• অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

প্রবন্ধ ১

অপরাধীর মন জানতে এত ভয় কেন আমাদের

রাষ্ট্রযন্ত্রীরা যতই চোখ রাঙান, আমরা এ দেশের মানুষ ও দেশের মানুষ সে দেশের মানুষ সবাই যা দেখার ঠিক দেখে নেব, এবং দুনিয়ার হাটে দাঁড়িয়ে যা বলার সমস্বরেই বলব। তাতে ভারতের মাথা হেঁট হওয়ার কিছু নেই। ভারতীয় পুরুষতন্ত্রের মাথা হেঁট হতে পারে, হলেই মঙ্গল।

3

লেসলি উডউইন নরেন্দ্র মোদীকে আবেদন জানিয়েছেন, তিনি ইন্ডিয়া’স ডটার তথ্যচিত্রটি আগে নিজে দেখুন, তার পর সিদ্ধান্ত নিন, না দেখে নিষিদ্ধ করবেন না। তাঁর বিশ্বাস, ছবিটি দেখলে প্রধানমন্ত্রী বুঝবেন এই ছবি ভারতের মেয়েদের মঙ্গল চায়, শুনতে পাবেন তাঁর ‘বেটি বচাও’ আহ্বানের প্রতিধ্বনি। ব্রিটিশ চিত্রপরিচালকের এই আবেদনে একটা বিশ্বাসের ছাপ স্পষ্ট। সেই বিশ্বাস নিজের শুভবুদ্ধিতে, এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের যন্ত্রীদের শুভবুদ্ধিতেও। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে, অন্তরের তাগিদ থেকে, অনেক পরিশ্রম করে তিনি ছবিটি তৈরি করেছেন। নিজের জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা যে এই তাগিদের একটা কারণ, সে কথাও তিনি জানিয়েছেন। আপ্ত মন জগৎ দেখে। নিজের আন্তরিকতায় আস্থা আছে বলেই সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, ছবিটি দেখলে মন্ত্রী-সান্ত্রিরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন, নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন।

ভুল ভেবেছেন। এই নিষেধাজ্ঞা শুভবুদ্ধির অভাবে নয়, অশুভবুদ্ধির প্রভাবে। শাসকরা শয়তানি করে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছেন, এমন কথা বলছি না, অন্তত তার কোনও প্রমাণ এখনও মেলেনি। বরং এটাই মনে হয় যে, তাঁরা তাঁদের স্বাভাবিক বুদ্ধি অনুসারেই কাজ করেছেন। কিন্তু ওই স্বাভাবিক বুদ্ধিটাই অশুভ। বলা চলে স্বভাবের দোষ। এবং এ দোষ ভারতীয় রাষ্ট্র ও রাজনীতির মজ্জাগত। সঙ্ঘ পরিবারের চরিত্রে ব্যাধির সংক্রমণ বেশি হতে পারে, তাদের আচরণে রোগলক্ষণ বাড়াবাড়ি রকমের প্রকট হতে পারে, কিন্তু জীবাণুটি সর্বব্যাপী।

এ রোগ বহুমাত্রিক। তার প্রথম মাত্রাটি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের উক্তিতে দিব্যি পরিষ্কার। তিনি খুব রেগে গেছেন, কারণ সরকার বারণ করা সত্ত্বেও বিবিসি এই ছবি দেখানো বন্ধ করেনি। অহো, কী দুঃসহ স্পর্ধা! বুঝতে অসুবিধে হয় না, একেবারে তিহাড় সংশোধনাগারের চক্রব্যূহ ভেদ করে এক জন মৃত্যুদণ্ডিত কয়েদির সাক্ষাৎকার নিয়ে দুনিয়াময় প্রচার করা হবে, মহাশক্তিমান রাষ্ট্র এ জিনিস সহ্য করতে পারছে না। ছবিটি দেখানো হলে দেশে অশান্তি হতে পারে, এমন একটা যুক্তিও খাড়া করার চেষ্টা হয়েছে বটে, কিন্তু সেটা অতিমাত্রায় হাস্যকর। সোজা কথা, রাষ্ট্রের অহঙ্কারে ঘা লেগেছে। রাজনাথ সিংহ সেই অতিপরিচিত রাষ্ট্রীয় অহঙ্কারের বাঙ্ময় প্রতিমূর্তি।

রোগের দ্বিতীয় মাত্রাটি উন্মোচিত হয়েছে সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী বেঙ্কাইয়া নাইডুর প্রতিক্রিয়ায়। তিনি এই ছবির পিছনে ‘আন্তর্জাতিক চক্রান্ত’ দেখতে পেয়েছেন। রাজনাথ যদি রাষ্ট্রীয় অহঙ্কারের প্রতিমূর্তি হন, বেঙ্কাইয়া তবে রাষ্ট্রীয় অভিমানের প্রতীক। এই অভিমানও আমাদের খুব চেনা। সে বলে যে, এই তথ্যচিত্র দুনিয়ার হাটে ভারতের মাথা হেঁট করে দেবে। ছয় দশক আগে পথের পাঁচালী ছবির বিরুদ্ধেও অভিযোগ উঠেছিল, দারিদ্রের প্রদর্শনীতে নাকি জগৎসভায় ভারতের ভাবমূর্তি ভূলুণ্ঠিত হয়েছে! সত্যজিতের কপাল ভাল, শ্রীযুক্ত নাইডুরা তখন ছিলেন না, আন্তর্জাতিক চক্রান্তের দায়ে পড়তে হয়নি।

কিন্তু অহঙ্কার এবং অভিমান আসলে ব্যাধির লক্ষণমাত্র। এই লক্ষণগুলি আকাশ থেকে পড়ে না, সমাজের মনোভূমি থেকেই সে তার প্রাণরস সংগ্রহ করে। সেটাই ব্যাধির তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুতর মাত্রা। লেসলি উডউইন বলেছেন, তিনি চান মেয়েদের বিরুদ্ধে হিংসার পিছনে কী ধরনের মানসিকতা কাজ করে, তাঁর ছবিটি সে বিষয়ে ভারতের সমাজকে ভাবিয়ে তুলুক, সেই প্রেক্ষিতেই দণ্ডিত ধর্ষকের সাক্ষাৎকারটি তিনি নিয়েছেন এবং দেখিয়েছেন। অপরাধের মোকাবিলার জন্য অপরাধীর মনটাকে চেনা ও জানা জরুরি, তিনি সেই চেষ্টাই করেছেন।

যুক্তিটি মূল্যবান। কিন্তু শুনবে কে? কেনই বা শুনবে? ভারতীয় সমাজ কি আদৌ অপরাধীর মন চিনতে এবং জানতে চায়? চাইলে, সে জন্য চেষ্টা করে না কেন? এ দেশে যে কোনও অপরাধের খবর মিললে একটাই কথা আকাশবাতাস তোলপাড় করতে থাকে: অপরাধীর শাস্তি চাই। শাস্তি চাওয়া কোনও অন্যায় নয়, যে দেশে শতাব্দী পার হয়ে যায়, ধর্মের কল বাতাসে নড়ে না, সেখানে সে কল নাড়ানোর জন্য প্রতিবাদ বিক্ষোভের ঝড় তোলা অবশ্যই জরুরি। দিল্লি ধর্ষণ নিয়ে তুমুল শোরগোল না হলে তার বিচারের ইতিহাসও অন্য রকম হত, সে সত্য বহুচর্চিত। কিন্তু অপরাধ ও শাস্তির এই প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার পাশাপাশি অপরাধীর প্রত্যেকটি অপরাধীর মন জানার জরুরি কাজটি আমরা করি না, এ বিষয়ে কোনও আলোচনার প্রয়োজন স্বীকারই করি না। লেসলি উডউইন সেই অস্বীকারের ঢাকনাটি খুলে মুকেশ সিংহকে আলোচনার হাটে নিয়ে এসেছেন, কেবল হাটে নয়, একেবারে বিশ্ববাজারে। এ জিনিস আমাদের ধাতে নেই। ভারতীয় রাষ্ট্রই বা এতটা সহ্য করবে কী করে?

কিন্তু কেন আমরা অপরাধীর মন জানতে আগ্রহী নই? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরও একটি মাত্রায় পৌঁছতে হয়। সেই চতুর্থ মাত্রাটি ভয়ের। আমরা ভয় পাই। সমাজ ভয় পায়। কীসের ভয়? সেই ভয়ের চেহারা-চরিত্র কেমন হতে পারে, সে কথা লিখেছেন সমাজতত্ত্ববিদ ও মনোবিজ্ঞানী আশিস নন্দী। বিনায়ক দামোদর সাভারকর বিষয়ক একটি অসামান্য প্রবন্ধে তিনি বলেছেন রবার্ট জে লিফটন-এর কথা। এই মার্কিন মনোবিদ আশির দশকে একটি বই লেখেন: নাৎসি ডক্টরস: মেডিক্যাল কিলিংস অ্যান্ড দ্য সাইকোলজি অব জেনোসাইড। হিটলারের ইহুদি-সংহারে অনেক চিকিৎসক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তেমন কিছু চিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করেন লিফটন, সাইকোঅ্যানালিসিস-এর স্বীকৃত রীতিতে তাদের কথা গভীর মনোযোগ সহকারে শোনেন, এবং বইটি লেখেন। ‘গণহত্যার মনস্তত্ত্ব’ বোঝার জন্য বইটি মূল্যবান। কিন্তু এই সমীক্ষার ‘অপরাধ’-এ লিফটনকে অনেক নিন্দে কুড়োতে হয়েছিল। তাঁর সহধর্মীরা, অর্থাৎ মনোবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরাও কেউ কেউ তাঁকে ছেড়ে কথা বলেননি। সমালোচকদের প্রধান অভিযোগ: লিফটন ঘৃণ্য গণহত্যার শরিক চিকিৎসকদের সাক্ষাৎকার নিয়ে এবং বিজ্ঞানসম্মত নৈর্ব্যক্তিকতায় তাদের মানসিকতা বিশ্লেষণের চেষ্টা করে আসলে ওই নরপিশাচদের ‘মানুষ’ প্রতিপন্ন করেছেন, সুতরাং তাঁর এই গবেষণার ফলে কার্যত সমাজের চোখে তাদের অপরাধ লাঘব হয়েছে। লক্ষণীয়, লিফটন কোনও ভাবেই নাৎসি ডাক্তারদের অপরাধ সমর্থন করেননি, সমালোচকরাও সে অভিযোগ তোলেননি, কিন্তু তাঁদের মতে ওই ঘাতকদের কোনও কথা শোনাই উচিত নয়, তাদের প্রাপ্য নির্ভেজাল নিরঙ্কুশ ঘৃণা।

কেন এই শুনতে না চাওয়ার মানসিকতা? মনোবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞরাও কেন নাৎসি অপরাধীদের মুখ বন্ধ রাখতে চান? আশিস নন্দী লিখছেন, এখানেই কাজ করে অন্তর্লীন এক ভয়। ভয়টা এই যে, যাদের নরপিশাচ বলে সমস্ত আলোচনা থেকে নির্বাসন দিয়েছি, তাদের কথা শুনলে এবং সেই কথা বিচার করলে হয়তো দেখা যাবে, তারা কোনও ভিন্ন প্রজাতির প্রাণী নয়, আমাদের সঙ্গে তাদের মনের কোনও অসেতুসম্ভব বিচ্ছেদ নেই, যে অন্ধকার তাদের মনগুলোকে গ্রাস করেছে, সেই অন্ধকারের ছায়া আমাদের মনেও। এই অন্ধকারটাকে নিয়ে মানুষ খুব ভয়ে ভয়ে থাকে, পাছে কোনও সুযোগে সে বেরিয়ে পড়ে। সেই ভয় এমনকী নিজের মনের কাছেও। লিফটন বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, ওরা জার্মান ছিল, তারা ছিল ইহুদি, কিন্তু আসলে যে কেউ হতে পারে। (ঘাতক হয়ে ওঠার) সম্ভাবনাটা সর্বজনীন, বিভিন্ন গোষ্ঠী সেই মানসিকতায় দীক্ষা নিতে পারে বা তার শিকার হতে পারে।’ আশিস নন্দীর মন্তব্য: এই কথাটা বলে দেওয়া আজকাল আর এত সহজ নয়। ঠিকই, ‘পলিটিকালি কারেক্ট’ থাকার দায় ক্রমশ বাড়ছে, এখন আপনি নাৎসি চিকিৎসকের মানসিকতা বুঝতে চাইলে সন্ধেবেলার টিভি চ্যানেল আপনাকে প্রচণ্ড চিৎকারে থামিয়ে দিয়ে বলবে, ‘আপনি হিটলারকে সমর্থন করছেন, এত বড় স্পর্ধা!’

ইন্ডিয়া’স ডটার তথ্যচিত্রের সমালোচকরাও তারস্বরে বলছেন, এক জন নরপিশাচের ভয়ঙ্কর নারীবিদ্বেষী উক্তি প্রচার করা মানে তাকে মহিমান্বিত করা। এই হাস্যকর কুযুক্তির পিছনে আছে ওই ভয়। অপরাধীর মন খুঁড়তে গিয়ে নিজের নিজের মন বেরিয়ে আসার ভয়। বেরিয়ে যে আসছে না, তা-ও তো নয়। দিল্লি ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্তদের পক্ষে দাঁড়ানো দুই উকিল যে সারগর্ভ কথামৃত পরিবেশন করেছেন, তা তো ইতিমধ্যেই ইতিহাস। তাঁদের কারণ দর্শানোর নোটিস পাঠিয়ে বার কাউন্সিল খুবই উচিত কাজ করেছেন, আশা করা যায় শুধু কারণ দেখিয়েই তাঁরা পার পাবেন না। কিন্তু সমাজে মেয়েদের স্থান সম্বন্ধে কিংবা ঘরের মেয়ে ‘অবাধ্যতা’ করলে তার জন্য বিহিত শাস্তি সম্পর্কে তাঁদের যে সুচিন্তিত ধারণাগুলি জানা গেল, তার সঙ্গে কেবল আশারাম বাপু নয় আমাদের চার পাশে বহু বহু সহনাগরিকের ধারণাও তো দিব্যি মিলে যায়! লেসলি উডউইনকে ধন্যবাদ, তিনি আমাদের একটা শক্তিশালী অস্ত্র সরবরাহ করেছেন। এর পর যখনই ভারতীয় পুরুষতন্ত্র নানান অছিলায় মেয়েদের নারীসুলভ আচরণের সদুপদেশ দিতে চাইবে, আমরা তাকে মনে করিয়ে দিতে পারব: মুকেশ সিংহও এ-রকমটাই বলেছিল বটে।

এবং, আশা করা যায়, এই ছবির সূত্র ধরেই অপরাধীর মন জানার তাগিদটাও ক্রমশ বাড়বে। আরও অনেক সমীক্ষা হবে, অনেক গবেষণাপত্র রচিত হবে, অনেক তথ্যচিত্র তৈরি হবে, অনেক তর্কবিতর্ক হবে, অপরাধের উৎসভূমিতে নতুন আলো পড়বে, সমাজমানসের ব্যাধিগুলিকে আরও স্পষ্ট ভাবে চিহ্নিত করা যাবে, যে ব্যাধির মূলে আঘাত করতে না পারলে অপরাধের নিরাময় সম্ভব নয়। সন্দেহ নেই, সমাজমন্থনের এই সব সৎ চেষ্টায় পুরুষতন্ত্র রে রে করে তেড়ে আসবে, হরেক কিসিমের সমাজপতিরা অপরাধীকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তুলবেন, রাষ্ট্র রক্তচক্ষু দেখাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আটকাতে পারবেন না। সমাজ দাঁড়িয়ে থাকে না, এমনকী সনাতন ভারতেও নয়।

ভরসা এখানেই। সিংহমশাইরা যতই নিষেধাজ্ঞা জারি করুন, যতই চোখ রাঙান, আমরা এ দেশের মানুষ ও দেশের মানুষ সে দেশের মানুষ সবাই যা দেখার ঠিক দেখে নেব, এবং দুনিয়ার হাটে দাঁড়িয়ে যা বলার সমস্বরেই বলব। তাতে ভারতের মাথা হেঁট হওয়ার কিছু নেই। ভারতীয় পুরুষতন্ত্রের মাথা হেঁট হতে পারে, হলেই মঙ্গল। আর হ্যাঁ, গণতন্ত্র অতি বিষম বস্তু, চতুর্দিক থেকে এই প্রতিবাদ আর ধিক্কার যদি জারি রাখা যায়, তবে, কে বলতে পারে, স্রেফ চাপে পড়েই হয়তো মহামান্য মোদীজিও নির্বোধ নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দু’বার ভাববেন। রাষ্ট্রযন্ত্রীদের শুভবুদ্ধির বিশেষ ভরসা করি না, কিন্তু তাঁদের স্বার্থবুদ্ধি যে টনটনে, সে বিষয়ে তো কোনও সন্দেহ নেই।

 

ঋণ: রেজিমস অব নার্সিসিজ্ম, রেজিমস অব ডেসপেয়ার, আশিস নন্দী (অক্সফোর্ড)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন