সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

গণ ও শত্রু

Coronavirus

সেই কোন কালে বাঙালি বড় মানুষের ছেলে সম্পর্কে হুতোম বলিয়া গিয়াছিলেন, তাহাদের বুদ্ধি এমন সূক্ষ্ম যে নাই বলিলেও বলা যায়, তাহাদের প্রাণ কেবল ঠাট্টা-ইয়ার্কির দিকে দৌড়ায়। ইঙ্গিতটি ছিল উনিশ শতকের বাঙালি বাবু-সংস্কৃতির শিক্ষার অভাবের দিকে। করোনা-আতঙ্কের আবহে সেই কথার সারবত্তা মর্মে মর্মে বুঝা যাইতেছে। একুশ শতকীয় বঙ্গসমাজ বরং আরও এক কাঠি আগাইয়া দেখাইয়া দিয়াছে, তাহার আচরিত নির্বুদ্ধিতা বয়স, শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থান-নিরপেক্ষ। বিলাত-ফেরত বাঙালি তরুণকে বিমানবন্দরেই করোনাভাইরাস সংক্রমণের পরীক্ষার পরামর্শ দেওয়া হইলেও তিনি তাহা অগ্রাহ্য করেন। বিখ্যাত গায়ক বিদেশ হইতে ফিরিয়া সোজা চলিয়া যান অনুষ্ঠানে। বাংলাদেশের একটি জায়গায় লক্ষাধিক মানুষ একত্র হইয়া প্রার্থনাসভা করেন। কাহারও মাথায় থাকে না, সকলেই আসলে সম্ভাব্য সংক্রমণের পথ প্রশস্ত করিলেন।

দেখিয়া শুনিয়া রামকৃষ্ণের গল্পের কথা মনে পড়ে। মাহুতের সরিয়া যাইবার নির্দেশ অগ্রাহ্য করিয়া মত্ত হাতির সম্মুখে এক ভক্তিমান জোড়হস্তে দাঁড়াইয়া ছিল, কারণ হাতি নারায়ণ। হাতি শুঁড়ে ধরিয়া তাহাকে ছুড়িয়া ফেলিবার পর তাহাকে গুরু বলিয়াছিলেন, হাতি নারায়ণকে দেখিলে, আর মাহুত নারায়ণের নিষেধ শুনিলে না? রামকৃষ্ণের প্রেক্ষিতটি ভিন্ন হইলেও বাঙালির জাতিগত চরিত্র বুঝিবার পক্ষে কাহিনিটি গুরুত্বপূর্ণ। সে পরিস্থিতি বুঝিয়া সিদ্ধান্ত লইতে পারে না, কার্যকালে যখন যুদ্ধকালীন তৎপরতা প্রয়োজন, তখনও নিজ বিশ্বাসে অনড় হইয়া থাকে। তাহার অনমনীয়তা দার্ঢ্যের পরিচায়ক নহে, দৌর্বল্যের প্রকাশক। দুর্বলতা ঢাকিতে সে নিজ গাত্রে এক প্রস্থ রসিকতার বর্ম চাপাইয়া লয়। বিশ্ব যেখানে করোনাভাইরাসের জন্য ত্রস্ত ও শঙ্কিত, সেখানে বঙ্গবাসীর হাবেভাবে আচরণে প্রকাশ পাইতেছে অকুতোভয় পরিহাসপ্রিয়তা। সমাজমাধ্যম ছাইয়া গিয়াছে রসিকতায়। তাহার অনেকাংশই বুদ্ধিদীপ্ত, কিন্তু বুঝিতে হইবে, ঠাট্টা-রগড় তাহার নিজস্ব ধর্মেই প্রচারিত হয় বেশি, সমাজমনকেও তাহা যারপরনাই প্রভাবিত করিবার ক্ষমতা রাখে। করোনার মতোই এই পরিহাস-ভাইরাসে সংক্রমিত হইলে মানুষ হইতে মানুষে ছদ্ম বীররসের উপসর্গ নজরে পড়ে। সেই রসোদ্ভাসেই বিশ্ব জুড়িয়া যাহা অতিমারি, বাঙালির কাছে তাহা নিতান্ত বাড়াবাড়ি। বাঙালি কবির কবিতা উদ্ধৃত করিয়া অনেকে বুক ফুলাইতেছেন, মন্বন্তর হইতে মারি সকল কিছুর সহিত ঘর করিয়াছে যে জাতি, করোনায় তাহার ভয় কী। অনেকে যুক্তি দিতেছেন, একশত ত্রিশ কোটির যে দেশে রোজ শত শত শিশুমৃত্যু হইতেছে, পথ-দুর্ঘটনায় মুহুর্মুহু লোকে মরিতেছে, সেখানে করোনায় আক্রান্ত মাত্র চারটি মৃত্যু লইয়া এমন শঙ্কা নিতান্ত অমূলক। সুতরাং জীবন যেমন চলিতেছে চলুক, চা-দোকানের আড্ডা বহাল থাকুক, স্কুল-কলেজ ছুটি সুতরাং সপরিবার পাহাড় কি সমুদ্রে বেড়াইতে যাইবার পরিকল্পনা বাদ থাকে কেন? কেহ আবার বেড়াইতে যাইয়া সমস্ত কিছু বন্ধ বা নিয়ন্ত্রিত দেখিয়া বিরক্ত বা ক্রুদ্ধ, কেন সব স্বাভাবিক নহে?

সতর্ক সচেতন বাঙালি কি তবে নাই? নিশ্চয়ই আছে। বহু মানুষ যথাসম্ভব নিজ গৃহে থাকিয়া স্বাস্থ্যবিধি পালনে সনিষ্ঠ। তবে সচেতনতা বস্তুটি বাঙালির সহজাত নহে, শাসন-অনুশাসনের চামচ দিয়া গিলাইলে সে তাহা গলাধঃকরণ করিতে বাধ্য হয়, ইহাই দুর্ভাগ্য। আবার যিনি শিখাইতে যান তাঁহারও ঝুঁকি কম নহে। সত্যজিৎ রায়ের ছবিতে বিজ্ঞানসাধক ও জনহিতৈষী ডাক্তারটির বিরুদ্ধে পোস্টার পড়িয়াছিল, তিনি ‘গণশত্রু’। নির্বুদ্ধিতাই যে প্রকৃত শত্রু, ছবির ‘গণ’ বুঝে নাই। বাঙালিই কেবল নির্বোধ, বিশ্বে কেবল তাহারাই করোনাকে তুচ্ছ জ্ঞানে হাসিয়া উড়াইয়া দিতেছে, এমনও নহে। আমেরিকার মায়ামিতে এই আবহেও বিরাট সমকামী-সমাবেশ হইয়াছে, ফ্লোরিডায় এক দল মানুষ মাতিয়াছেন বসন্ত-অবকাশ উদ্‌যাপনে। এক বিখ্যাত কম্পিউটার নির্মাতা সংস্থার প্রধান খেপিয়া গিয়া বার্তা দিয়াছেন— সামাজিক দায়িত্ব বিষয়ে চূড়ান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন এই সব মানুষ যেন কদাপি তাঁহাদের সংস্থায় চাকুরির আবেদন না করেন। ভাষা, ধর্ম, শারীরবৈশিষ্ট্য ছাড়াও তবে মানবজাতিকে এই ভাবে ভাগ করা যায়— বিবেচক ও অবিবেচক। বঙ্গদেশে দ্বিতীয় গোত্রের মানুষের প্রাদুর্ভাবই বেশি। শনৈঃ শনৈঃ নিজেদের বিদ্যা-বুদ্ধির গর্ব করিয়াও যে কেন তাহাদের দ্বিতীয় গোত্রে নাম লিখাইতে হয়, তাহা প্রমাণ করিয়া দিল করোনাসঙ্কট।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন