রহস্য উপন্যাসের পাঠকমাত্রেই জানিবেন, প্রশ্ন এক নহে, একাধিক। ‘কে’ তো বটেই, ‘কী ভাবে’ এবং ‘কেন’— এই দুইটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দার্জিলিং এবং কালিম্পং-এর জোড়া বিস্ফোরণের পর, স্বভাবতই, ‘কে’ প্রশ্নটিই সর্বাধিক আলোচিত হইতেছে। মোর্চা কেন্দ্রীয় তদন্ত দাবি করিয়া রাজ্য সরকারের উপর নিজেদের অনাস্থা (এবং সংশয়?) প্রকাশ করিয়াছে। জিএনএলএফ-এর ইঙ্গিত, বিস্ফোরণের পিছনে বহিরাগতদের ভূমিকা আছে। রাজ্য সরকার বিমল গুরুঙ্গের বিরুদ্ধে ইউএপিএ ধারায় মামলা ঠুকিয়াছে। মাওবাদী যোগের তত্ত্বও আসিয়াছে। সকলেই আড়চোখে সকলকে দেখে। ‘কে’ বিস্ফোরণ ঘটাইল, তাহার ইঙ্গিত যে ‘কী ভাবে’ বিস্ফোরণ হইল, এই প্রশ্নের মধ্যে খানিক হইলেও নিহিত থাকিতে পারে, তাহা স্পষ্ট। অভিজ্ঞ জনেরা বলিতেছেন, বিশেষত কালিম্পং-এর বিস্ফোরণে দক্ষ, প্রশিক্ষিত হাতের ছাপ আছে। কিন্তু, এই দুইটি প্রশ্ন অপেক্ষা এই মুহূর্তে গুরুতর প্রশ্নটি হইল, ‘কেন’? বিস্ফোরণ দার্জিলিং-এর আন্দোলনের পরিচিত অস্ত্র নহে। এবং, যখন বিস্ফোরণ দুইটি ঘটিল, পাহাড়ের সাম্প্রতিক আন্দোলন তখন একটি বিশেষ মো়ড়ে উপস্থিত ছিল— আন্দোলনের নেতারা রাজ্য সরকারের সহিত বৈঠকে বসিতে সম্মত হইয়াছিলেন।

প্রশ্ন উঠিতেই পারে, আলোচনার প্রকৃষ্ট সময় হইয়াছে কি? অনস্বীকার্য, অসময়ে আলোচনায় হিতে বিপরীত হইতে পারে। দার্জিলিং-এর সমস্যা বিষয়ে আলোচনারও যথার্থ সময় হইয়াছে কি না, কেহ তাহাতে সংশয় প্রকাশ করিতেই পারেন। কিন্তু, সেই সময়টি সচরাচর স্বয়মাগত হয় না। তাহাকে আনিতে হয়। পথ অনুকূল হইলে সুপবন আসে। সেই যাত্রাপথ গণতান্ত্রিক হওয়া আবশ্যিক। পাহাড়ের বিস্ফোরণ সেই পথের অনুবর্তী নহে। ‘কেন’ বিস্ফোরণ ঘটিল, এই কারণেও তাহার উত্তর আবশ্যক। পাহা়ড়ের অচলাবস্থা কাটাইতে আলোচনাই পথ। সমাধানসূত্র বাহির করিবার আলোচনায় উপনীত হইবার পূর্বেও আলোচনা থাকে। গণতন্ত্রের প্রক্রিয়া নিরন্তর আলোচনা দাবি করে। বিস্ফোরণের পিছনে যাহারই হাত থাকুক, সে এই আলোচনাকেই ভয় পায়। পরস্পরের প্রতি অঙ্গুলিনির্দেশের পরিবর্তে বিবদমান পক্ষগুলি প্রমাণ করুন যে তাঁহারা সত্যই শান্তি চাহেন। দায়িত্ব যতখানি প্রশাসনের, বিমল গুরুঙ্গের দায়িত্ব তাহার তিলমাত্র কম নহে। বস্তুত বেশিই, কারণ এই অচলাবস্থার পিছনে তাঁহাদের অবদান অধিকতর। বিস্ফোরণ যে তাঁহাদের অস্ত্র নহে, প্রমাণ করিতে আলোচনার প্রক্রিয়াটি অগ্রসর করাও তাঁহাদেরই কর্তব্য। কোনও অজুহাতে পিছাইয়া যাওয়া নহে, গণতন্ত্রের পথে হাঁটিতে হইবে।

পাহাড়ের আন্দোলনকারী রাজনৈতিক গোষ্ঠী এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকার, এই দুই পক্ষের বাহিরেও শান্তি আলোচনায় তৃতীয় পক্ষের, অর্থাৎ কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা অত্যাবশ্যক। এই বিসংবাদে রাজনৈতিক দল হিসাবে বিজেপি, এবং সর্বভারতীয় প্রশাসক হিসাবে কেন্দ্রীয় সরকার কী ভূমিকা লইবে, তাহা এখনও অবধি অস্পষ্ট। যখন সমস্যার সূত্রপাত হইতেছিল, দলের তৎকালীন অবস্থান হইতে বিজেপি দৃশ্যত অনেকখানি সরিয়া আসিয়াছে। রাজ্যে গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠা লক্ষ্য হইলে যে পাহাড়ে বাংলাবিরোধী অবস্থানের পক্ষে দাঁড়ানো যায় না, অমিত শাহরা খানিক দেরিতে হইলেও বুঝিয়াছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার এখনও যথেষ্ট স্পষ্ট অবস্থান লইতে পারে নাই। দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কেন্দ্র নাক গলাইবে না, ইহাই যদি অবস্থান হয়, তবে তাহাও স্পষ্ট করিয়া দেওয়া প্রয়োজন। এবং, রাজ্য সরকারকে প্রশাসনিক সাহায্য করাও বিধেয়। আলোচনার মাধ্যমে শান্তিতে পৌঁছাইতে হইলে কেন্দ্রকে রাজ্যের পার্শ্বেই দাঁড়াইতে হইবে। দলীয় রাজনীতির অঙ্ক নহে, প্রশ্ন প্রশাসনিকতার।