অনধিক ১৪০ অক্ষরের প্রতিক্রিয়া। সদ্য নির্মিত এক ওয়েব সিরিজ়ে ভারতের ভূতপূর্ব প্রধানমন্ত্রী রাজীব গাঁধীর সম্বন্ধে কিছু অপ্রীতিকর মন্তব্য আছে, পুলিশের নিকট এই অভিযোগ করিয়াছেন এক কংগ্রেস নেতা। রাহুল গাঁধী একটি টুইটে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাইয়াছেন, অনধিক ১৪০ অক্ষরে। বলিয়াছেন, বাক্‌স্বাধীনতাকে তিনি মানুষের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার বলিয়া বিশ্বাস করেন। তাঁহার পিতা দেশের জন্য যাহা করিয়াছেন, একটি ওয়েব সিরিজ়ের কোনও একটি চরিত্রের একটি মন্তব্যে তাহা মিথ্যা হইয়া যাইতে পারে না। সংশ্লিষ্ট কংগ্রেস নেতাও নিজের অভিযোগ প্রত্যাহার করিয়া লইয়াছেন। অভিযোগটি যে হালে পানি পাইল না, বিক্ষোভের ফুলকি জ্বলিতে না জ্বলিতেই রাহুল তাহাতে জল ঢালিয়া দিলেন, তাহাতে কি রাজীব গাঁধীর মহিমা ক্ষুণ্ণ হইল? সেই প্রশ্নই নাই। কাহারও অবদানের বিচারের ভার ন্যস্ত মহাকালের উপর। কাহারও মন্তব্যে, কটূক্তিতে সেই বিচারের রায় বদলায় না। নাটকের কোনও কল্পিত চরিত্রের কোনও উক্তিতে তো নহেই। তেমন মন্তব্যে কেহ বিচলিত হইয়া উঠিলে তাহাকে শান্ত করাই একমাত্র কর্তব্য। রাহুল নিজের কর্তব্যটি পালন করিয়াছেন। কংগ্রেসের নেতা হিসাবেও, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসাবেও।

রাজীব গাঁধী কেবল এক জন ব্যক্তি নহেন। তিনি ভারতের শাসনতন্ত্রের একটি বিশেষ সময়ের প্রতিভূ, একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শের প্রতীক। তাঁহার শাসনকালের সমর্থক যেমন আছেন, সমালোচকও আছেন। রাজীবের মূল্যায়নে এই দুই গোষ্ঠী স্বভাবতই দ্বিমত হইবেন। এবং, তাঁহাদের পারস্পরিক মত বিনিময়ের মাধ্যমেই গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া অগ্রসর হইবে। অতীত হইতে শিখিবার ইহাই পদ্ধতি। ভবিষ্যতের পথে চলিবার ইহাই মন্ত্র। বলা বাহুল্য, কথাটি শুধু রাজীব গাঁধীর ক্ষেত্রেই সত্য নহে, গণতন্ত্রের অন্তর্গত প্রতিটি বিষয়ের ক্ষেত্রেই সমান সত্য। দুর্ভাগ্য, রাজনীতি আর এই কথাটি স্মরণে রাখে না। যে কোনও কথায় ভাবাবেগে আঘাত লাগাইয়া অসহিষ্ণু হইয়া উঠাই এখন রাজনীতির ধর্ম হইয়াছে। রাহুল গাঁধী আরও এক বার নিজেকে ব্যতিক্রমী প্রমাণ করিলেন। কাজটি নেহাত সহজ ছিল না। যুগধর্মের বিপরীতে হাঁটিতে বিরল জোরের প্রয়োজন। তাহার উপর, যে ব্যক্তিকে উদ্দেশ করিয়া কটূক্তি, সেই নিহত পিতার প্রতি সুগভীর আবেগকেও পার্শ্বে সরাইয়া রাখিতে হইয়াছে। ব্যক্তিসত্তাকে অতিক্রম করিয়া নৈতিকতার প্রশ্নটিকে দেখিতে পাওয়া বড় সহজ কাজ নহে। রাহুল পারিয়াছেন।

রাহুল গাঁধী ভারতীয় গণতন্ত্রকে একটি বৃহত্তর সম্ভাবনার সম্মুখে দাঁড় করাইয়া দিলেন— অসহিষ্ণুতার, পাল্টা আক্রমণের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি ভারতে ক্রমে মূলধারায় পরিণত হইতেছে, তাহার বিরুদ্ধে লড়িবার অস্ত্র খুঁজিয়া পাওয়ার সম্ভাবনা। উগ্রতর অসহিষ্ণুতার মাধ্যমে নহে, মানহানির মামলা দায়ের করা অথবা দলবদ্ধ আক্রমণের হিংস্রতার মাধ্যমে নহে, নাগপুর-মার্কা অসহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে লড়িতে হইবে গণতন্ত্রের সহনশীলতার মন্ত্রে। নরেন্দ্র মোদী যতই ব্যক্তিগত আক্রমণের কদর্যতায় নামিয়া আসুন, কোনও জনসভায় তাঁহার বিরুদ্ধে মুর্দাবাদ ধ্বনি উঠিলে তাহাকে থামাইয়া দিতে হইবে। শ্রোতাদের অস্বস্তিকর প্রশ্নের সম্মুখীন হইতে হইবে হাসিমুখে। প্রয়োজনে দোষ স্বীকার করিতে হইবে, অজ্ঞানতা মানিয়া লইতে হইবে। এবং, বারে বারেই স্মরণ করাইয়া দিতে হইবে, দলীয় রাজনীতির অনেক ঊর্ধ্বে গণতন্ত্রের স্থান। সেই পরিসরটিকে কোনও মূল্যেই নষ্ট হইতে দেওয়া যায় না। গণতন্ত্র নামক উত্তরাধিকারটির গুরুত্ব নরেন্দ্র মোদীরা বুঝিবেন না। নাগপুরের পাঠশালায় তাহা শেখানো হয় নাই। রাহুল গাঁধী যে গণতন্ত্রের মাহাত্ম্য ভুলেন নাই, তাহা কম আশার কথা নহে।