এক বিস্মৃতপ্রায় ঘটনা। প্রবীণদের মুখে শোনা। অসমে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। বড় জলসা। ভরপুর শ্রোতা। তিনি বাংলা গান শুরু করতেই হইচই। দাবি, তাঁকে আগে অসমিয়া গান গাইতে হবে। হেমন্তবাবু প্রথমে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। বললেন, তিনি যেটুকু অসমিয়া গান জানেন, তা নিশ্চয় শোনাবেন। তবে পরে। জনতা নাছোড়। তাঁকে তখনই অসমিয়া গান গাইতে হবে। এ বার জেদি হেমন্তবাবুও। জানালেন, বাংলা গান গাইতে না দিলে তিনি অসমিয়া গান গাইবেন না, অনুষ্ঠানও করবেন না। এমন এক উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে মঞ্চে এলেন ভূপেন হাজরিকা।

হেমন্তবাবুর পাশে দাঁড়িয়ে তিনি বললেন, ‘‘হেমন্তদার গান শুনতে এসেছি আমরা। বাংলা বা অসমিয়া সেখানে বড় কথা নয়। ঠিক আছে, যদি হেমন্তদাকে অসমিয়া গান শোনাতে এ ভাবে জোর করা হয়, তা হলে আমিও আজ শুধু বাংলা গান করব। রাজি?’’ জনতা বেগতিক বুঝে শান্ত হল। বাংলা, অসমিয়া সব গানই শুনিয়ে এলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়।

আজকের বিজেপি-শাসিত অসমের প্রেক্ষিতে সে দিনের ঘটনাটি বড় প্রাসঙ্গিক। এই তো কয়েক দিন আগেই অসমে বাংলা গান শোনাতে গিয়ে বাধার মুখে পড়েছিলেন মুম্বইয়ের বাঙালি গায়ক শান। একই কায়দায় তাঁকেও চাপ দেওয়া হয়েছিল অসমিয়া গান শোনাতে। মঞ্চ ছেড়ে নেমে গিয়েছিলেন তিনিও। আসলে সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলেছে। আর সন্দেহ এবং আশঙ্কার মেঘও ক্রমশ ঘন হচ্ছে। অসম কি তবে শুধুই অসমিয়াদের? ভিনরাজ্যের বা ভিনভাষী কারও কি সেখানে রুজি-রোজগার করে, পরিবার পরিজন নিয়ে, নিজের ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বজায় রেখে শান্তিতে বাস করার অধিকার নেই? আরও স্পষ্ট করে বললে, অসম কি বাঙালিদের কাছে ক্রমশ ‘নিষিদ্ধ’ রাজ্য হয়ে যাচ্ছে?

তিনসুকিয়ায় বাঙালি-নিধনের পরে অনেকেরই মনে হচ্ছে, সেই দিন এল বলে! কারণ এ ক্ষেত্রে বিশেষ করে দেখার বিষয় হল, কেন আততায়ীরা ওই ভাবে পাঁচ বাঙালিকে বেছে আলাদা করে ডেকে নিয়ে গিয়ে গেরিলা কায়দায় খুন করল, তার সহজবোধ্য অন্য কোনও যুক্তি নেই। খুনোখুনির পিছনে অনেক সময় পারিবারিক বিবাদ থাকে, রাজনীতি থাকে, ব্যক্তিগত শত্রুতা থাকে, ব্যবসায়িক সমস্যা থাকে— এমন আরও কত কী। কিন্তু এ ক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত নিহতদের বাঙালি পরিচিতির বাইরে আর কোনও ইঙ্গিত মেলেনি। ফলে বাঙালিরা এটাই বিশ্বাস করছে।

অসমে ‘বঙ্গাল খেদাও’ এর আগেও হয়েছে। বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ১৯৬১’তে বরাক উপত্যকায় শহিদ হয়েছেন ১১ জন বঙ্গসন্তান। বস্তুত ভাষাগত ভাবে নামনি অসম অর্থাৎ কাছাড়-করিমগঞ্জের সঙ্গে উজানি অসমের মানসিক দূরত্ব আজও কাটেনি। ‘বাঙালি’ এবং ‘অসমিয়া’-র ভেদবিচার এখনও বহাল। অসমিয়াদের একটি বড় প্রভাবশালী অংশ বিশ্বাস করেন, বাঙালিদের জন্য তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য সুযোগসুবিধা থেকে বঞ্চিত। তবু যা হোক করে ক্ষতে প্রলেপের মতো একটা স্থিতাবস্থা জারি আছে। সেই ক্ষতকে আবার খুঁচিয়ে তোলার কোনও অভিসন্ধি মাথা চাড়া দিলে তা হবে চরম দুর্ভাগ্যের। আর সেই পরিস্থিতি শুধু একটি রাজ্যের নয়, গোটা দেশের পক্ষে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠতে পারে। সেই আশঙ্কার চারা কি মাথা তুলছে!

সম্প্রতি অসমে খসড়া নাগরিকপঞ্জিতে সেখানে বংশানুক্রমে বসবাস করা ধর্ম-সম্প্রদায় নির্বিশেষে বিপুল সংখ্যক বাঙালির নাম বাদ যাওয়া থেকেই বিপদের আঁচ পাওয়া যাচ্ছিল। বস্তুত আশির দশকে অসমের ছাত্র সংগঠন আসু-র ব্যানারে প্রফুল্ল মহন্ত, ভৃগু ফুকনদের আন্দোলনও ছিল বাঙালি বিতাড়নের। তখন প্রফুল্ল-ভৃগুদের সঙ্গে সেই আন্দোলন করতেন অসমের বর্তমান বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল। আন্দোলনের ‘কৃতিত্বে’ প্রফুল্ল-ভৃগুরা অসমে সরকার গড়েছিলেন। এখন আবার ওই রাজ্যে নাগরিকপঞ্জির ক্ষেত্রেও বিজেপির জোট শরিক হিসাবে প্রফুল্ল মহন্তদের অসম গণ পরিষদ চাপ সৃষ্টি করে চলেছে। আর তাতে কার্যত সায় দিচ্ছে কেন্দ্র এবং অসমের বিজেপি সরকার। যার বড় ভুক্তভোগী বঙ্গভাষীরা। 

অসম, বাংলা এবং দিল্লির বিজেপি বিষয়টি যতই লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করুক, যতই ও পার থেকে আসা ‘মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের’ এ দেশে থাকতে না দেওয়ার জিগির তুলে সাম্প্রদায়িক উস্কানির আগুন জ্বালানোর অপচেষ্টা হোক, নাগরিকপঞ্জির বিষয়টি যে মূলত অসম থেকে বঙ্গভাষীদের ‘বিতাড়ন’ করার কৌশল, তেমন বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ গোড়া থেকেই উঠছিল। এবং এ নিয়ে সবার আগে মুখ খুলেছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অসম আমাদের নিকট প্রতিবেশী। সেখানে বাঙালি-বিরোধী অশান্তির চাপ সরাসরি এই রাজ্যে এসে পড়বেই।

সেই সময় বাঙালি অধ্যুষিত শিলচরে গিয়ে তৃণমূলের প্রতিনিধি দলকে বিমানবন্দরেই হেনস্থার শিকার হতে হয়। তবে মমতার তাতে রাজনৈতিক ভাবে ‘অখুশি’ হওয়ার কারণ ছিল না। বরং বিজেপি-শাসিত অসমে যে বাঙালির উপর আক্রমণ শানানো হচ্ছে, সেই বিষয়টি সামনে রেখে তিনি আরও সক্রিয় হতে পেরেছেন। এ বার তিনসুকিয়ার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পরে মমতার পক্ষে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘বাঙালি বিদ্বেষী’ বলে জনমত গড়ে তোলাও সহজতর হল। যেটা তিনি করছেন।

এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। কারণ, ঘটনার উৎসস্থল অসম হলেও বিষয়টি এখন আর শুধু অসমের ভৌগোলিক সীমায় থেমে থাকবে না। সর্বত্র বিজেপির বাঙালি ভোট-ব্যাঙ্কে তা রীতিমতো ঘা দিতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে মাথা তোলার স্বপ্ন দেখা বঙ্গ-বিজেপির কাছে সেই অশনি সঙ্কেত ইতিমধ্যেই আসতে শুরু করেছে। বাংলার নেতারা কম্পমান।

এ কথা অবশ্যই সত্যি যে, বিজেপির কিছু বাড়বাড়ন্তের সঙ্গে সঙ্গে এই রাজ্যেও সাম্প্রদায়িক সুড়সুড়ির রাজনীতি শুরু হয়েছে। কোথাও কোথাও সেই বিষবৃক্ষে ফল ধরছে না, তেমন কথাও জোর দিয়ে বলা যায় না। তবু দেশের অন্য অনেক রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গ নিজের ঐতিহ্য অনুযায়ী এখনও অনেক বেশি উদার ও সহনশীল। অসমের বাঙালিরা মৃত্যুভয়ে কাঁপেন, গুজরাত থেকে বিহারিরা পালিয়ে বাঁচার পথ খোঁজেন, ভিনরাজ্যে কাজ করতে যাওয়া বঙ্গসন্তানদের প্রাণহীন দেহ ফিরে আসে। কিন্তু এই রাজ্যের দরজা আজও সবার জন্য খোলা। এখানেই অনেকখানি এগিয়ে রয়েছেন মমতা।

ফলে বিড়ম্বিত রাজ্য বিজেপি। কয়েক দিন আগেই দলীয় ‘বিদ্বজ্জন’দের কয়েক জন বিপদ-ঘণ্টা বাজিয়ে বলেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে জমি পেতে হলে বিজেপিকে আগে ‘বাঙালির পার্টি’ হয়ে উঠতে হবে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে এর অব্যবহিত পরেই ঘটে গেল তিনসুকিয়ায় বাঙালি-নিধন। এ বার দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকেই লিখেছেন, বাঙালির উপর এই ‘ঘৃণ্য’ আক্রমণের উপযুক্ত তদন্ত হওয়া জরুরি। অর্থ স্পষ্ট। আক্রমণের লক্ষ্য যে বাঙালি-ই, সেটা মানতেই হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে প্রথমে নাগরিকপঞ্জি থেকে বাঙালিদের নাম ছেঁটে দেওয়ার চেষ্টা, তার পরে তিনসুকিয়ার ঘটনা— দু’টিই এখন মমতার হাতে তুরুপের তাস। এমনিতেই সিবিআইয়ের অন্তর্দ্বন্দ্ব সামনে আসার পরে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা যে ভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েছে, তাতে সারদা-নারদের মতো তদন্তকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার প্রয়াস বলে অভিযোগ তোলার সুযোগ তৃণমূলের বেড়েছে। সেই সঙ্গে এ বার বাঙালি জাতিসত্তার বিপন্নতাকে পুঁজি করে বিজেপির দিকে বিদ্বেষের আঙুল উঠলে তার মোকাবিলা আরও কঠিন হবে। মমতা হয়তো সেটাই করতে চাইছেন।

রাজনীতিতে দেখা গিয়েছে, আবেগ থেকে সঠিক হাওয়া ওঠাতে পারলে অনেক সময় তাতে ঝড় হয়!