দেশ জুড়ে ব্রিটিশ প্রভুদের দাপুটে শাসন, বড় হচ্ছি পূর্ববঙ্গের বিবর্ণ জেলা শহরে, এই শহর ইতিমধ্যেই যেন স্থবিরতায় পৌঁছে গেছে, মানুষজনের হাঁটাচলাও অতি মন্থর, দিনযাপনে কোনও উত্তেজনা প্রবেশ করে না, মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি দু’টি যুবক ধরা পড়ে কারান্তরালে চলে যায়, সেই আলোড়নও স্তিমিত হয়ে আসে। হঠাৎ সেই শহরে প্রলয়কাণ্ডের মতো একটি ঘটনা, তখনকার প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক উপস্থাপক হরেন ঘোষের ব্যবস্থাপনায় উদয়শঙ্কর তাঁর দল নিয়ে এই শহরে আসছেন। উদয়শঙ্করের দল, অন্যান্যরা তো আছেনই, সেই সঙ্গে উত্তর ভারতের অতি-সম্ভ্রান্ত পরিবারে জাতা দুই সহোদরা জোহরা ও উজারা ‘হরপার্বতী’ নৃত্যে অবতীর্ণ হলেন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য শহরটির বিশেষ সুনাম ছিল না, খুচরোখাচরা দাঙ্গা যে কোনও ছুতোয় বাধিয়ে দেওয়া হত, অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন একটি ঘোর হিন্দু নৃত্যে দুই মুসলমান ভগিনীর নৈপুণ্য প্রদর্শন শহরে অশান্তি ডেকে আনতে পারে, তবে প্রশাসনের তীক্ষ্ন নজর ছিল। পর পর চার দিন উদয়শঙ্করের দল নৃত্যাভিনয় করলেন, বাড়ির বড়রা কী মনে করে এক সন্ধ্যায় আমাকেও সেই নাচ দেখতে নিয়ে গেলেন। নিছক নৃত্যনৈপুণ্য নয়, সেই সঙ্গে মিশে আছে এক সম্ভ্রান্ত সুষমা দুই বোনের প্রতিটি বিভঙ্গে। আমার বয়স তখন বড় জোর আট কি নয়, অবাক বিস্ময়ে সেই নৃত্যলীলা দেখতে দেখতে মনে হল রূপকথার মধ্যে ঢুকে গিয়েছি।

ক্রমশ জানা গেল, সত্যিই রূপকাহিনি! গত শতকের গোড়ার দিক, মুহম্মদ মমতাজুদ্দিন খান, রামপুর নবাব পরিবারের ঘনিষ্ঠ  আত্মীয়, অযোধ্যা অঞ্চলে তাঁর বিরাট তালুকদারি, এ ধরনের তালুকদার গোষ্ঠীর কেউই সাধারণত আলাদা জীবিকার কথা ভাবতেন না, বিলাসব্যসনে গা ডুবিয়ে দিতেন, কিন্তু মমতাজুদ্দিন আলিগড়ে পাঠ সাঙ্গ করে প্রাদেশিক সরকারি প্রশাসনে যোগ দিলেন। তাঁর সহধর্মিণীর ঐতিহ্যও একটু অন্য রকম। সিপাহি অভ্যুত্থানের সময় তাঁদের সমর্থন ঘোষণা করায় নাজিবাবাদের যে নবাবকে ইংরেজরা গুলি করে হত্যা করে, তিনি তাঁর সাক্ষাৎ পৌত্রী, তাঁর ধমনীতেও বিদ্রোহের ইশারা। সম্ভবত এই যুগ্ম-ঐতিহ্যের কারণেই তাঁদের সন্তানরাও গতানুগতিকতা পরিহার করতে সদা উদ্গ্রীব। সব মিলিয়ে সাতটি সন্তান, পাঁচটিই কন্যা। মমতাজুদ্দিন ফের নিজের অনন্যতার পরিচয় রাখলেন, রগরগে পাঠান আভিজাত্যের পরিবার, মেয়েদের জন্য বড় জোর ঘোর পর্দার আড়ালে গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করা হত মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অধ্যয়নের জন্য, অন্যথা উঁচু দেওয়াল-ঘেরা কোনও বালিকা বিদ্যায়তনে তাঁদের পাঠানো হত। প্রথা ভেঙে মমতাজুদ্দিন তাঁর জ্যেষ্ঠা দুহিতা হাজারাকে লাহৌরের বিদেশি পড়ুনিতে ঠাসা কুইন মেরি কলেজে ভর্তি করিয়ে দিলেন, হাজারাও সানন্দে পরিবারের বন্ধন মুক্ত হয়ে লাহৌরে চলে গেলেন। কিন্তু কয়েক মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পরেই অঘটন, পরমাসুন্দরী হাজারাকে দেখে এক নবাবজাদা তাঁর পাণিগ্রহণের প্রস্তাব পৌঁছে দিলেন, হাজারা তখনও কুড়িতে পৌঁছননি। জীবনের দিকবিদিক সম্পর্কে গভীর ঔৎসুক্য, নবাবজাদার গৃহকর্ত্রী হয়ে কানপুরের বিরাট প্রাসাদে দিনযাপনের স্বাদ কেমন, পরীক্ষা করে দেখতে তিনি গভীর আগ্রহী। নবাবজাদার সঙ্গে পরিণয় ঘটল এবং দু’দিনেই ভুল ভাঙল, ওই নবাবি প্রাসাদে তিনি আসলে গৃহবন্দিনি, বহুবিধ নিয়মনীতির ঘেরাটোপ, অতি-কড়া অনুশাসন, তিনি হাঁপিয়ে উঠলেন। স্বাধীন হতে চেয়ে পিতামাতার কাছে প্রত্যাবর্তন করলেন, বিবাহবিচ্ছেদের আবেদনও মঞ্জুর হল। হাজারা কলেজে ফিরে গিয়ে নতুন উদ্যমে অধ্যয়নে মগ্ন হলেন, ধাপে ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ পরীক্ষা পর্যন্ত। এক দিকে সাহিত্যরসে মশগুল, অন্য দিকে সাম্যবাদ তথা নারীমুক্তি সম্পর্কে অনেক তত্ত্ব ও তথ্য তাঁকে অন্য এক পথের ইঙ্গিত দিল, তাঁর দ্বিতীয় বিবাহ তৎকালীন যুক্তপ্রদেশ (মোটামুটি বর্তমান উত্তরপ্রদেশ)-এর কমিউনিস্ট নেতা জাইনউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে। এই বিবাহ উভয়ের পক্ষেই পরম প্রশান্তি ও সার্থকতা বোধের কারণ হয়েছিল। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে লখনউ বিশ্ববিদ্যালয়ে তরুণ অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর, অধ্যাপকদের বিশ্রামকক্ষে দূর থেকে সম্ভ্রমের সঙ্গে উর্দু ভাষার প্রধান অধ্যাপক হাজারা বেগমকে দেখতাম সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ছেন, কফিতে চুমুক দিচ্ছেন, তর্কে মাতোয়ারা। কখনও কখনও আমাদের মতো বাচ্চা অধ্যাপকদের সঙ্গে আদুরে গলায় আলাপচারীও হতেন।

মমতাজুদ্দিনের দ্বিতীয় কন্যা, পাঁচ বোনের মধ্যে সম্ভবত সুন্দরীতমা জোহরা কুইন মেরি কলেজে থাকাকালীনই স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন, পৃথিবীকে চমক লাগিয়ে দিতে হবে। এক বার ভেবেছিলেন দেশের প্রথম মহিলা বিমানচালক হবেন, প্রয়োজনীয় শিক্ষাগ্রহণের জন্য আবেদনপত্রও দাখিল করেছিলেন, জননীর আশঙ্কিত ম্লান মুখের দিকে তাকিয়ে অতঃপর মত বদল করে অন্য অভিনবত্বের অন্বেষণে মাতলেন। তিনি নৃত্যশিল্পী হবেন, ইসলামি রক্ষণশীলতাকে আঘাত করার পক্ষে এর চেয়ে বড় পদক্ষেপ আর কী হতে পারে! জোহরা সদ্য আঠারো বছর বয়সে পৌঁছেছেন, তাঁর এক পাগলাটে মাতুল একটি ভাঙাচোরা ‘জজ’ গাড়ি করে স্থলপথে আফগানিস্তান-ইরান গোটা পশ্চিম এশিয়া পেরিয়ে ভূমধ্যসাগরের উপকূল ধরে ইউরোপ পৌঁছে যাবেন। জোহরা লাফিয়ে উঠলেন, এই মাতুলের সঙ্গিনী হয়ে ওই হাড়জিরজিরে গাড়িতে অনেক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জার্মানিতে পৌঁছলেন। ড্রেসডেন শহরে মেরি উইগম্যান নাম্নী এক মহিলা একটি নৃত্যচর্চা বিদ্যায়তন খুলেছেন, কাতারে কাতারে শিক্ষার্থী শিক্ষার্থিনীরা জড়ো হচ্ছেন, জোহরাও ভর্তি হয়ে গেলেন দু’বছরের পাঠক্রমে। এরই মধ্যে উদয়শঙ্কর তাঁর ‘হিন্দু ব্যালে সংস্থা’ নিয়ে ড্রেসডেনে এক সন্ধ্যায় নৃত্য প্রদর্শন করলেন, অনুষ্ঠান সমাপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জোহরা রঙ্গমঞ্চের অন্দরে প্রবেশ করে উদয়শঙ্করের সঙ্গে দেখা করলেন, তিনিও উদয়শঙ্করের দলে যোগ দিতে পরম আগ্রহবতী, তাঁকে একটা সুযোগ দিতেই হবে। উদয়শঙ্কর জানালেন, জোহরা ড্রেসডেনের পাঠক্রম সাঙ্গ করে দেশে ফিরে যদি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তা হলে তখন একটা ব্যবস্থা করা সম্ভব। ১৯৩৩ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করে জোহরা উদয়শঙ্করের সঙ্গে পত্রালাপ শুরু করলেন। দু’বছর বাদে ডাক এল, তিনি সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় পৌঁছে গেলেন, কিন্তু একা নন, সঙ্গে ওঁদের তৃতীয় বোন উজারা, তিনিও ‘হিন্দু ব্যালে সংস্থা’তে যোগ দিতে সমান উৎসুক। দুই বোনকে নিয়ে অনুশীলন শুরু, কয়েক মাস বাদে কলকাতার নিউ এম্পায়ার মঞ্চে ভগিনীদ্বয়ের ‘হরপার্বতী’ নৃত্যানুষ্ঠান। খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ল। প্রায় তিন বছর উদয়শঙ্করের দল অবিশ্রান্ত ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, জাপান, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নৃত্যানুষ্ঠান নিয়ে ঘুরল, সেই দলে ছিলেন জোহরা ও উজারা।

অতঃপর উদয়শঙ্কর হিমালয়ের সানুদেশে আলমোড়া শহরে একটি নৃত্যশিক্ষা চর্চাকেন্দ্র স্থাপন করলেন, ভগিনীদ্বয়ও  সেই কেন্দ্রে যোগ দিলেন, জোহরার জীবনবৃত্তান্তে তখন আর এক নাটকীয় মোড়। তাঁর চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট একটি সাদামাটা হিন্দু পরিবারের সন্তান কমলেশ্বর সহগল সেই কেন্দ্রে বিদ্যার্থী, জোহরা তাঁর প্রতি অনুরক্ত হলেন, ফের বিস্ফোরণ ঘটিয়ে অভিজাত পাঠান কন্যা হিন্দু সন্তানটিকে বিবাহ করলেন, প্রচুর প্রশংসা কুড়োলেন সাহসিকতার জন্য, প্রচুর নিন্দাবাদও, জোহরার কোনও কিছুতেই পরওয়া নেই। উদয়শঙ্করের নৃত্যচর্চা কেন্দ্র কিছু দিন বাদেই বন্ধ হয়ে গেল, শিল্পীরা ছত্রভঙ্গ, জোহরা কমলেশ্বরকে নিয়ে লাহৌর পৌঁছে নিজেদের পরিচালনায় নৃত্যচর্চা সংস্থা গড়ে তুললেন। দুঃসাহস, কিন্তু জোহরা তো চিরদিনই দুঃসাহসিনী। ইতিমধ্যে দেশের রাজনীতিতে উথালপাথাল, সাম্প্রদায়িক তিক্ততা, ভুল বোঝাবুঝি ক্রমবর্ধমান, লাহৌরও থমথমে। নৃত্যচর্চা কেন্দ্রের ঝাঁপ ফেলে কমলেশ্বর ও দুই সন্তান-সহ জোহরার মুম্বই পাড়ি, সেখানেই বছর দুই আগে উজারা হামিদ বাট নামে এক ঘোর বামপন্থী উর্দু লেখকের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ, হামিদ গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত, পাশাপাশি হিন্দি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখে সামান্য উপার্জন, উজারাও গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, পৃথ্বীরাজ কপূরের নাট্যদলেও নিয়মিত অভিনয় করে চলেছেন। উজারার উৎসাহে এবং নিজেকে ফের প্রমাণ করার তাড়নায় জোহরাও নৃত্যশিল্পী থেকে নাট্যশিল্পী বনে গেলেন। পৃথ্বীরাজ কপূরের নির্দেশনায় নাটকের পর নাটকে অংশগ্রহণ করে আর এক বার সবাইকে চমকে দিলেন, যেন নতুন করে পাওয়ার জন্যই নিজেকে ক্ষণে ক্ষণে হারিয়ে যেতে দিচ্ছেন। গণনাট্য সঙ্ঘেও তিনি প্রায়ই অভিনয় করতেন, সঙ্ঘের ব্যবস্থাপনায় ‘গোদোর জন্য প্রতীক্ষা’-র ইংরেজি বয়ানেও। ১৯৪৬ সালে আইপিটিএ প্রযোজিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘ধরতী কে লাল’-এ অভিনয় করলেন জোহরা, চলচ্চিত্রের পর্দায় তাঁরও প্রথম আবির্ভাব।

ইতিমধ্যে মুম্বইতে সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্যে ভাটা এসে গেছে, প্রধানত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ও উঠতি শিবসেনার অনাচারে অবস্থা এমন দুঃসহ হয়ে উঠল যে, হামিদ বাট পাকিস্তানে চলে যাওয়া মনস্থ করলেন, সন্তানাদি নিয়ে উজারাও। কয়েক মাসের মধ্যে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে কমলেশ্বরের মৃত্যু। সেটা ১৯৫৯ সাল। সারা জীবন ধরেই জোহরা অদম্য তেজস্বিতার প্রমাণ দিয়েছেন, এ বার মুম্বই ছেড়ে দিল্লিতে, সেখানে সদ্য খোলা নাট্যকলা কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, সেই কলাকেন্দ্রই কয়েক বছর বাদে সংগীত নাটক অ্যাকাডেমির রূপ নেবে। কিন্তু দু’টি সন্তানকে যথাযথ অধ্যয়নের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে, অর্থের প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ষাট পেরিয়ে এসেছেন, সবাইকে তাজ্জব করে দিয়ে তাঁর পুরোমাত্রায় হিন্দি চলচ্চিত্রে যোগদান, অন্তত কুড়ি-পঁচিশটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন, কোনও জড়তা নেই, তাঁর সচ্ছল, কখনও বা উচ্ছল অভিনয়কলার সঙ্গে মিশে থাকত এক স্বভাব-আভিজাত্য। এখানেই শেষ নয়, নতুন শিল্পমাধ্যম, টেলিভিশন, তাতেও তিনি সমান স্বচ্ছন্দ, নব্বই পেরিয়ে এসেছেন, তাতে কী। একটি জীবনধারা মমতাজুদ্দিন খানের এই কন্যা যেখানে শুরু করেছিলেন, আর যেখানে তাঁর সৃষ্টিশীলতার শেষ প্রান্ত, মধ্যবর্তী দুস্তর ব্যবধান প্রমাণ দাখিল করল যে, লিঙ্গ-সম্প্রদায়-ধর্ম কোনও কিছুই কোনও যথার্থ সাহসিনীর পথ রোধ করে দাঁড়াতে পারে না।

কিন্তু আমার অন্য একটি কথাও জুড়বার ছিল। যে শতাব্দীগুলিকে আমরা মধ্যযুগ বলে অভিহিত করতে অভ্যস্ত, সেই সময়কালে ইসলাম ধর্মে অনুপ্রাণিত যে ব্যাপক আলোড়ন, স্পেন থেকে শুরু করে সমগ্র দক্ষিণ ইউরোপ অতিক্রান্ত করে পশ্চিম এশিয়া পেরিয়ে ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে সুদূর ইন্দোনেশিয়া দ্বীপপুঞ্জে যার সমাপ্তি, তা শুধু সামরিক শক্তির মধ্যবর্তিতায় জনপদের পর জনপদে শক্তির আধিপত্য স্থাপনেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বাগদাদ, ব্যাবিলন, তুরস্ক, পারস্য ইত্যাকার প্রতিটি দেশ থেকে একটি বিশেষ শিল্পনৈপুণ্য আহরণ ও বিচ্ছুরণও তার অন্য একটি প্রধান দিক। আর্যাবর্ত অঞ্চলে একদা মুঘল দরবারে সেই সমস্ত নৈপুণ্যের সংশ্লেষণ ঘটেছিল, বিশেষ করে শিল্পক্ষেত্রে, সংগীতচর্চায়, সূক্ষ্ম ক্ষুদ্রায়তন চিত্রকলায়, নৃত্যে, ভাষা ব্যবহারে, আদবকায়দায়। সমাজচেতনা যে স্তরেই থাকুক, এই সংশ্লেষণকে সম্মান না জানিয়ে উপায় নেই। আভিজাত্যের স্নিগ্ধতার সঙ্গে পারস্পরিক সহনশীলতা, আচরণ-বিচরণে শালীনতা, সৃষ্টিপ্রতিভার সঙ্গে সংবৃত সহ-অবস্থানে মুহম্মদ মমতাজুদ্দিন খানের সন্তানরা সেই সংশ্লেষণের উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু দেশভাগের পর এই সংশ্লেষণের ঐতিহ্য প্রায় অবলুপ্ত। বর্তমান আর্যাবর্তে যে কর্কশ, অশ্লীল, সামাজিক তথা রাজনৈতিক আচার-আচরণ তা, কে জানে, যদি হাজারা-জোহরা-উজারাদের সংখ্যার এত দ্রুত অবলুপ্তি না ঘটত, তা হলে হয়তো অন্য রকম হতে পারত, সমসাময়িক ইতিহাস হয়তো অন্য আদল পেত।