Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৭ অক্টোবর ২০২১ ই-পেপার

প্রবন্ধ ১

সত্যি যেমন হয়

সুরবেক বিশ্বাস
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৬ ০০:০০

হ্যাঁ তাঁরাও পারেন। কাহিনিতে, ছবিতে এ বার দেখা যাচ্ছে, তাঁরাও বুদ্ধি খাটিয়ে জটিল অপরাধের কিনারা করতে পারেন। বাস্তবে কিন্তু তাঁরাই পারেন, পেরে এসেছেন। তাঁরা, মানে সরকারি গোয়েন্দারা, মানে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসাররা। বাংলা কাহিনি ও কাহিনিচিত্রেও তাঁদের দেখা যাচ্ছে। বহু যুগের অবহেলা ও বঞ্চনার পর।

‘তাঁরা’ বলাটা হয়তো একটু ভুল হল। এখন আপাতত তিনি। পর পর দু’বছর সেলুলয়েডের পর্দায় দেখা দিয়ে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের মধ্যে ভাল লাগা সঞ্চারিত করেছেন শবর দাশগুপ্ত। লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার। প্রথমে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের কাহিনি ‘ঋণ’ অনুসরণে পরিচালক অরিন্দম শীল তৈরি করেন ‘এ বার শবর’। তার পর শবরকে নিয়ে অরিন্দমের সাম্প্রতিক ছবি ‘ঈগলের চোখ’। উপন্যাসের নামেই।

কলকাতা পুলিশের এক পোড় খাওয়া গোয়েন্দা অফিসার বলছিলেন, ‘‘শবর নিয়ে ছবি হওয়ার ফলে পুলিশ যে রহস্যের সমাধান করতে পারে, সেটা জনপ্রিয় মাধ্যমে স্বীকৃতি পেয়েছে, প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এবং অপরাধের কিনারায় পুলিশের দক্ষতাকে মানুষ গ্রহণ করছেন। এখানেই আমাদের ভাল লাগা।’’ শবর শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সৃষ্টি ঠিকই। তবে রুপোলি পর্দায় আসার আগেই ব্যোমকেশ ও ফেলুদারা যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, শবর ততটা হননি। সে দিক দিয়ে মানতেই হবে, ছবির জয়।

Advertisement

বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির প্রাচীন যুগের জনপ্রিয় লেখক পাঁচকড়ি দে-র কোনও কোনও উপন্যাসে গঙ্গারাম বসু নামে এক পুলিশ ইনস্পেক্টরের অস্তিত্ব পাওয়া যায় ঠিকই, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তদন্তকারীর চরিত্র হিসেবে নয়। সাধারণ ভাবে, বাংলা রহস্য কাহিনি বা তার অবলম্বনে তৈরি ছবিতে শখের গোয়েন্দাকে বড় করে দেখাতে গিয়ে পুলিশের চরিত্রটিকে খাটো করেই দেখানো হয়েছে। পুলিশ অযোগ্য না হলে যেন বেসরকারি গোয়েন্দাদের মাহাত্ম্য দাঁড়ায় না! যেমন, হেমেন্দ্রকুমার রায়ের সৃষ্টি ইয়া ভুঁড়িদার ইনস্পেক্টর সুন্দরবাবু। প্রাতরাশে এক সঙ্গে সাতটা ডিমের পোচ গলাধঃকরণ করেন। এই দারোগার সঙ্গে গোয়েন্দা জয়ন্ত ও তাঁর সহকারী-বন্ধু মানিকের সদ্ভাব ছিল, রহস্য সমাধানে বার বার মানিকজোড়ের দ্বারস্থ হতেন তিনি। বুদ্ধির দিক থেকে পেটুক সুন্দরবাবুর চেয়ে বহু যোজন এগিয়ে জয়ন্ত-মানিক।

সত্যজিৎ রায় ফেলুদার কাহিনিতে কোনও পুলিশ অফিসারকে সরাসরি এতটা খেলো করে দেখাননি। তবে পুলিশকে খাটো করেছেন তিনিও। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ ফেলুদা বেনারসে ঘোষালদের গণেশমূর্তি চুরির তদন্তে সাহায্য পান তাঁর পুরনো পরিচিত ইনস্পেক্টর তিওয়ারির কাছ থেকে, কিন্তু সে সব কেবল লজিস্টিক সাপোর্ট। শশীবাবু খুন হওয়ার পর সেই তিওয়ারিই মনে করেন, নেহাতই পারিবারিক বিবাদ, ছেলেকে বাবা খুন করেছে। ফেলুদার অন্য মত। শেষে অবধারিত ভাবে দেখা যায়, প্রদোষচন্দ্র মিত্রই ঠিক। সম্প্রতি একটি ছবি দেখে লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগের এক দারোগাকে তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়ে প্রশ্ন করেছিল, ‘বাবা, ব্যোমকেশ বক্সী যেমন মিস্ট্রি সল্ভ করে, তোমরা তো পারো না। তখন তোমরা কী করো?’ অফিসারটি হেসে ফেলেন, সেই হাসির মধ্যে একটু বেদনাও মেশানো ছিল।

আর, বাংলা গোয়েন্দা গল্প-উপন্যাসে পুলিশ মানেই যেন ইউনিফর্ম পরা থানার পুলিশ। গোয়েন্দা বিভাগের সাদা পোশাক বা সাদামাঠা সাজসজ্জার অফিসারদের অস্তিত্বই সেখানে নেই। অথচ কলকাতা পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ তৈরি হয় ১৮৬৮-তে, শহরের অপরাধকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে ও অপরাধের কিনারা করতে। অথচ গোয়েন্দা বিভাগের অফিসারদের উপস্থিতি হেমেন্দ্রকুমার থেকে সত্যজিৎ, কারও লেখায় সে ভাবে উঠে আসে না। সম্ভবত, তাঁদের কেন্দ্রীয় চরিত্র, শখের বা পেশাদার বেসরকারি গোয়েন্দাদের সামনে যাতে কোনও চ্যালেঞ্জ না খাড়া হয়, সেটা সুনিশ্চিত করতে। হেমেন রায় ইনস্পেক্টর সতীশকে এনেছেন বটে, তবে তিনি জয়ন্ত-মানিকের মতো জনপ্রিয় হননি।

একটা কথা খেয়াল করা দরকার। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনি বহুলাংশে বিদেশি সাহিত্য থেকে প্রভাবিত। এই ব্যাপারে অবশ্যই সব চেয়ে বেশি অনুসৃত হন আর্থার কনান ডয়েল। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ-অজিত, হেমেন রায়ের জয়ন্ত-মানিক, নীহার গুপ্তের কিরীটী-সুব্রত, সর্বত্রই হোমস-ওয়াটসনের কমবেশি ছায়া পড়েছে। পাঁচকড়ি দে’রও ছিল অরিন্দম বসু ও দেবেন্দ্রবিজয় মিত্র। বাংলা গোয়েন্দা কাহিনির লেখকদের উপর প্রভাব ফেলেছেন আগাথা ক্রিস্টিও। এরকুল পোয়রো-র মতো ধারালো বুদ্ধিতে নিজেদের গোয়েন্দাদেরও সজ্জিত করতে চেয়েছেন বাঙালি লেখকেরা। তাঁদের বহু গল্পে শখের গোয়েন্দা বা সত্যান্বেষীর কাছে শুধু অপরাধীরই হার হয় না, পুলিশেরও পরাজয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। পুলিশ কেমন যেন বোকা বনে যায় বেসরকারি গোয়েন্দার বুদ্ধির সামনে।

সে দিক থেকে বেলজিয়ান লেখক জর্জ সিমিয়োন-এর বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র জুলস ম্যেগ্রে অন্য রকম। ফরাসি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার। সিমিয়োনের দীর্ঘ দিনের বন্ধু ছিলেন ফরাসি চিফ ইনস্পেক্টর মার্সেল গিয়াম। বিংশ শতাব্দীতে ফ্রান্সের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গোয়েন্দা। বলা হয়, ম্যেগ্রের গল্পগুলো লেখার সময়ে সিমিয়োনের উপর প্রভাব পড়েছিল গিয়াম ও তদন্তে গিয়ামের পর পর সাফল্যের। ম্যেগ্রেকে নিয়ে প্রচুর ছবি, টিভি সিরিয়াল ও বিবিসি রেডিয়োয় নাটক পর্যন্ত হয়েছে। সিমিয়োনের ম্যেগ্রে বিশ্বসাহিত্যে সম্ভবত সব চেয়ে জনপ্রিয় সরকারি গোয়েন্দা। বড় ও ছোট পর্দারও।

শবরের স্রষ্টা শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘ইনস্পেক্টর ম্যেগ্রে আমার খুব প্রিয় চরিত্র। কিন্তু সে অ্যাকশন করে না। পুরোটাই বুদ্ধি, বিশেষ করে মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করে। যেমন, খুনির বাড়ির সামনে সে দিনের পর দিন দাঁড়িয়ে থাকে। বাড়ির জানালা থেকে খুনি তাকে নজর করে। শেষমেশ মনস্তাত্ত্বিক চাপে ভেঙে পড়ে ম্যেগ্রের কাছে ধরা দেয়। ম্যেগ্রের মধ্যে একটু দার্শনিক ব্যাপারও আছে।’’ শীর্ষেন্দুর কথায়, ‘‘এরকুল পোয়রোর ক্ষুরধার বুদ্ধি আমি শবরকে কিছুটা দিয়েছি। বাকি সবটাই নিজের মতো গড়েছি। শবরের মধ্যে প্রচুর অ্যাকশন।’’

খুনির পিছু অনেক দূর ধাওয়া করে তাকে ধরার পর শবর হাঁপাতে থাকে। বাস্তবে সেটাই স্বাভাবিক। গোয়েন্দা বিভাগের এসি শবর কখনও ট্রাউজার্সে জামা গুঁজে পরেন না। লালবাজারের ইতিহাসে সাম্প্রতিক অতীতে দুঁদে গোয়েন্দা বলে যাঁরা পরিচিত, তাঁরাও জামা সব সময়ে ঝুলিয়ে পরতেন। এতে কোমরে গোঁজা বন্দুক দেখা যায় না। সরকারি গোয়েন্দারা কেতায় ও কথায় বিশ্বাস করেন কম, কাজ করে দেখানোয় মগ্ন থাকেন। কারণ, ওটা শুধু তাঁর রুজি রোজগার নয়, ঠিকঠাক কাজ করতে না পারলে উপরওয়ালার ভর্ৎসনাও তাঁকে শুনতে হবে।

যে দুশ্চিন্তাটা ব্যোমকেশ-ফেলুদার নেই।



Tags:

আরও পড়ুন

Advertisement