সেই সন্ধ্যাবেলাটার কথা আজও ভুলতে পারি না। ত্রিপুরা রাজভবনের সবুজ মাঠে দশ বছরের সিপিএম শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথ গ্রহণ করলেন কংগ্রেসের তৎকালীন রাজ্য সভাপতি সুধীররঞ্জন মজুমদার। যাঁরা মন্ত্রী হলেন, তাঁরা অনেকেই হেঁটে-হেঁটে একটু উঁচু পাহাড়ের উপর অবস্থিত রাজভবনে এসেছিলেন। নিজের গাড়ি ছিল না অনেকেরই। শপথ নিয়ে মন্ত্রী হয়ে লালবাতি লাগানো গাড়ি পেলেন কংগ্রেস ও টিইউজেএস নেতারা। অনেকের পায়েই হাওয়াই চটি। সুরজিৎ দত্তকে ওখানে সবাই ডাকত হাতকাটা সুনু-বলে। তিনি আমায় জিজ্ঞাসা করেই ফেললেন, শপথ কী ভাবে নিতে হয় বলুন তো। তার আগে, ১৯৭৮ থেকে ’৮৮, ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নৃপেন চক্রবর্তী। কংগ্রেসের বাঙালি ভদ্রলোক নেতৃত্বকে সরাতে সিপিএম পঞ্চাশের দশকে কলকাতা থেকে বাঙালি নেতা নৃপেনবাবুকে পাঠিয়েছিল। ১৯৮৮ থেকে ’৯৩ মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা সুধীর মজুমদার। তার পর এক বছরের জন্য সেই পদে বসলেন ডাকাবুকো নেতা সমীর বর্মণ। সেই পাঁচ বছর এক ভয়ানক টালমাটাল পরিস্থিতির মধ্যে কাটল। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে এক বছরের জন্য রাষ্ট্রপতি শাসনও জারি হল। তার পর নৃপেনবাবুর উপ-মুখ্যমন্ত্রী উপজাতি নেতা দশরথ দেব এক বছরের জন্য মুখ্যমন্ত্রী হন। তার পর আসেন মানিক সরকার।

নৃপেনবাবুকে ক্ষমতাচ্যুত করার কাজটাও কিন্তু এক দিনে হয়নি। রাজীব গাঁধী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর উত্তরপূর্বাঞ্চল নিয়ে সক্রিয় হলেন। সন্তোষমোহন দেব ছিলেন কাছাড়ের নেতা। তাঁকে ত্রিপুরার দায়িত্ব দিলে তিনি সাফল্য দেখালেন। ঠিক আজ নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহের প্রতিনিধি হিসাবে আরএসএস–বিজেপি নেতা সুনীল দেওধর যে ভাবে দিল্লিকে সাফল্য উপহার দিচ্ছেন, সে রকমই।

রাজভবনের উলটো দিকেই সার্কিট হাউস। তৎকালীন টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী সন্তোষমোহন থাকতেন সেখানে। ভোটের আগে ’৮৫ সাল থেকে একটানা তিন বছর তিনি ত্রিপুরার দুটি জেলার ৬০টি আসন চষে বেরিয়েছিলেন। কাছাড়ের বাঙালি নেতা কিন্তু ত্রিপুরাকে ছোট রাজ্য বলে কোনও দিন অবজ্ঞা অবহেলা করেননি। সার্কিট হাউসে ওঁর ঘরে ঢুকে দেখেছিলাম রাজ্যের একটি মানচিত্র সামনে পেতে তিনি চুরুট খাচ্ছেন। এক সেনা অফিসার ও দুই গোয়েন্দা অফিসার তাঁকে রাজ্যের পরিস্থিতি বোঝাচ্ছেন। তখন রাজ্যে ভয়াবহ টিএনভি হত্যাকাণ্ড। বিজয় রাংখল দুর্ধর্ষ জঙ্গি নেতা। একের পর এক বাঙালি নিধন চলছে। সন্তোষবাবু সিপিএম-টিএনভি আঁতাতের অভিযোগ তুলে বাঙালি ভোটকে সুসংহত করলেন। আবার টিইউজেএস সংগঠনের সঙ্গে জোট বেঁধে বললেন, উপজাতিদের স্বায়ত্তশাসন দেব।

ভোটের দিন সকালবেলার এক ভয়াবহ দৃশ্য হঠাৎ এত বছর পর মনে পড়ছে। আগরতলার ভোটগ্রহণ কেন্দ্র। মাঝ রাতে ১১ জন ব্যক্তিকে খুন করেছে বিজয় রাংখল। তাদের অস্থিভস্ম ১১টি কলসিতে পর পর সাজানো। সেনাবাহিনী ভোটগ্রহণ কেন্দ্রকে ঘিরে রেখেছে, আর নিথর এক লম্বা লাইনে কাতারে কাতারে মানুষ ভোট দিচ্ছেন। সে ভোটও ছিল ‘চলো পালটাই’-এর ভোট। তার পর ভোটে জেতার এক মাস পরেই নাটকীয় ভাবে বিজয় রাংখলের দিল্লি আগমন, রাজীব গাঁধীর সঙ্গে শান্তিচুক্তি। সন্তোষবাবু তত দিনে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ঘুরে আজকের কিরেণ রিজিজুর মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের উপমন্ত্রী। গণ-আন্দোলন নয়, সে দিনও কিন্তু সাফল্য এনেছিল কংগ্রেসের কৌশল।

এ বার বিজেপি বাঙালি-উপজাতি হিংসার তাসটা খেলেনি। সময় বদলে গিয়েছে। সংঘ পরিবারের রাজনীতিটাও আলাদা। সেই বিজয় রাংখল আজ বৃদ্ধ। নখদন্তহীন প্রাক্তন বিধায়ক। এ বার ভোটের সময়ে তিনিও যোগ দিতে চান বিজেপিতে। আরএসএস তাঁকে চায়নি। যুক্তি ছিল, আজও এ রাজ্যের প্রবীণ মানুষ তাঁকে হিংসার স্মৃতির সঙ্গে যুক্ত করে দেখেন। সেই অনুষঙ্গ যখন আজও আছে, বিজেপি তাঁকে নেবে না। ত্রিপুরা রাজ্যটা ছোট হতে পারে, কিন্তু তার রাজনীতি বেশ জটিল। বাঙালি বনাম উপজাতি প্রকাশ্য হিংসা না থাকলেও একটা অদৃশ্য সংঘাত আছেই। দশরথ দেবের গণমুক্তি পরিষদ নামে এক উপজাতি সংগঠন ছিল। দশরথবাবুর মৃত্যুর পর সেই মাপের কোনও উপজাতি নেতা সিপিএম খুঁজে পায়নি। তাই প্রথমেই আরএসএস শুরু করে উপজাতি মানুষের মধ্যে কাজ করতে। তার পর হিন্দুত্ব-প্রচারের মাধ্যমে আকর্ষণ করতে থাকে বাঙালিকে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতারা গায়ের জোরে হিন্দু জাতীয়তাবাদ, রামমন্দির থেকে হনুমান জয়ন্তী, নিরামিষ খাদ্যাভাস, এ-সব কর্মসূচি প্রচার করছেন। কিন্তু ত্রিপুরায় তারা তা করেনি। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির উপর তারা কাজ করতে চেয়েছে।

সে দিন ভোটের ফল দেখেই কমিউনিস্ট নেতারা বলতে শুরু করলেন, ত্রিপুরার বিজেপি জিতেছে জলের মতো টাকা খরচ করে, মানুষকে বিভ্রান্ত করে ইত্যাদি। প্রতিপক্ষকে ছোট করে দেখাটা কিন্তু ভুল রাজনীতি। বিজেপির নেতারা যে সময় বা পরিশ্রম বা কৌশল অবলম্বন করে এ বার জিতলেন, তাকে ছোট করে না দেখে ভাবা দরকার, ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি ত্রিপুরাকে দখলে রাখতে ব্যর্থ হল কেন?

ত্রিপুরার ইতিহাস পড়লে দেখা যায়, রাজায় রাজায় কম যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু ত্রিপুরার মানুষ সত্তার স্বকীয়তা বজায় রেখেছিল সব সময়। সেই পরিসরটাকে প্রথমে বোঝা প্রয়োজন। সেই পরিসর বুঝতে আজ এত বছর পরও ভুল হল কেন?। এই পরাজয়ের পরও আমি বলব, মানিকবাবু রাজ্যের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও সৎ নেতা। বিজেপি মানিকবাবুর বিরুদ্ধে চিট ফান্ডের অভিযোগ তুলে তাঁকে ‘চোর’ প্রতিপন্ন করার কৌশল নেয় প্রথমে। পরে তারা বুঝতে পারে, সেটা হিতে বিপরীত হচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে কৌশল বদলে বিজেপি মানিক-বিরোধী প্রচার ছেড়ে সিপিএম-বিরোধী প্রচার শুরু করে।

সিপিএম-এর দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল। সে তো প্রকৃতির সূত্র। কিন্তু আজ এই অসন্তোষকে মূলধন করে তৃণমূলের ক্ষমতায় আসার কথা। সেটা হল না। বিজেপি পারল। কী ভাবে, কেন এটা সম্ভব হল? সেই আত্মসমীক্ষা কি করবেন বিজেপি-বিরোধীরা?

কমিউনিস্টদের বুথ কমিটির পালটা কমিটি গড়ে তোলা, উপজাতি সংগঠন আইপিএফটিকে শরিক করে তাদের সঙ্গে গোপন বোঝাপড়া করে ঐক্যবদ্ধ ত্রিপুরার অধীনে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার কথা চূড়ান্ত করা— এ সবই বিজেপির এ বারের কৌশল।

এ বারের নির্বাচনের পর বাঙালি বনাম উপজাতি সংঘাত কতটা ঘুচবে জানি না। কিন্তু বিজয় রাংখল আর টিইউজেএস-এর হাত ধরে সে দিন সন্তোষমোহন দেব যা করেছেন, আজ বিজেপিও সেই স্বল্পমেয়াদি ভোটকেন্দ্রিক কৌশলই নিয়েছে। আমার প্রশ্ন একটাই। শুধু গাল না দিয়ে বিজেপি যে তাদের কৌশল দিয়ে তিল-তিল করে মানুষের মন জয় করেছে, সেটা কি কমিউনিস্ট নেতারা বুঝতে পারতেন না? জাতীয় রাজনীতিতে ত্রিপুরার ভোট ফল প্রভাব ফেলুক না ফেলুক, ত্রিপুরায় বিজেপি সিংহাসন দখল করল কী করে, এ প্রশ্নের জবাব  কিন্তু বিরোধীদের দিতেই হবে।