Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ মে ২০২২ ই-পেপার

URL Copied
Something isn't right! Please refresh.

প্রবন্ধ ১

বাপের বাড়ি যেতে চান?

মা দুর্গা বাঙালি ঘরের বউ বলে তবু বছরে নিয়ম করে এক বার বাপের বাড়ি আসতে পারেন। উত্তর ভারত হলে সেটা আরও অনেক কঠিন হত।বছরে এক বার দুগ্গা-দুগ্গা

শাশ্বতী ঘোষ
২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০০:০৫
Save
Something isn't right! Please refresh.
Popup Close

বছরে এক বার দুগ্গা-দুগ্গা বলে মা দুর্গাও ছেলেপুলে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। বাঙালি মসীজীবীরা সে সময় যান উত্তুরে পাহাড়ে হাওয়া বদলাতে, ঘরের বউ মা দুর্গা যান উল্টোপথে— পাহাড় থেকে সমতলে, বাপের বাড়ি। এটুকু পর্যটন শাস্ত্রকার থেকে সমাজের জ্যাঠামশাইরা তাঁকে করতে দিয়েছেন। না কি, এটুকুই শুধু করতে দিয়েছেন? বাহিরের পরিসর মানে মেয়েদের জন্য শুধুই বাপের বাড়ি যাওয়া। শ্বশুরবাড়িতে মনোমালিন্য হলে বউরা আজও বাপের বাড়ি যাওয়ার হুঙ্কার দেন। অনেকের ক্ষেত্রে সেটি শুধুই হুঙ্কার। কারণ, বাপের বাড়ি বেড়াল পার করা করে বিয়ে দিয়েছে, ফিরে আসার পথটি খোলা রাখেনি।

তবু, মা দুর্গা বাঙালি ঘরের বউ বলে বছরে নিয়ম করে এক বার বাপের বাড়ি আসতে পারেন। উত্তর ভারত হলে সেটা আরও অনেক কঠিন হত। শুধু বাপের বাড়ি যাওয়ার সুযোগ নয়, বউদের বহু অধিকারই এ দেশে স্থানভেদে, জাতিভেদে বদলে যায়। দক্ষিণের তুলনায় উত্তর ভারতের পিতৃতন্ত্রের ছায়া অনেক বড়, শিকড় অনেক গভীরে। বিশেষত, কেরল, ওড়িশা, পশ্চিমবঙ্গ, অসমে মেয়েদের অবস্থা তুলনায় ভাল। সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা তুলনায় বেশি। সমগোত্রে, এমনকী নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়ে অনুমোদিত, নিয়ম করে অনেক দূরে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া হয় না। অন্য নানা বিষয়েও আপেক্ষিক সক্ষমতার স্বাক্ষর রয়েছে: নারী-পুরুষ অনুপাত মেয়েদের দিকে ঝুঁকে, শিশুকন্যার অনুপাত তুলনায় ভাল, শিশুমৃত্যুর হার কম, ঘরের বাইরে মেয়েদের কাজে যোগদানের হার বেশি। উত্তর ভারতে এ সব নিরিখেই মেয়েরা পিছিয়ে, এমনকী শিশুকন্যার তুলনায় শিশুপুত্রের টিকাকরণ হয় বেশি। বিয়ে দূরে হতে হবে, ভিন্ন গোত্রে তো বটেই।

কেন সব মা-দুগ্গাদের সোয়ামির ঘর তাঁদের মায়ের বাড়ির কাছেই হয় না? অনেক গবেষক বলেন, ধান উৎপাদনে বেশি জল লাগে, মাঠের কাজে মেয়েদের অংশগ্রহণ বেশি, তাই তাদের সামাজিক মূল্য বেশি। তুলনায় শুখা মাটির শস্য, যেমন গম, জোয়ার, বাজরায় জল কম লাগে। এ সব ফসল যেখানে ফলে, সেখানে মেয়েদের শ্রম জরুরি নয় বলে স্বীকৃতি কম। আবার অন্য অনেকের মত, সম্পত্তির অধিকারের সঙ্গে ব্যাপারটার নিবিড় যোগ রয়েছে। যে সব গোষ্ঠী জমির উপর জন্মদাতা পরিবারের দখল বেশি করে কায়েম রাখতে চায়, তারা মেয়েদের কাছে বিয়ে দিয়েছে, নিকটাত্মীয়ের মধ্যে বিয়েতে স্বীকৃতি দিয়েছে, জমিতে মেয়েদের অধিকার দিয়েছে। এর এক প্রান্তে আছে মেঘালয় বা কেরলের বিভিন্ন গোষ্ঠী, যারা মেয়েদের দিক থেকেই জমির অধিকারকে স্বীকার করে, তাদের অনেকের ক্ষেত্রে বিয়ের পর বরেরা বউয়ের বাড়ি গিয়ে থাকেন। তবে সে সব গোষ্ঠীতেও পুরুষরাই জমি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন, কেবল বরের দিকের লোক বা কাকা-জ্যাঠা না হয়ে তাঁরা হন বউয়ের দিকের লোক— মামা প্রভৃতি। পূর্ব ও দক্ষিণ ভারতে পণের দাবি তুলনায় কম, বিবাহিতা মেয়েরা কৃষিজমির, সীমিত হলেও, অধিকার পান।

Advertisement

উত্তর ভারতের মেয়ে হলে বাধা অনেক। সমগোত্রে তো নয়ই, সেই গোত্রের মানুষ যে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছেন, তত দূর পর্যন্তও বিয়ের সম্বন্ধ হবে না। সব বয়সের মেয়েদের জন্যই পর্দাপ্রথা বাধ্যতামূলক। শাসনের নিগড় জাঁকিয়ে বসেছে এতটাই যে, মেয়েদের ঘিরে থাকবে বড় পাঁচিল, তাঁরা হবেন নিরক্ষর, বহুপুত্রপ্রসবিনী। তাঁদের দূরে বিয়ে হবে এ জন্যই যে, মেয়ে শ্বশুরবাড়িতে কোনও বিপদে পড়লে বাপের বাড়ির কেউ বাঁচাতে আসবে না। দূরদেশ থেকে এসে কোন মেয়ে আর পিতৃসম্পত্তি বা কৃষিজমির অধিকার নিতে সাহস করবে? উত্তর ভারতের বড় জমির মালিকদের চাপে ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন কৃষিজমিতে মেয়েদের অধিকার দেয়নি। মেয়েরা তো বিয়ে হয়ে দূরে চলে যাবে— তারা আর কৃষিজমি নিয়ে কী করবে? দক্ষিণের বেশ কয়েকটি রাজ্য আইন সংশোধন করে আংশিক অধিকার দিলেও, হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে ২০০৫ সালের সংশোধনের আগে দিল্লি, হরিয়ানা, পঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, হিমাচল আর জম্মু ও কাশ্মীর বিবাহিতা মেয়েকে জন্মগত পরিবারের সম্পত্তিতে, বিশেষত কৃষিজমিতে কোনও অধিকার দেয়নি। ১৯৫৬ সালের হিন্দু উত্তরাধিকার আইন হিন্দু বিবাহিত মেয়েদের সম্পত্তিতে যেটুকু সীমাবদ্ধ অধিকার দিয়েছিল, হরিয়ানা নতুন রাজ্য হিসেবে গঠিত হবার পর সেটুকুও দিতে অস্বীকার করে— তিন বার রাজ্য স্তরে সংশোধন আনতে চেষ্টা করে, কিন্তু প্রতিবার সেই সংশোধন রাষ্ট্রপতির দফতর থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফিরে আসে। ২০০৫ সালে সেই সংশোধন আসায় এ বার বিবাহিত মেয়েদের পিতৃপরিবারের কৃষিজমি তো বটেই, বাকি সম্পত্তিতে সমতার অধিকার লঙ্ঘন করার জন্য বিভিন্ন জাতি-পঞ্চায়েত সক্রিয় হয়ে উঠেছে: মেয়েরা যেন ভালবেসে গ্রামের কোনও চেনাজানা ছেলেকে বিয়ে না করে বসে, তা হলে সে জমি দাবি করলে সামলানো মুশকিল হবে। বিশেষত উন্নয়নের রঙিন ফানুসে জমি এখন সোনার চেয়েও দামি, তা যাতে হাতছাড়া না হয়, সে জন্য মেয়েদের যত দূরে প্রয়োজন বিয়েটা দেওয়া হবে। আমরা খাপ পঞ্চায়েতের নাম বেশি শুনি, কিন্তু ফতোয়াবাজিতে তারা একা নয়।

উত্তরের নারীবিরোধী সংস্কৃতি শিকড় ছড়াচ্ছে দক্ষিণেও। তাই তামিলনাড়ুতে এমন জেলার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে শিশুকন্যার অনুপাত কমছে, পণপ্রথা জাঁকিয়ে বসছে দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে। কেউ একে বলছেন ‘সমৃদ্ধি প্রভাব’— সমৃদ্ধি বাড়ার সঙ্গে কমছে মেয়েদের অধিকার, বাড়ছে বৈষম্য। এই বৈষম্যের অন্যতম মাপকাঠি হল, মেয়েরা বাপের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত কি একলা নিতে পারেন? টাপুরটুপুর বৃষ্টি পড়লে শিবঠাকুর তিন কন্যে পান, কিন্তু তাঁরা কেউই নিজেদের মতো বাপের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। ২০০৫-০৬ সালে তৃতীয় জাতীয় পারিবারিক স্বাস্থ্য-সমীক্ষা ২৩০০০০ মানুষকে পারিবারিক স্বাস্থ্যের নানা দিক নিয়ে সমীক্ষা করে, তার মধ্যে ১৫-৪৯ বয়ঃসীমার বিবাহিত মেয়ে আর ১৫-৫৪ বয়ঃসীমার পুরুষরা ছিলেন। সক্ষমতার সূচক বানানোর জন্য তারা বিভিন্ন প্রশ্ন করে। বাপের বাড়ি, আত্মীয়দের বাড়ি একলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত তার অন্যতম। দেখা যায়, বউ ৪০ পেরোলে তবে তার সেই অধিকার তৈরি হয়। ৬০ শতাংশ পুরুষ মনে করেন, এ বিষয়ে বউদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সমান অধিকার থাকা উচিত নয়। বিবাহিতাদের একলা বাড়ির বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বয়সের সঙ্গে বাড়ে, বাড়ে শিক্ষা আর সম্পদের সঙ্গেও। তবে কোনও অবস্থাতেই তা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর অর্ধেক ছাড়ায় না। অর্থাৎ, শিক্ষিত বা ধনী হলেও তাঁদের পরিবারের বিবাহিতা মহিলাদের মাত্র দুজনে এক জন, বয়স হলেও, একলা বাইরে, আত্মীয়বাড়ি বা বাপের বাড়ি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

দুর্গার পিত্রালয়ে আগমন একেবারেই বাঙালি হিন্দুর কল্পনা, সে জন্য ফি-বছর মা দুগ্গা ঘরে ফিরে আমাদের মোচ্ছব লাগানোর সুযোগ করে দেন। উত্তর-ভারতীয় গোঁড়া সংস্কৃতির মেঘ এখানেও ঘনালে মা দুগ্গার আর প্রতি বছর পুজোয় ঘরে ফেরা হবে না।



Something isn't right! Please refresh.

আরও পড়ুন

Advertisement