• আনন্দলাল রায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

লড়াই চলছে জোরকদমে

করোনাভাইরাস ঠেকাতে প্রত্যেককে সতর্ক, বিবেকবান হতে হবে

Coronavirus
ফাইল চিত্র

চিনের উপেই রাজ্যের উহান শহরের হাসপাতালে ১৮ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে পাঁচ জন রোগী ভর্তি হন তীব্র নিউমোনিয়ার লক্ষণ নিয়ে। পাঁচ দিনের মাথায় এক জন মারাও যান। কী হচ্ছে, গোড়ায় তা বুঝতে না পারলেও, ২ জানুয়ারির মধ্যে ল্যাবরেটরির রিপোর্ট নিশ্চিত ভাবে জানাল, হাসপাতালে ভর্তি ৪১ জন রোগী ভুগছেন নোভেল করোনাভাইরাস (সার্স-সিওভি-২) সংক্রমণে। এঁদের অর্ধেকের মধ্যে আগে থেকে ছিল নানা ধরনের অসুস্থতা, যেমন ডায়াবিটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্‌রোগ, যার ফলে সংক্রমণের তীব্রতা আন্দাজ করা কঠিন হয়। গত শুক্রবার সন্ধে পর্যন্ত চিনে ৮১ হাজারের উপর মানুষ আক্রান্ত, মৃত্যু হয়েছে ৩১০০ ব্যক্তির। আরও বড় কথা, সারা বিশ্বে এই সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছেন ২ লক্ষ ৪৬ হাজারেরও বেশি মানুষ, ১০ হাজারের উপর মানুষ মারা গিয়েছেন। প্রতি মুহূর্তে এই সংখ্যাগুলো যে ভাবে বেড়ে চলেছে, তা ভয়প্রদ। সার্স-সিওভি-২ যে রোগ লক্ষণগুলি তৈরি করছে তাকেই সাধারণ ভাবে বলা হচ্ছে সিওভিআইডি-১৯ বা কোভিড-১৯।

যদিও বলা হচ্ছে, উহানের সামুদ্রিক জীব ও কাঁচা মাংসের পাইকারি বাজার থেকে এই রোগ ছড়িয়েছে, তবু এ কথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় যে খাবার থেকে এটা ছড়ায়নি। কী করে এটা মানুষে এল, তা বলা কঠিন, তবে মনে হয় বাদুড় থেকে। বাদুড় বাজারে বিক্রি হয় না, তবে অনেকে বাদুড় ধরে বিক্রি করেন রেস্তোরাঁগুলোকে। খুব সম্ভব বাদুড় আর মানুষের মধ্যে অন্য কোনও প্রাণী মধ্যস্থতা করেছে— বাদুড় থেকে সংক্রমণ ছডিয়েছে সেই প্রাণীর মধ্যে। সেই প্রাণীর শরীরে ওই ভাইরাসের গঠনে দ্রুত পরিবর্তন (মিউটেশন) হয়েছে, যার ফলে তা থেকে সংক্রমণ হয়েছে তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মানুষে।

করোনাভাইরাস কী? এ হল ৫০০ রকম ভাইরাসের পরিবার, যার বেশির ভাগই প্রাণীদের মধ্যে ঘোরে, যেমন শুয়োর, উট, বাদুড়, বেড়াল, ইত্যাদি। অনেক ধরনের করোনাভাইরাস প্রাণী থেকে ছড়াতে পারে মানুষে, যখন তারা খুব কাছাকাছি থাকে। বেশির ভাগ সময়ই এই সংক্রমণের ফলে হাল্কা থেকে তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় মানুষের, কিছুটা সাধারণ সর্দি-কাশির মতো, কিন্তু ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো নয়। ১৯৬৬ সালে দুই বিজ্ঞানী, টাইরেল এবং বাইনো, রোগীদের থেকে পাওয়া ভাইরাসকে আলাদা করে চিহ্নিত করে প্রথম এর বিবরণ দেন। এদের চেহারাটা গোল, যা থেকে বেরিয়ে আসে কিছু কৌণিক রেখা, যা অনেকটা সূর্যের চারপাশের রশ্মির মতো। লাতিন ভাষায় করোনা শব্দের অর্থ মুকুট। একবিংশ শতাব্দীতে তিন বার তিনটি বড় বড় ক্ষেত্রে প্রাণীদের থেকে মানুষে ছড়িয়েছে করোনাভাইরাস, যা থেকে গোটা বিশ্বে অসুস্থতা ও মৃত্যু ঘটেছে। ২০০৩ সালে সার্স (সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম) হয়, যার উৎস ছিল বাদুড়, যা থেকে ভাইরাস আসে সিভেট বেড়ালে, এবং তা থেকে সংক্রমিত হয় মানুষ। আরও একটি মারাত্মক করোনাভাইরাস ২০১২ সালে সৌদি আরবে দেখা দেয়। এর নাম মিডল ইস্ট রেসপিরেটরি সিন্ড্রোম বা মার্স। মনে করা হয়, সেটা বাদুড় থেকে এক কুঁজের উটে (ড্রোমেডরি) ছড়িয়েছিল, যা থেকে আসে মানুষে। কোভিড ১৯-এ আক্রান্ত মানুষের থেকে পাওয়া জেনোম বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে সাদৃশ্য  খুব বেশি (৯৯.৯৮ শতাংশ)— যা থেকে মনে হয় যে খুব সম্প্রতি মানুষে এটা ছড়িয়েছে। যে হেতু এই ভাইরাসের মিউটেশন বা জিনগত গঠন-পরির্তন খুব দ্রুত হয়, তাই আগে সংক্রমণ হয়ে থাকলে এর পরিবর্তন বেশি হত। এ ছাড়া গ্রামের যে মানুষেরা বাদুড়দের স্বাভাবিক বাসস্থান, অর্থাৎ গুহার কাছাকাছি থাকেন, তাঁদের পরীক্ষা করেও দেখা গিয়েছে, তাঁদের মধ্যে এই ভাইরাস যথেষ্ট রয়েছে এবং তার গঠন নোভেল করোনাভাইরাসের খুব কাছাকাছি। তাই ল্যাবরেটরিতে এই ভাইরাস তৈরি হয়েছে, এই গুজব উড়িয়ে দেওয়া যায়।

কোভিড-১৯ কী ভাবে ছড়ায়? প্রধানত মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায়, এবং দু’ভাবে। যাঁরা পরস্পরের কাছাকাছি আছেন (ছ’ফুটের কম দূরত্বে) অথবা তরল ফোঁটার মাধ্যমে, যদি সংক্রমিত ব্যক্তি হাঁচেন বা কাশেন। রোগলক্ষণ যখন দেখা দেয়নি, তখনও সংক্রমিত ব্যক্তির থেকে রোগ ছড়াতে পারে, তবে যাদের রোগলক্ষণ দেখা গিয়েছে, সেই অসুস্থ ব্যক্তিদের থেকেই ছড়ায় বেশি। আশ্চর্য এই যে মানবদেহের বাইরেও অনেকটা সময় এর অস্তিত্ব দেখা গিয়েছে। যেমন এয়ারোসোলের ফোঁটায় তিন ঘণ্টা, ধাতব বস্তুতে চার ঘণ্টা, কার্ডবোর্ডে ২৪ ঘণ্টা, এবং প্লাস্টিক ও স্টেনলেস স্টিলে তিন দিন অবধি। যা থেকে মনে হয়, হাওয়া থেকে বা কোনও জীবাণুদূষিত বস্তু স্পর্শ করার মাধ্যমেও মানুষের দেহে এটা আসতে পারে। ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়ে আরও যা বিচার করা দরকার, তা হল কত সহজে তা মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে, এবং অনেক বড় জনসংখ্যায় তার সংক্রমণ দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে কি না। দুর্ভাগ্যবশত, কোভিড-১৯ বেশ সহজে ছড়াচ্ছে, টিকেও থাকছে নানা দেশে। বিদেশযাত্রার জন্য বিশ্বের মানুষ এখন পরস্পরের কাছাকাছি, তাই এই ভাইরাস দেশ থেকে দেশে সহজেই ছড়াচ্ছে।

কতটা সংক্রামক কোভিড-১৯? গবেষণায় বোঝা যাচ্ছে, কাছাকাছি এলে এক ব্যক্তির থেকে দু’-তিন জনে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সহজে বোঝা যায়, এর ফলে কত কম সময়ে কত বড় জনসংখ্যা সংক্রমিত হতে পারে। এখন মৃত্যুহার ২-৩ শতাংশ, ফ্লুতে সেখানে ০.১ শতাংশ। অর্থাৎ কোভিড-১৯ ফ্লুয়ের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ বেশি প্রাণঘাতী। তবে সার্স (১০ শতাংশ) বা মার্সের (৩৬ শতাংশ) তুলনায় কোভিড-১৯’এর মৃত্যুহার কম। যদিও গোড়ায় মনে হয়েছিল যে প্রধানত ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তিরাই কোভিড-১৯’এ আক্রান্ত হচ্ছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে দেখা যাচ্ছে যে আরও কমবয়সিরাও আক্রান্ত হচ্ছেন, দু’টি শিশুরও সংক্রমণ হয়েছে। অধিকাংশ মৃত্যু হয়েছে পুরুষদের, যেটা জৈবিক এবং জীবনযাপনের শৈলী, দু’টি কারণেই হতে পারে, যদিও ঠিক কারণ জানা যায়নি। আশা করা হচ্ছে যে এই ভাইরাসের সংক্রমণ মরশুমি, কিন্তু তা-ও সত্যি কি না, জানা নেই। যদি তা-ই হয়, তা হলে হয়তো রোগের প্রতি এক ধরনের প্রতিরোধ গড়ে উঠতে পারে, যা ভবিষ্যতে সংক্রমণ কমিয়ে দিতে পারে।

আশ্চর্য ভাবে, ভারতের বিপুল জনসংখ্যা এবং জনসংখ্যার ঘনত্ব সত্ত্বেও খুব কমই কোভিড-১৯ আক্রান্ত এখনও অবধি পাওয়া গিয়েছে। এর কারণ কী, বোঝা যাচ্ছে না। গরমে ভাইরাস ছড়ায় কম (যদিও এখনও অবধি এই ধারণার কোনও ভিত্তি মেলেনি), না কি যত ছড়িয়েছে তত ধরা পড়ছে না পরীক্ষা এবং রিপোর্টিং কম হয়েছে বলে, না কি ভারত সংক্রমণ প্রতিরোধের কাজটা খুব ভাল ভাবে করেছে, তা স্পষ্ট নয়। যত নতুন নতুন সংক্রমণের ঘটনা সামনে আসছে, ততই বোঝা যাচ্ছে যে এই নতুন বিপদ সম্পর্কে আমাদের জানা-বোঝার পরিধি খুবই ছোট। এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, এটুকুই আমরা জানি।

কী করে কমানো যায় কোভিড-১৯? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশে এটা যেমন দ্রুত গতিতে ছড়াচ্ছে তাতে বোঝা যাচ্ছে যে কেবল এর ছড়ানো রোধ করাই যথেষ্ট নয়, এর বিস্তারের বৃদ্ধির হার কমিয়ে আনতে হবে। এর জন্য দরকার ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা (বার বার সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, চোখ-নাক-মুখ স্পর্শ না করা), সংক্রমিত ব্যক্তিকে বিচ্ছিন্ন রাখা (স্বেচ্ছায় আলাদা থাকা, বা নিজেই ঘরে থাকা), স্কুল-কলেজ সহ যে কোনও জমায়েত বন্ধ রাখা, যথাসম্ভব এবং যত দিন সম্ভব টেলিসংযোগের মাধ্যমে কাজ করা। যদিও সারা বিশ্বে টিকা তৈরির কাজ তীব্র গতিতে চলছে, তবু নিরাপদ ও কার্যকর ভ্যাকসিন পেতে ১২ থেকে ১৮ মাস লাগবে। সেই সঙ্গে অন্যান্য অসুখ সারাতে ব্যবহৃত ওষুধ কোভিড-১৯’এর জন্য কাজ করে কি না, তা দেখা হচ্ছে। মার্স-এর বিরুদ্ধে ‘রেমডেসিভির’ ওষুধটি প্রাণীদের উপর প্রয়োগ করে ভাল ফল মিলেছে, তাই কোভিড-১৯’এর জন্যও এর পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আর একটি ছোট পরীক্ষা হচ্ছে ম্যালেরিয়া-বিরোধী ওষুধ ক্লোরোকুইন নিয়ে। যে রোগীরা কোভিড-১৯’এ আক্রান্ত হওয়ার পর সেরে উঠেছেন, তাঁদের দেহ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডিও রোগ নিরাময়ে কাজে আসতে পারে।

কিন্তু যা সব চাইতে জরুরি, তা হল এই সম্ভাবনার জন্য প্রস্তুত থাকা যে কোভিড-১৯ গোটা বিশ্বে অতিমারি রূপে দেখা দেবে। আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব অত্যন্ত সতর্ক, বিবেকবান হয়ে এর বিস্তার প্রতিরোধ করা, যত দিন না এর কার্যকর চিকিৎসা খুঁজে পাওয়া যায়। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া জনস্বাস্থ্যের সঙ্কটের মোকাবিলা করা যাবে না।

 

ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, 

ওয়াশিংটন ডিসি

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন