• বিশ্বজিৎ ধর
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

চিকিৎসা ব্যবস্থায় উন্নতির কাজে নেতৃত্ব দিতে হবে সরকারকে

স্বাস্থ্যে অবহেলার মাসুল

Coronavirus

কোভিড-১৯ নামক ব্যাধির প্রবল অভিযানে লাগাম পরানোর উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় এবং বেশির ভাগ রাজ্য সরকার অনেকটা তৎপরতার সঙ্গে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সক্রিয় হয়েছে। নাগরিকদের সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাধ্য করার জন্য জারি করা হয়েছে নানা কঠোর নিয়ন্ত্রণ। নিয়ন্ত্রণের পরিধি ও মাত্রা ক্রমশই বাড়ছে।

এর পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের আর একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হল অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সঙ্কট মোকাবিলার জন্য একটি ইকনমিক রেসপন্স টাস্ক ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত। এই অতিমারির ফলে অর্থনীতির ওপর যে চাপ পড়ছে এবং পড়বে, এই গোষ্ঠী সংশ্লিষ্ট সমস্ত পক্ষের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে তার মোকাবিলার উপায় খুঁজবে। এই উদ্যোগের খুবই প্রয়োজন ছিল। তার কারণ, এই অতিমারিতে অন্য অনেকগুলি দেশের মতোই ভারতীয় অর্থনীতিরও বড় রকমের ক্ষতি অনিবার্য। এই লেখার সময় পর্যন্ত টাস্ক ফোর্স গঠিত হয়নি, তবে অনুমান করা যায় যে, এর প্রধান লক্ষ্য হবে সেই শিল্পগুলির ত্রাণের বন্দোবস্ত করা, যারা বিশেষ ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখানে একটা কথা বিশেষ ভাবে বলা দরকার। এ বারেও বিরাট ধাক্কা খেয়েছে বিভিন্ন ইনফর্মাল বা অসংগঠিত ক্ষেত্র, যেখানে কর্মরত দেশের ৯৪ শতাংশ কর্মী। তাই ইনফর্মাল শিল্প ও পরিষেবাগুলিকে সাহায্য করার জন্য কিছু উদ্ভাবনী প্রকল্পের কথা চিন্তা করতেই হবে।

অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবনের পথ খোঁজাই টাস্ক ফোর্সের প্রধান কাজ বটে, তবে দেশের নাগরিকেরা যে যন্ত্রণাময় অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন, সেই বিষয়টিও তাঁদের ভাল ভাবে বিচার করতেই হবে। অতিমারির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই সত্যটি উত্তরোত্তর পরিষ্কার হয়ে উঠছে যে, ভারতের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ছে। নাগরিকদের যতটা প্রয়োজন, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর সামর্থ্য তার চেয়ে অনেক কম, আর সেই কারণেই, সমাজে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া আটকানোর জন্য যত বেশি সংখ্যায় স্বাস্থ্যপরীক্ষা আবশ্যক ছিল, ততটা করা যাচ্ছে না। কয়েক দিন আগে পর্যন্ত ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর) এই নিয়ম অনুসরণ করছিল যে, যাঁরা বিদেশ থেকে এসেছেন যত ক্ষণ না তাঁদের শরীরে কোভিড-১৯’এর কোনও লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তত ক্ষণ তাঁদের পরীক্ষা করতে হবে না। তেমনই বলা হয়েছিল, যাঁদের পরীক্ষার ফল কোভিড-১৯ পজ়িটিভ এসেছে, তাঁদের সংস্পর্শে আসা মানুষজনেরও উপসর্গ দেখা না দিলে পরীক্ষার দরকার নেই। এই ব্যাধির রীতিমতো প্রাদুর্ভাব ঘটেছে এমন কোনও জায়গা থেকে আসা মানুষজনের সংস্পর্শে যাঁরা এসেছেন তাঁদের ক্ষেত্রে কী করণীয়, সে বিষয়ে তো আইসিএমআর-এর নির্দেশিকায় কিছুই বলা হয়নি। স্পষ্টতই, দেশে এই ভাইরাস পরীক্ষার পরিকাঠামো অত্যন্ত সীমিত বলেই এমন নির্দেশিকা জারি করতে হয়েছে। গত সপ্তাহের মাঝামাঝি আইসিএমআর ঘোষণা করে, তাদের মোট ৭২টি পরীক্ষাকেন্দ্রে এই ভাইরাস যাচাইয়ের ব্যবস্থা হয়েছে এবং সপ্তাহের শেষে আরও ৪৯টি এ জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। এই কেন্দ্রগুলিতে দিনে মাত্র কয়েক হাজার নমুনা পরীক্ষা করা যায়। প্রয়োজনের তুলনায় সেটা অনেক কম।

সম্প্রতি সরকার দু’টি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা পরীক্ষার সামর্থ্য কয়েক গুণ বাড়াতে সাহায্য করবে। এক, ওষুধ নিয়ন্ত্রণের ভারপ্রাপ্ত ডিসিজিআই ১৮টি সংস্থাকে কোভিড-১৯’এর পরীক্ষার অনুমোদন দিয়েছে। দুই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক বেসরকারি ল্যাবরেটরিকে যাচাইয়ের অধিকার দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।

কোভিড-১৯ সংক্রমণের সম্ভাবনা আছে, এমন ব্যক্তিদের শরীরে পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়া এত গুরুত্বপূর্ণ কেন? ভাইরাসটির সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরীক্ষা চালানোর ওপর জোর দিয়ে আসছে। ব্যাপক যাচাইয়ের সুফল খুব ভাল বোঝা গিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার দৃষ্টান্ত থেকে। ফেব্রুয়ারি মাসে দক্ষিণ কোরিয়াতে সংক্রমণের সংখ্যা ছিল ইটালির থেকেও অনেক বেশি। কিন্তু তারা সমস্ত সম্ভাব্য ক্ষেত্রে পরীক্ষার ব্যবস্থা করে এবং সে দেশে সংক্রমণের সংখ্যা এখনও পর্যন্ত প্রায় ৮৬০০, মৃত্যু একশোর নীচে। এই মডেলটিই ভারতের যথাসম্ভব অনুসরণ করা উচিত। দুটো কারণে। এক, কোভিড-১৯’এ আক্রান্ত ব্যক্তিকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে চিকিৎসা করতে পারলে কমিউনিটির মধ্যে সংক্রমণ রোধ করা যাবে। দুই, এবং এটা আরও গুরুত্বপূর্ণ, ভাইরাস সংক্রমণ আটকানোর জন্য দীর্ঘ দিন দেশকে ঘরবন্দি রাখাটা ভারতের পক্ষে কঠিন, কারণ তাতে ইনফর্মাল ক্ষেত্রে নিযুক্ত কর্মীদের উপার্জন বন্ধ হয়ে থাকবে, সেটা প্রচণ্ড ক্ষতিকর। সংক্রমণের সম্ভাবনার ক্ষেত্রে যথাসম্ভব বেশি মানুষের পরীক্ষার পাশাপাশি এটাও দেখা দরকার যে, দরিদ্র মানুষ যেন বিনা পয়সায় পরীক্ষা করাতে পারেন।

দেশের স্বাস্থ্য পরিষেবার পরিকাঠামো যে অত্যন্ত অপ্রতুল, সে কথা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়েছে। কিন্তু একের পর এক সরকার এসেছে, গিয়েছে, কেউই এমন কোনও বন্দোবস্ত করেনি যাতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবার ধারেকাছে পৌঁছনো যায়। এর প্রধান কারণ হল, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি খরচের মাত্রা অসম্ভব কম। মোটামুটি জিডিপির ১ শতাংশের সীমা কখনও ছাড়ায়নি। ২০২০-২১ সালের বাজেট অনুযায়ী সেই অনুপাত আরও কমবে— এই বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে প্রকৃত ব্যয়বরাদ্দ কমানো হয়েছে।

স্বাস্থ্য পরিষেবার ব্যবস্থা কেমন, তার একটা সূচক হল হাসপাতালের শয্যা-সংখ্যা। ভারতীয় নাগরিকদের এ ক্ষেত্রে কী ধরনের ঘাটতির মোকাবিলা করতে হয়? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে চলতি দশকের গোড়ায় এ দেশে প্রতি দশ হাজার অধিবাসী পিছু হাসপাতালের শয্যা ছিল মাত্র ৬টি। দুনিয়ার সবচেয়ে কম উন্নত কিছু দেশেও সংখ্যাটা এর চেয়ে বেশি। তাদের অন্যতম হল প্রতিবেশী বাংলাদেশ। চিনে প্রতি দশ হাজার মানুষের হাসপাতালে গড়পড়তা শয্যা আছে ৪২টি। ভারতে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে সরকারি ভূমিকা যে ভাবে ক্রমশই কমিয়ে আনা হচ্ছে, তাতে আসল ছবিটা আরও করুণ। বেসরকারি ক্ষেত্রের ভূমিকা উত্তরোত্তর বাড়ছে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ক্রমশই কর্পোরেট উদ্যোগে পরিণত হচ্ছে, আর তার ফলে রোগনির্ণয় ও চিকিৎসার সমগ্র আয়োজনটাই দরিদ্র মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ওষুধের সমস্যাটা ভারতে অন্য অনেক দেশের তুলনায় কিছুটা কম। অনেক ওষুধই এ দেশে মোটামুটি কম দামে পাওয়া যায়। তার কারণ হল, সস্তায় জেনেরিক ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম একটা বেশ বড়সড় স্বদেশি শিল্প এ দেশে আছে। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে যে, গত দু’দশকে ভারতের ওষুধ শিল্পের কাঠামোয় একটা তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। দেশি কোম্পানিগুলি এখন প্রধানত বিভিন্ন ওষুধের ‘ফর্মুলেশন’ উৎপাদন করছে। এই ফর্মুলেশন তৈরির জন্য যে সব সক্রিয় উপকরণ (অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট বা এপিআই) দরকার হয়, যাদের চলতি কথায় ‘বাল্ক ড্রাগ’ বলা হয়, সেগুলি এখন এ দেশে কম উৎপাদন করা হয়। এপিআই বা বাল্ক ড্রাগ এখন আমদানি করা হয় প্রধানত চিন থেকে। আগে এ দেশের বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলিকে তাদের ফর্মুলেশন তৈরির জন্য বাল্ক ড্রাগ সরবরাহ করত প্রধানত সরকারি ওষুধ সংস্থাগুলি। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিক থেকে সরকার বহুলাংশে এই রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ কোম্পানিগুলির পাশ থেকে সরে যায়।

কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ওষুধের ক্ষেত্রে এপিআইয়ের জন্য চিনের ওপর নির্ভরশীলতা অসম্ভব বেড়ে গিয়েছে। এতটাই, যা একেবারেই মেনে নেওয়া চলে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮-১৯ সালে এ দেশের মোট পেনিসিলিন আমদানির ৮৯ শতাংশ এসেছে চিন থেকে। কিংবা ধরা যাক রিফামপিসিন-এর কথা। ওষুধটি টিউবারকিউলোসিসের চিকিৎসায় খুব গুরুত্বপূর্ণ। এর ৯৫ শতাংশই এখন চিন থেকে আমদানি করা হয়। কোভিড-১৯ অতিমারিতে চিনের শিল্পক্ষেত্রে যে প্রবল ধাক্কা লেগেছে, তার ফলে ভারতের ওষুধ শিল্পের সামনে এখন বড় রকমের অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। দেশের ওষুধ উৎপাদনের সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান করতে হলে সরকারকে এমন ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে দেশের মধ্যে এপিআই স্তর থেকেই ওষুধের উৎপাদন শুরু করা যায়। এ ছাড়া যথার্থ সমাধানের অন্য কোনও রাস্তা নেই। এর পাশাপাশি, যে সব দেশি সংস্থা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং যন্ত্রপাতি তৈরি করে, তাদের জন্য বিশেষ ইনসেনটিভ বা উৎসাহ ব্যবস্থার আয়োজন করা দরকার।

ভারতের স্বাস্থ্য পরিষেবার গোটা ব্যবস্থাটা কতটা দুর্বল, এই অতিমারির মুখে পড়ে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে। এই অবস্থায় দাঁড়িয়ে যদি এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজতে হয়, তবে তার একমাত্র উপায় সরকারকে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে এবং সমস্ত সংশ্লিষ্ট পক্ষকে সঙ্গে নিয়ে সমস্যা মোকাবিলার কার্যকর রণকৌশল কাজে লাগাতে হবে। লক্ষ্য একটাই: স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে সকলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা।

 

অর্থনীতি বিভাগ, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যাল

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন