প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নির্দেশ দিয়েছেন, মেক ইন ইন্ডিয়া। ভারতে তৈরি করো। কী তৈরি করব? আমাদের দেশে কত কিছুই তো তৈরি হয়, আবার কত কিছু হয়ও না, মোদীজি কাদের কথা বলছেন? স্বাধীনতার পর থেকে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমরা সব কিছু নিজেরাই তৈরি করতাম। ফলে আশির দশকেও চলত পঞ্চাশের দশকের গাড়ির মডেল। বলা হত, বিদেশিদের দিশি বাজারে ঢুকতে দিলেই তারা দেশের শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বন্ধ করে দেবে। সারা দেশটা তিরিশ-চল্লিশ বছর পিছিয়ে ছিল আর তার সুবিধা নিত কতিপয় অদক্ষ, অপদার্থ দেশি শিল্পপতি, সরকারি বাণিজ্য নীতি যাদের বিদেশি প্রতিযোগিতার ঝড়ঝাপটা থেকে আগলে রাখত। সাধারণ ক্রেতাদের কথা কেউ ভাবত না।

সে সব দিন আর নেই। নব্বইয়ের দশক থেকে আমরা পৃথিবীর সামনে আমাদের দরজা-জানলা অনেকটাই খুলে দিয়েছি আর তখন থেকেই আমাদের বাজারে মুক্ত প্রতিযোগিতার হাওয়া লেগেছে। তার জেরে কিছু কিছু জিনিস আমরা তৈরি করি না, কারণ সেগুলো বিদেশিরা আরও ভাল করে তৈরি করতে পারে। আমরা শুধু সেগুলোই তৈরি করছি যেগুলোতে আমাদের আপেক্ষিক দক্ষতা আছে। এটাই মুক্ত বাজারের নিয়ম। এর ফলে সাধারণ ক্রেতাদের সরাসরি উপকার হয়েছে। মেক ইন ইন্ডিয়া বলতে মোদীজি নিশ্চয় বোঝাচ্ছেন না যে, সেই অন্ধকার দিনগুলোতে আবার আমাদের ফিরে যেতে হবে, যখন পারি আর না পারি, সব কিছুই আমরা তৈরি করার চেষ্টা করতাম।

বস্তুত, মেক ইন ইন্ডিয়া-র মর্মার্থ বোঝার আগে মুক্ত বাজারের তাৎপর্য ভাল করে বোঝা দরকার। মুক্ত বাজারের ফলে ক্রেতাদের যে সরাসরি সুবিধা হয়েছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু এ ছাড়াও বাধাহীন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কিছু দীর্ঘমেয়াদি ফল আমাদের দেশে লক্ষ করা যায়, যার সারাংশ হল এই যে, দরজা-জানলা খুলে দেওয়ার ফলে আমাদের দেশে বিদেশি জিনিসের আমদানি যত বড়েছে, বিদেশে আমাদের জিনিসের রফতানি ততটা ভাল বাড়েনি। নামী বহুজাতিকের ছাপ মারা মোটরগাড়ি, ফ্রিজ-টিভি-মোবাইল-ল্যাপটপ, ডিজাইনার কামিজ-পাৎলুন, প্রসাধনী, সবই আজকাল হাতের নাগালে চলে এসেছে এবং ক্রেতারা সেই সব জিনিসপত্র হামলে পড়ে কিনছেন। তুলনায় বিদেশে বেচার মতো শিল্পজাত পণ্য বলতে সেই সনাতন মণিরত্ন ও গয়নাগাঁটি, চামড়ার তৈরি টুকিটাকি, সামান্য কিছু হালকা এবং সাদামাটা যন্ত্রপাতি। অর্থাৎ, বিশ্বায়নের আগে আমাদের রফতানির চেহারাটা যে রকম ছিল, এখনও প্রায় সে রকমই রয়ে গেছে। শুধু কিছু পরিষেবা রফতানি, বিশেষ করে তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে, আগে ছিল না, ইদানীং হয়েছে।

একটু তলিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁরা বলবেন, রফতানি যদি তেমন করে না বাড়ে, তা হলে কীসের বিনিময়ে আমরা আমদানি করা জিনিসগুলো কিনছি? কেউ তো আর অমনি-অমনি বিদেশ থেকে আমাদের জিনিসপত্র পাঠাচ্ছে না। এটা ঠিক যে, আমদানি এবং রফতানির মধ্যে একটা ফারাক থেকেই যাচ্ছে, অর্থনীতির কেতাবে যার নাম ট্রেড ডেফিসিট বা বাণিজ্য ঘাটতি। বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে গেলে বিদেশ থেকে ডলার আসার মোটামুটি তিনটে রাস্তা আছে বিদেশিদের দান-খয়রাতি, ভারতের মাটিতে দীর্ঘমেয়াদি বিদেশি বিনিয়োগ এবং দেশের শেয়ার বাজারে ডলারের প্রবেশ। প্রথম দুটো রাস্তা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ, এ সব রাস্তায় এক বার ডলার ঢুকলে চট করে আবার বেরিয়ে যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, গত এক দশকে এই রাস্তায় বিদেশি মুদ্রা ঢুকেছে কম, যে বিদেশি টাকা দেশে ঢুকেছে, তার সিংহভাগই ঢুকেছে শেয়ার বাজারের পথে। শেয়ার বাজারে ঢোকা ডলার অত্যন্ত চঞ্চলমতি। এক বার ঢুকে আবার কিছু দিনের মধ্যেই বেরিয়ে যেতে পারে। এর ওপর ভরসা করা যায় না। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে, টাকার দাম কমেছে, কখনও কখনও বাণিজ্য ঘাটতি মেটাতে ধার করতেও হয়েছে।

বলা দরকার, ইদানীং আমাদের বাণিজ্য ঘাটতি খানিকটা কম। এর কারণ, আমাদের প্রধান আমদানি যে-তেল, আন্তর্জাতিক বাজারে তার দাম কমে যাচ্ছে। কিন্তু এখন কমে যাচ্ছে বলে তেলের দাম ভবিষ্যতেও কম থাকবে, এমন মনে করার কারণ নেই। অর্থাৎ, শেয়ার বাজারে ঢোকা ডলারের মতো তেলের আন্তর্জাতিক দামও অতিমাত্রায় অনিশ্চিত। সুতরাং আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দম কম থাকবে ধরে নিয়ে ভোগ্যপণ্যের আমদানি বাড়ানো যায় না।

তা হলে এটাই দাঁড়াচ্ছে যে, বিদেশি জিনিসপত্র কেনার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ অর্জন করতে হবে রফতানি থেকেই। এমন জিনিস আমাদের তৈরি করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রয়যোগ্য। আর এটাই মেক ইন ইন্ডিয়া-র প্রকৃত মর্মার্থ। এখানে অনিবার্য ভাবে কয়েকটা প্রশ্ন উঠে আসে। এত দিন আমরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে এমন জিনিসপত্র খুব বেশি তৈরি করতে পারিনি কেন? কী করলে পারব? পারলে, রফতানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অর্থনীতিরও কি সার্বিক উন্নতি হবে? শেষ প্রশ্নটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

আমাদের দেশে ম্যানুফ্যাকচারিং বা উৎপাদন শিল্পকে দু’টি ক্ষেত্রে ভাগ করা যায়: নথিবদ্ধ (রেজিস্টার্ড) উৎপাদন শিল্প এবং অ-নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্প। যে সব শিল্পসংস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় এবং দশ বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করেন, অথবা যেখানে বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয় না কিন্তু কুড়ি বা তার বেশি শ্রমিক কাজ করেন, তারা নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্পের আওতায় পড়ছে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের মাত্র ১১-১২ শতাংশ আসে উৎপাদন শিল্প থেকে। তার মধ্যে নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্প থেকে দুই-তিন শতাংশর বেশি কর্মসংস্থান আসে না। পক্ষান্তরে, জাতীয় আয়ে উৎপাদন শিল্পের অবদান ১০-১১ শতাংশ, কিন্তু তার সিংহভাগ (প্রায় ৭০ শতাংশ) অবদান নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্পের। অর্থাৎ, কম লোক নিয়ে নথিবদ্ধ কলকারখানাগুলি বেশি উৎপাদন করছে, কারণ তাদের উৎপাদনশীলতা বেশি।

অনথিবদ্ধ উৎপাদন সংস্থাগুলি আসলে কোনওক্রমে টিকে আছে। কৃষিতে স্থানাভাব জমি প্রায় নেই, যেকুটু ছিল পরিবার বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বহুধা-খণ্ডিত। তাই কেবলমাত্র বেঁচে থাকার তাগিদে ঘরের মধ্যে, বাড়ির আঙিনায় কিংবা অস্থায়ী ছাউনির তলায় আদ্যিকালের প্রযুক্তি এবং অদক্ষ শ্রম দিয়ে যা তৈরি করা যায়, সেটাই অনথিবদ্ধ উৎপাদনের বেশিটা জুড়ে আছে। স্বাভাবিক কারণেই এখানে উৎপাদনশীলতা কম। শুধু যে উৎপাদনশীলতা কম, তা-ই নয়, এই উৎপাদনের মান অতি অনিশ্চিত। কখনও মোটামুটি, কখনও বেশ খারাপ। এ রকম অনিশ্চিত মান, এ রকম অচল প্রযুক্তি, অদক্ষ শ্রম ও নিম্ন ধরনের উৎপাদনশীলতা নিয়ে যদি-বা জীবন-সমুদ্রে কোনওমতে ভেসে থাকা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে এক মুহূর্তও টিকে থাকা যায় না। তাই রফতানি যদি বাড়াতেই হয়, তা হলে নথিবদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে তাকাতে হবে, যেখানে শ্রমিকদের কিছু শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা আছে এবং যেখানে প্রযুক্তিও আপেক্ষিক ভাবে আধুনিক।

আর এক ভাবে আমরা একই সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সনাতন তত্ত্ব অনুযায়ী আর্থিক উন্নতির চিহ্ন হল নিম্ন উৎপাদনশীল ক্ষেত্র থেকে ক্রমাগত উচ্চ উৎপাদনশীল ক্ষেত্রে শ্রমিকদের যাত্রা। গরিব দেশগুলিতে কৃষির উৎপাদনশীলতা কম। তাই, যদি দেখতে পাই কর্মসংস্থানের দিক থেকে দেশে কৃষির গুরুত্ব কমছে, উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পের গুরুত্ব বাড়ছে, তখন ধরে নিতে হবে দেশের উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু জীবিকার তাগিদে মানুষ যদি কৃষি থেকে নিম্ন উৎপাদনশীল অনথিবদ্ধ ক্ষেত্রের দিকে যাত্রা করে, তাকে কখনওই প্রগতি বলা যাবে না।

অর্থাৎ, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ কথাটার প্রকৃত তাৎপর্য হল, যে অতি ক্ষুদ্র উচ্চ উৎপাদনশীল ক্ষেত্রটি দেশে আছে, তার প্রসার ঘটানো। এর ফলে যেমন এক দিকে রফতানি বাড়বে, তেমনই অন্য দিকে সার্বিক ভাবে মানুষের অবস্থারও উন্নতি ঘটবে। প্রশ্ন হল, কী করলে উৎপাদনশীল ক্ষেত্রটির প্রসার ঘটতে পারে? একটু খেয়াল করে দেখলে বোঝা যাবে, নথিবদ্ধ এবং অ-নথিবদ্ধ ক্ষেত্রের উৎপাদনশীলতার তফাতের পিছনে একটা বড় কারণ হল প্রথমটির তুলনায় দ্বিতীয়টিতে শ্রমিকদের গড় শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ অনেকটাই কম। ২০০৪-০৫-এর ন্যাশনাল স্যাম্পল সার্ভে বা জাতীয় নমুনা সমীক্ষা থেকে জানতে পারছি, নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্পে ৪৩ শতাংশ শ্রমিক অন্তত মাধ্যমিক পাশ করেছেন, কিন্তু অ-নথিবদ্ধ উৎপাদন শিল্পের ২০ শতাংশ শ্রমিকও মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা করেননি। উল্টো দিক থেকে বলা যায়, আমাদের দেশে এখনও উচ্চ এবং মাঝারি পর্যায়ের শিক্ষার প্রসার ততটা ঘটেনি বলেই উৎপাদনশীল ক্ষেত্রগুলির প্রসার ঘটছে না। উচ্চ উৎপাদনশীল শিল্পের প্রসার ঘটানোর জন্য অবশ্য রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, প্রশাসনিক দ্রুতি, উন্নত পুঁজির বাজার ইত্যাদি আরও কিছু কিছু পরিকাঠামো দরকার। কিন্তু সবার আগে দরকার মানবসম্পদ এবং সেই সম্পদ বৃদ্ধির জন্য উচ্চ এবং মাঝারি পর্যায়ের শিক্ষার প্রসার, যেটা স্বাধীনতার পর থেকে কাম্য হারে ঘটেনি।

নতুন কেন্দ্রীয় সরকার কি শিক্ষার প্রসারের জন্য যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছে? এ বছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ হয়েছে মোট ব্যয়ের ৩.৪ শতাংশ। উল্লেখ করা যেতে পারে, ২০১৩-১৪ সালে ইউ পি এ সরকারের শেষ বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ছিল মোট ব্যয়ের ৪.৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ, নতুন সরকার এসে যে দরিদ্র, পিছিয়ে পড়া ভারতবাসীকে শিক্ষিত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন, এমন কথা আদৌ বলা যাবে না। তা হলে কি আশা করা হচ্ছে যে, মেক ইন ইন্ডিয়া অমনি অমনি হাওয়ার মধ্যে ঘটে যাবে?

শেষে আর একটা কথা বলা দরকার। জনসংখ্যার বিন্যাসের দিক থেকে অর্ধেকের বেশি ভারতীয় যে এখন পঁচিশ বছরের কমবয়সি, এই সত্যটাকে মোদীজি আমাদের বিপুল সুবিধা বলে দেশেবিদেশে প্রচার করেছেন। কিন্তু  এই বিরাটসংখ্যক অল্পবয়সি ছেলেমেয়েকে ঠিক মতো শিক্ষিত করতে না পারলে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থান করা যাবে না। তখন সেই বিপুল সম্পদ একটা মস্ত বোঝায় পরিণত হবে।

 

কলকাতায় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিকাল ইনস্টিটিউট-এ অর্থনীতির শিক্ষক।