স্বামী বিবেকানন্দ হয়ে ওঠার পরেও যাঁর শিক্ষাচিন্তায় থেকে যাবে সেই ভাবনা-বীজ। প্রায় এক শতাব্দী পরে, ১৯৮১ সালে উদ্বোধন কার্যালয় থেকে বইটি ফের প্রকাশ করা হয়েছিল। সম্প্রতি মূল গ্রন্থটির সঙ্গে স্পেন্সার-বিবেকানন্দ সংযোগ নিয়ে আলোচনা, গ্রন্থপঞ্জি ও টিকা সংযুক্ত করে ফের প্রকাশ করেছে গাঙচিল। সম্পাদনা করেছেন প্রবীর সরকার।

 

 

তিলাবনির ডাকে

অভিযানের নেশায় নতুনদের হাতেখড়ি দিতে পুজোর পর থেকেই রক ক্লাইম্বিং শিবিরের তোড়জোড় শুরু করে দেয় পর্বতারোহী ক্লাবগুলো। পুরুলিয়া-বাঁকুড়ার পাহাড়তলি ভরে ওঠে রংবেরঙের তাঁবুতে। ২৫ থেকে ২৮ জানুয়ারি পুরুলিয়ার আনাড়ায় তিলাবনি পাহাড়ের কোলে তেমনই এক শিবির করল ‘বর্ধমান এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড নেচার ড্রাইভ সোসাইটি’। তাতে যোগ দিলেন ছয় থেকে ষাট বছরের ৭৮ জন সদস্য। প্রকৃতি-পাঠও শিখলেন তাঁরা।

 

 

অপ্রকাশিত জরাসন্ধ

ছাতনা বড়ু চণ্ডীদাসের গ্রাম। ছাতনার প্যাঁড়া আর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বঙ্গবিখ্যাত। সেই ছাতনা থেকেই নতুন করে প্রকাশিত হচ্ছে ‘সৃজনীসাহিত্য সন্ধানে’। বাঁকুড়া বইমেলা ২০১৪ উপলক্ষে প্রকাশিত উত্‌সব সংখ্যায় প্রয়াত আইসিএস করুণাকুমার রায়ের ফাইল থেকে প্রকাশিত হয়েছে জরাসন্ধের একটি অপ্রকাশিত লেখা। বাঁকুড়ায় সদ্যপ্রাপ্ত জৈন কালীমূর্তি নিয়ে লিখেছেন অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায়। এ ছাড়াও বেশ কিছু মূল্যবান প্রবন্ধ লিখেছেন শুভম মুখোপাধ্যায়, হরিপদ মাহাতো প্রমুখ।

   

 

ঝুমুরে গম্ভীরায়

পরনে লাল শাড়ি, মাথায় হলুদ ফুল, হাতে রুমাল। মাদলের তালে চলছে করম নাচ। আর এক মঞ্চ তখন বাউলের দখলে। নদিয়ার হরিণঘাটায় নগরউখড়া একাদশ ক্লাবের মাঠে ১৮ থেকে ২৫ জানুয়ারি লোকসংস্কৃতি উত্‌সবে যোগ দিয়েছিলেন বহু শিল্পী। বাউল, ঝুমুর, পুরুলিয়ার ছৌ, মালদহের গম্ভীরা, আদিবাসী করম থেকে মূকাভিনয়, পুতুল নাচ— সবই ছিল। বহুরূপী আর জাদুকরেরাও বাদ যাননি।

 

 

লোক-বিজয়

শৈশবেই পিতৃহীন ছেলেটি প্রায় চার কিলোমিটার হেঁটে বাঁকুড়ার সোনারডাঙ্গা গ্রাম থেকে পড়তে যেত জোড়দা হাইস্কুলে। ধানখেতের আলপথে দেখা হত বাজিকর, বেদে, বাউল, পটুয়াদের সঙ্গে। সেই মেলামেশার সূত্রে ছোটবেলা থেকেই তাদের নানা সাঙ্কেতিক ভাষার গান নিজের মতো করে লিখে রাখত সেই ছেলেটি, বিজয় পণ্ডা। পরে পুরুলিয়ার স্কুলে চাকরিসূত্রে তাঁর মেতে ওঠা ঝুমুর গান সংগ্রহে। পাশাপাশি ঝুমড়ি নাচ, মাছানি নাচ সম্পর্কে একক উদ্যোগে ক্ষেত্রসমীক্ষা। ক্রমে তাঁর সংগৃহীত গানগুলি প্রকাশিত হতে থাকে সুবোধ বসুরায় সম্পাদিত ছত্রাক পত্রিকায়। গানের পাশাপাশি মাছ ধরা কিংবা পাখি ধরার উপকরণ, শিকার-যাত্রার সুলুক-সন্ধান, নানা রকম পিঠে তৈরির  কৌশলের ইতিহাস সব নখদর্পণে পঁচাত্তর বছরের এই অবসরপ্রাপ্ত স্কুল শিক্ষকের। আদতে বাঁকুড়ার হিড়বাঁধ ব্লকের গুনিয়াদা গ্রামের এই মানুষ ডুবে আছেন মানভূমের লোকসংস্কৃতি পুরাতত্ত্ব নিয়ে একটি বইয়ের কাজে।