ডালে কী ফোড়ন দিতে হয়, ডিম সিদ্ধ হইতে কত সময় লাগে, ভাত রাঁধিবার সময় চাল-জলের অনুপাত কী হইবে, পাঠ দিবে স্কুল— সিবিএসই বোর্ডের সিদ্ধান্ত। সিবিএসই স্কুলগুলিতে নির্দেশিকা আসিয়াছে, নাচ, গান, অঙ্কনশিল্পের পাশাপাশি সপ্তাহে দুইটি ক্লাস বরাদ্দ করিতে হইবে রন্ধনশিল্পের জন্য। সিদ্ধান্তের পিছনে যুক্তি, পড়ুয়াদের স্বাবলম্বী করিয়া তুলিতে হইবে। ভবিষ্যতে ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষা বা চাকুরিসূত্রে অন্যত্র গমন করিলে যাহাতে সমস্যার সম্মুখীন না হইতে হয়, তাহার জন্যই এই উদ্যোগ। ষষ্ঠ হইতে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত তিন বৎসর বরাদ্দ হইয়াছে রন্ধনশিল্পে প্রশিক্ষণের জন্য। শুধুমাত্র হাতেকলমে পুষ্টিকর রান্না করাই নহে, সঙ্গে তাহারা জানিবে খাদ্য সংক্রান্ত নানা তথ্য।

পরিকল্পনাটিকে অনেকেই স্বাগত জানাইয়াছেন। অস্বাভাবিক নহে। স্বাবলম্বী হইবার শিক্ষা ছেলেমেয়ে উভয়ের পক্ষেই প্রয়োজনীয়, তাহার জন্য রন্ধনের খুঁটিনাটি জানাও প্রয়োজন বইকি! কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন উঠিবেই। জীবনযাপনের জন্য যাহা যাহা ‘প্রয়োজন’, বিদ্যালয়ে যদি সেই সকল কিছু শেখানোর ব্যবস্থা হয়, তাহা হইলে বিদ্যাচর্চা হইবে কখন? বিদ্যাচর্চার প্রয়োজন প্রধানত মস্তিষ্কচালনার কারণে। ব্যবহারিক জীবনে কোনটি প্রয়োজনীয়, তাহা ভাবিতে বসিলে বস্তুত বেশির ভাগ বিদ্যাকেই বিদ্যালয় অঙ্গন হইতে বিদায় জানাইতে হয়। ভাবিয়া দেখিতে গেলে, রসায়নই হউক, আর ইতিহাসই হউক, বিদ্যালয়ে চর্চিত বিষয়গুলির অতি অল্প অংশই পরবর্তী জীবনে ‘ব্যবহারিকতা’র কাজে লাগে। ভাষা এবং প্রাথমিক স্তরের কিছু গাণিতিক হিসাব ছাড়া অন্য বিষয়গুলি না পড়িলেও জীবনচর্যা অসম্ভব হইয়া পড়ে না। এতদ্সত্ত্বেও ভারতের প্রধান কয়লাখনি অঞ্চলগুলির অবস্থান অথবা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ যে বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে স্থান পায়, তাহার কারণ, ইহাই জ্ঞান; যে জ্ঞান ব্যবহারিক প্রয়োজনের ঊর্ধ্বে, যে জ্ঞান মানুষকে সমৃদ্ধতর করে। এই যুক্তিটি না মানিলে এখন অবধি স্কুল চত্বরে যাহা শিখানো হয়, তাহার নব্বই শতাংশকে ‘জীবনমুখী’ নয় বলিয়া কুলার বাতাস দিতে হয়। আক্ষরিক অর্থে যাহা মগজচর্চা, বুনিয়াদি শিক্ষার তাহাই প্রধান ও প্রাথমিক শর্ত। 

এখন প্রশ্ন, তবে ব্যবহারিক শিক্ষার কী গতি হইবে? ব্যবহারিক শিক্ষার জন্য পৃথক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইতিমধ্যেই রহিয়াছে। এত দিন যাবৎ বুনিয়াদি শিক্ষাতেই গৃহবিজ্ঞান নামক একটি বিষয়ে রন্ধনশিল্প, কারুশিল্প-সহ গৃহকর্ম-সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক লইয়া আলোচনা করা হইয়া আসিতেছে। এমন একটি আস্ত বিষয় থাকা সত্ত্বেও পৃথক ভাবে রন্ধনশিল্পকে মূল পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করিবার মধ্যে যুক্তিগ্রাহ্য কারণ খুঁজিয়া পাওয়া কঠিন। যদি ধরিয়া লওয়া যায়, বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যেই বাধ্যতামূলক ভাবে সেই ক্লাস করিতে হইবে, তবে পাঠ্যক্রমের নিয়মিত বিষয়গুলি বাদ দিয়া সেই শিক্ষার স্থান করিতে হইবে। আর যদি এই শিক্ষার ব্যবস্থা বিদ্যালয়ের নির্ধারিত সময়ের বাহিরে অতিরিক্ত সময়ে হয়, তবে তাহাকে পাঠ্যক্রমের অংশ বলিবার কোনও কারণ থাকিবে না। বিষয়টি গুরুতর। এমনিতেই দেশে মগজচর্চার অভাব প্রকট। শিক্ষার মান তলানিতে ঠেকিয়াছে। ইহার উপর জীবনশৈলী পাঠের নামে জ্ঞানচর্চার সর্বনাশ ঘটাইলে আর দেখিতে হইবে না! পদার্থবিদ্যা ও সাহিত্যের স্থান লইবে যথাক্রমে রন্ধন ও নৃত্য।