Advertisement
০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
শাহি সমাচার

দল নয়, বেশি গুরুত্ব পাচ্ছেন ‘ভাল একনায়ক’

এ-ও এক ধরনের অবতারবাদ। ব্যক্তির উপর অবতারত্ব আরোপ করা। একনায়ককে যখন মানুষ ক্ষমতায় বসায় তখন ভাবা হয় তিনি ‘ভাল’ মহানায়ক হবেন। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল।এ-ও এক ধরনের অবতারবাদ। ব্যক্তির উপর অবতারত্ব আরোপ করা। একনায়ককে যখন মানুষ ক্ষমতায় বসায় তখন ভাবা হয় তিনি ‘ভাল’ মহানায়ক হবেন। লিখছেন জয়ন্ত ঘোষাল।

শেষ আপডেট: ১৯ মার্চ ২০১৪ ০০:০৫
Share: Save:

গোটা দেশ জুড়ে এখন একটাই আলোচনা। নরেন্দ্র মোদী। মোদী প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন কি শেষ পর্যন্ত? দশ বছরের শাসনের পর মনমোহন সিংহ সরকারের প্রতি ভারতীয় জনসমাজের বীতরাগ তো স্পষ্ট। কিন্তু সেই নেতিবাচক ভোটের রাজনৈতিক পরিসর দখল করবেন কে— মোদী না রাহুল গাঁধী? নাকি খিচুড়ি সরকার? ভোটের ফলাফল যা-ই হোক, একটা প্রবণতা দেখছি, মানুষ দলের চেয়েও এ বার বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এক ‘ভাল একনায়ক’-এর উপর। আর সেখানেই আমার উদ্বেগ!

Advertisement

দেশ-সমাজ নানা কারণে কার্যত গোল্লায় যাচ্ছে। মূল্যবৃদ্ধি-মুদ্রাস্ফীতি চরমে। ধনী-দরিদ্রের মধ্যে অসাম্য বাড়ছে বই কমছে না। দুর্নীতি গোটা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে। মানুষ যখন এমন এক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অসহায় হয়ে যায় তখনই তার এক নায়কের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। এক জন মানুষ আসবেন, যিনি সব সমস্যার সমাধান করে দেবেন। তাই একনায়কেরও জন্ম দেয় আমজনতা।

এর আগেও এই ‘শাহি সমাচার’-এ বার বার রূপকথার রাজনীতির কথা বলেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভগ্নহৃদয় ব্রিটিশ জনসমাজকে শান্তি দিতে এসেছিলেন এম আই জি থেকে জেমস বন্ড। শারদীয়া অনুষ্টুপ ১৪২০-তে (বর্ষ ৪৮, ১ম সংখ্যা) মৈত্রীশ ঘটক ও অমিতাভ গুপ্তের রচনা একনায়ক ভাল এক নায়কের সন্ধানে আরও কয়েকটি দৃষ্টান্ত পেলাম। ১৯৩৩ সালে মার্কিন কমিক স্ট্রিপ সুপারম্যানের জন্মর পটভূমিও ১৯৩০ সালের মহামন্দার দাউদাউ আগুন। সত্তরের ভারতে অমিতাভ বচ্চনের জন্মও ওই একই কারণে। নেহরু যুগ পেরিয়ে ভারত পা রেখেছে এক দুর্নীতির ভয়াবহ পঙ্কে। সেই সম্মিলিত হতাশার মাটিতেই অমিতাভ বচ্চনের জন্ম।

আজ গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীকে দিল্লির মসনদে বসিয়ে দিলেই দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন হবে এমনটাই ভাবতে শুরু করেছেন অনেকে। অতীতে বিজেপি যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন দলের স্লোগান ছিল, বিজেপি পার্টি উইথ ডিফারেন্স। সে বার প্রথম বিজেপি দিল্লির মসনদ দখল করল। বিজেপি-র প্রচার ছিল, অটলবিহারী বাজপেয়ীকে একটা সুযোগ দেওয়া হোক।

Advertisement

নেহরু ক্ষমতায় আসার পর স্বাধীন ভারতবাসী ভেবেছিলেন ব্রিটিশরা চলে গিয়েছে, এ বার দেশে সব সমস্যার সামাধান হবে। কিন্তু নেহরু থেকে ইন্দিরা হয়ে রাজীব, দীর্ঘ কংগ্রেস শাসনে সমস্যার কোনও মৌল সমাধান হয়নি। আর এই অনুভব থেকেই মানুষ বিজেপি-কে সুযোগ দিয়েছিল। ’৭৭-এর পর ’৮৯ সালে দু’-দু’বার কংগ্রেস বিরোধী সরকার হলেও সরকারে বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দল ছিল না। এনডিএ জমানায় বিজেপি হল প্রধান বৃহৎ রাজনৈতিক দল। ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নেহরুর যুগে ছিল কংগ্রেসের আধিপত্যে থাকা বহু দলীয় ব্যবস্থা। রজনী কোঠারি বলেছিলেন, ‘সিঙ্গল পার্টি ডমিন্যান্ট মাল্টিপার্টি সিস্টেম’। বিজেপি-র সাফল্য হল জনসঙ্ঘ থেকে বিজেপি হয়ে ধীরে ধীরে দেশের প্রধান প্রতিপক্ষে পরিণত হওয়া। তবে ক্ষমতায় ছ’বছর থেকেই পার্টি উইথ ডিফারেন্স-এর স্লোগান নানা কারণে লঘু হয়ে যায় এবং বিজেপি ক্ষমতাচ্যুত হয়।

এ বার বিজেপি সমর্থকদের পাশাপাশি দেশের এক বৃহৎ জনসমাজ মোদীকে চাইছেন সেই স্বপ্নবিলাসে: বিজেপি নয়, মোদী পারবেন।

এ-ও এক ধরনের অবতারবাদ। ব্যক্তির উপর অবতারত্ব আরোপ করা। একনায়ককে যখন মানুষ ক্ষমতায় বসায় তখন ভাবা হয় তিনি ‘ভাল’ মহানায়ক হবেন। যেমন, মধ্যযুগে ইউরোপে ‘বেনিভোলেন্ট ডেসপটিজম’-এর যুগ ছিল। স্বৈরতন্ত্র বটে, কিন্তু ‘উপকারী’ স্বৈরতন্ত্র। অনেকটা কাঠালের আমসত্ত্ব! একনায়ক কি কখনও ভাল হতে পারেন?

মৈত্রীশ ঘটক ও অমিতাভ গুপ্ত মনে করিয়েছেন, কাস্ত্রো থেকে পিনোশে, গদ্দাফি থেকে রবার্ট মুগাবে, জিয়া উল হক থেকে মহেন্দ্র রাজাপক্ষ— গোটা দুনিয়ায় ভাল একনায়ক হয়নি কখনও। তা ছাড়া কল্যাণ অর্থনীতিতে যে সোশ্যাল প্ল্যানার তাতে বলা হয়, সমাজের সকলের জন্য শ্রেষ্ঠ ফল যাতে পাওয়া যায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। সমস্যা হচ্ছে, সমস্ত নাগরিকের পছন্দ-অপছন্দ, ভাল-মন্দর অগ্রাধিকার তো বিভিন্ন। একনায়ক ভাল হলেও তিনি শিল্পের উন্নয়নের জন্য এমন কোনও দৃঢ় ব্যবস্থা নিতে পারেন যা সমাজের প্রান্তিক চাষিদের স্বার্থবিরোধী? এ ক্ষেত্রে ভাল একনায়ক কার পক্ষ নেবেন?

ভারত আজ বহু দিন হল এক জোট যুগে আবির্ভূত, যাকে বলা হয় কোয়ালিশন যুগ। অদূর ভবিষ্যতে এই জোটের রাজনৈতিক সংস্কৃতি অবলুপ্ত হবে এমনটা মনে হয় না। ভারতে ২৯টি রাজ্য। নানা ধরনের আঞ্চলিক প্রত্যাশা ও বিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার পর নেহরু যুগে এই সব বিচ্ছিন্নতার সমস্যা ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজও সে সব সমস্যার সমাধান হয়নি। প্রফুল্ল সেন তখন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, নেহরুর পরামর্শে গোটা ক্যাবিনেট নিয়ে দার্জিলিং যান মুখ্যমন্ত্রী। বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত ছিল, উন্নয়নের মাধ্যমে পাহাড়ের মানুষের বিচ্ছিন্নতা দূর করতে হবে। দুর্ভাগ্য, আজও সেই বিচ্ছিন্নতার সমস্যা বহাল। (with West Bengal Chief Ministers Memoirs-1962 to 1977, Saroj Chakrabarty)।

এই যুক্তরাষ্ট্রীয় বিশাল ভারত নানা প্রান্তের ভিন্নতা, অসাম্য, নানা আঞ্চলিক দলের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাশা পূরণের চেষ্টা করছে। আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হল, অধিকাংশ আঞ্চলিক দলের সমর্থকেরাও এই একানায়কতন্ত্রে আস্থা রাখেন। অধিকাংশ দলই মতাদর্শের চেয়ে এক জন নেতা বা নেত্রীকে আঁকড়ে ধরেন বেশি। কোথাও তা মুলায়ম, কোথাও জয়ললিতা, কোথাও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ১৯৮৪ সালের বিজেপি-র লোকসভা সদস্য ছিল ২, ’৮৯ সালে ৮৬, ’৯১ সালে ১২০, ’৯৬ সালে ১৬১, ’৯৮ সালে বেড়ে ১৮২, ’৯৯ সালে ১৮২। ২০০৪ সালে কিন্তু কমে ১৩৮, ২০০৯ সালে আরও কমে ১১৬। অঙ্কের বিচারে বিহার বাদে পূর্ব ভারত, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ ভারত (কর্নাটক বাদে) ২০০ উপরে আসন সংখ্যা, যেখানে বিজেপি কার্যত নেই। তা হলে বিজেপি উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে এক অভূতপূর্ব ফলাফল দেখিয়ে যদি সরকার গড়ে তা হলেও কিছুতেই এতটা ভাল ফলাফল হতে পারে না যেখানে আঞ্চলিক দলের সমর্থন দরকার হবে না। শুধু অকালি বা শিবসেনা নয়, বিজেপি-র প্রয়োজন হবে জয়ললিতা বা মায়াবতীকেও।

আর তাই ভাল একনায়কের রূপকথা যতই জনপ্রিয় হোক আসলে আজ প্রয়োজন ‘বিকেন্দ্রিত রাজনৈতিক পরিসর’, যে বিকেন্দ্রিত প্রশাসনের জন্য শক্তিশালী এক প্রধানমন্ত্রী আবশ্যক এ কথাও অনস্বীকার্য। মনমোহন সিংহের দুর্বল রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দেখে মানুষ বিরক্ত, ক্লান্ত, হতাশ। তাই চাই শক্তিশালী জবরদস্ত প্রশাসক। কিন্তু তার জন্য ভাল একনায়ক সন্ধানের রূপকথা অনাবশ্যক।

কেন্দ্রে চাই এমন এক সরকার তা সে যে দলেরই পরিচালনায় হোক, সে সরকারকে সমস্ত আঞ্চলিক দলের সমস্যাগুলির দিকে সমান শ্রদ্ধার সঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পোশাক পরে নির্বাচনী প্রচার অতীতে নেহরু-ইন্দিরা করেছেন। আজও মোদী-রাহুল করছেন। কিন্তু আসলে প্রয়োজন, ভাবনা থেকে তেলা মাথায় তেল দেওয়ার ভাইরাসকে দূর করা। কাজটা সহজ নয়। প্রত্যেক রাজনেতাকেই দেখি ক্ষমতায় এসে ভাবতে শুরু করেন দিল্লিই ভারত।

বিরোধী নেতা যখন শাসক নেতা হন, ঠিক তখন থেকেই উল্টোরথের যাত্রা শুরু হয়। অজয় মুখোপাধ্যায়ের সরকারে ’৬৭ সালে এসইউসিআই নেতা তথা শ্রমমন্ত্রী সুবোধ বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ছিল ‘ঘেরাও মন্ত্রী’। তিনি বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নকে ঘেরাও শিখিয়েছিলেন। আর সেই সুবোধবাবুই ঘেরাও হন বিক্ষুব্ধ কর্মীদের হাতে। ঘেরাও মন্ত্রীই শিকার হয়েছিলেন ঘেরাওয়ের।

ভারতের ইতিহাসে কেন, গোটা পৃথিবীর ইতিহাসে বার বার এমন হয়েছে। জনপ্রিয় মানুষের নেতাকে মানুষই মহানায়ক বা একক নায়কে পরিণত করেন। তার পর তার স্বৈরাচারে অত্যাচারিত হয়ে সেই রাজার মূর্তিই খান খান করতে সেই মানুষই তৎপর হয়। রিপাবলিক আর ডেমোক্র্যাসির মধ্যে কতখানি ফারাক তা নিয়ে সবিস্তার আলোচনায় না গিয়েও শুধু এটুকু বলতে পারি, আজ আমাদের দেশে নির্বাচনী গণতন্ত্রের নামে যে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হয় তা প্রজাদের দ্বারা নির্বাচিত রাজা ও তাঁর তন্ত্র। সেই রাজাকে অবশ্য আজ মন্ত্রিসভা, দল তথা জোটের কথা শুনে চলতে হয়। পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলবেন, নেশন নয় চাই সমাজ। রাষ্ট্রীয় ঐক্য নয়, চাই সামাজিক সামঞ্জস্য। নতুন এক রাজা আসুন। প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোশাকি নাম। কিন্তু তিনি রাজধর্ম পালন করুন এটাই প্রত্যাশা।

একনায়কতন্ত্র নয়, বরং তিনি সামাজিক সামঞ্জস্যকে মূলমন্ত্র করুন।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.