• অমিতাভ গুপ্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

অচেনা বিপদ মারাত্মক

করোনাভাইরাস ভয়াবহ, কারণ তার সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না

টিবি সংক্রান্ত তথ্য তোর মগজে আছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিষয়ে কোনও তথ্য জমা নেই। ফলে, এটা সেই গোত্রের অজানা জিনিস, যার সম্বন্ধে কিছু অনুমান করার মতো তথ্যও নেই।

Coronavirus

যেখানে টিবি থেকে অ্যাক্সিডেন্ট, সবেতেই করোনাভাইরাসের চেয়ে ঢের বেশি লোক মারা পড়ছে, সেখানে এই ভাইরাস নিয়ে দুনিয়া জুড়ে এমন আদিখ্যেতা কেন হচ্ছে জানিস তো? কারণ, করোনাভাইরাস বড়লোকদেরও ছাড়ছে না।’’ হোয়াটসঅ্যাপ থেকে পাওয়া তথ্যের ঝুলি তপেশের মাথায় উপুড় করে দেয় শিশির। 

শিশির আর তপেশের তর্ক চলছে অনেক ক্ষণ ধরে। তপেশের বক্তব্য, যে হইচইটা হচ্ছে, সেটা হওয়া দরকার। শিশির মানতে রাজি নয়। সূর্য হুঁ হুঁ করে তাল দিচ্ছিল দু’পক্ষকেই, কিন্তু শিবুদা একেবারে চুপ। চা খেলেন, সিগারেট খেলেন, আমলার লন্ডন-ফেরত ছেলের কীর্তিকলাপ পড়লেন আনন্দবাজারে, কিন্তু স্পিকটি নট। এমনকি, তপেশের চিমটিও তাঁর মুখ খোলাতে পারেনি। শিশিরের কথা শেষ হতে নীরবতা ভাঙলেন শিবুদা। ‘‘একশো বছর, বুঝলি!’’

‘‘বলেন কী মশাই, তিন মাসও হয়নি নোভেল করোনাভাইরাসের!’’ তপেশ ফুট কাটল।

‘‘ও সব ভাইরাসের কথা বলছি না রে, বলছি ফ্র্যাঙ্ক নাইটের কথা।’’ তপেশকে থামান শিবুদা। ‘‘শিকাগো স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা; মিল্টন ফ্রিডম্যান, জর্জ স্টিগলার, জেমস বুকাননদের মাস্টারমশাই। তিন জনই নোবেল লরিয়েট, মনে রাখিস। কোস থেকে হায়েক, স্যামুয়েলসন— ইকনমিক্স-এর সব চন্দ্র-সূর্যরা গুরু মানতেন নাইটকে। ঠিক একশো বছর আগে, ১৯২১ সালে, রিস্ক, আনসার্টেনটি অ্যান্ড প্রফিট নামে এক পিস ম্যাগনাম ওপাস লিখেছিলেন নাইট। সেটার কথা বলছিলাম। করোনাভাইরাস নিয়ে এই আতঙ্ক কেন, সেটা ভাবতে গিয়ে মনে হল, নাইটের লেখাতেই সেরা ব্যাখ্যাটা আছে।’’

‘‘একশো বছর আগে করোনাভাইরাস নিয়ে লিখেছিলেন নাইট?’’ প্রশ্ন করে শিশির। ইয়ার্কি, তবে সত্যি বিস্ময়ও আছে তার গলায়।

এ বার ধৈর্য হারান শিবুদা। ‘‘হোয়াটসঅ্যাপ আর ফেসবুকের বাইরে যদি কিছু পড়ার অভ্যেস থাকত, তা হলে এমন গণ্ডমূর্খ হয়ে থাকতিস না। শিকাগো স্কুলের গুরুঠাকুর, তিনি ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে ভাববেন, না ভাইরাসচর্চা করবেন? বইটায় একটা মোক্ষম কথা লিখেছিলেন নাইট— অজানা জিনিস মাত্রেই এক রকম নয়। লিখেছিলেন, রিস্ক হল সেই অজানা, যেটা ঘটার সম্ভাবনা আগে থেকে নিখুঁত ভাবে অনুমান করা যায়; আর আনসার্টেনটি হল সেই অজানা, যেটার সম্ভাবনা অনুমান করার জন্য যতটুকু তথ্য আমাদের হাতে থাকা দরকার, সেটা নেই। বাংলায় বললে, প্রথমটা হল এমন একটা ব্যাগে হাত ঢোকানো, যাতে কিছু লাল বল আছে, আর কিছু কালো বল— তুই কোন রঙের বল পাবি, সেটা না জানা থাকলেও দুটোর মধ্যে যে কোনও একটা রঙের বল পাবি, সেটা নিশ্চিত; দ্বিতীয়টা হল এমন ব্যাগে হাত ঢোকানো, যার ভিতরে বল আছে না কেউটে সাপ, সেটাই জানিস না।’’

শিবুদা কথা থামালেন। গোপাল চা দিতে এসেছে, তার মুখে মাস্ক। এন নাইনটি ফাইভ নয়— সে মাস্ক বাজারের ত্রিসীমানায় নেই। সূর্য এই ফাঁকে তার প্রশ্ন গলিয়ে দেয়, ‘‘কিন্তু শিবুদা, কোনও কিছুই কি নিশ্চিত করে জানা যায়?’’

‘‘এটা কি দার্শনিক প্রশ্ন?’’ চশমার ফাঁক দিয়ে সূর্যের দিকে তাকান শিবুদা। ‘‘ইকনমিক্সে অবিশ্যি নাইটের এই ক্লাসিফিকেশনের ঢের সমালোচনা হয়েছে পরবর্তী কালে। ব্যবসার দুনিয়ায় যে কোনও অজানাকেই এ রকম নিখুঁত ভাবে অনুমান করা যায় না, সে কথা বলা হয়েছে। কিন্তু, করোনাভাইরাসের প্রসঙ্গে সেই কথায় না ঢুকলেও চলবে। কারণ, কম্পিউটারের হিসেবনিকেশ নয়, করোনাভাইরাসের জানা-অজানার খোঁজ রাখছে মন।’’

‘‘এটা কিন্তু আপনার স্পেশালিটি, শিবুদা। যেখানে যা-ই হোক, গল্পটাকে আপনি বিহেভিয়রাল সায়েন্সে টেনে আনবেন ঠিক।’’ একটু আগে ধমক খেয়েছিল শিশির, এখন চিমটি কেটে শোধ তুলল।

‘‘আমার নয়, বলতে পারিস ওটা মানুষের স্পেশালিটি’’, বলটাকে বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়ে দিলেন শিবুদা। ‘‘টিবি আর করোনাভাইরাসের কেস দুটোই ধর। নিজের কথা ভাব— কী থেকে টিবি হয়, তুই জানিস। হলে কী কী হতে পারে, চিকিৎসা কী, সেগুলোও জানিস। তার চেয়েও বড় কথা হল, তোর চোখের সামনে তুই কাউকে টিবিতে মরতে দেখিসনি— এই কথাটা কেন আলাদা করে বললাম, তাতে পরে আসছি— ও দিকে, করোনাভাইরাস সম্বন্ধে কিচ্ছুটি জানিস না। কিসে হচ্ছে, কিসে মরছে ভাইরাস, শুধু বুড়ো মানুষেরাই করোনায় মারা পড়ছে কি না, জানা নেই। শুধু জানিস, দুনিয়ার ৭৫ পার্সেন্ট দেশে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে আগুনের মতো। 

‘‘এ বার আমাদের মনের কথা ভাব। মন আমাদের অজান্তেই প্রতিটি জিনিসের বিপদ মেপে চলেছে। ওটা বিবর্তনের অবদান— চার পাশে যা ঘটছে, তার সব কিছুর সম্ভাব্য বিপদের হিসেব যদি সচেতন ভাবে করতে হত, তা হলে অন্য কিছু করা হয়ে উঠত না। কিন্তু, মন সেই বিপদ মাপবে কী ভাবে? মনে বা মগজে ইতিমধ্যেই যে তথ্য জমা রয়েছে, সেগুলো ব্যবহার করে। টিবি সংক্রান্ত তথ্য তোর মগজে আছে— ঠিক হোক, ভুল হোক, আছে। কিন্তু করোনাভাইরাসের বিষয়ে কোনও তথ্য জমা নেই। ফলে, এটা সেই গোত্রের অজানা জিনিস, যার সম্বন্ধে কিছু অনুমান করার মতো তথ্যও নেই।’’

‘‘চোখের সামনে কাউকে টিবিতে মরতে না দেখার কথাটা কেন বললেন, সেটা অনুমান করতে পারছি।’’ শিবুদা থামতে বলল সূর্য। ‘‘ইনফর্মেশন কাসকেড-এর কথা ভাবছেন তো? মানে, যে ঘটনার উদাহরণ চোখের সামনে আছে, সেটাকে বেশি সম্ভাব্য বা বেশি বিপজ্জনক বলে ধরে নেওয়া?’’

‘‘শাবাশ!’’ সূর্যের পিঠ চাপড়ে দেন শিবুদা। ‘‘এখানে যদিও একটা মারপ্যাঁচ আছে। সোশ্যাল মিডিয়াতে হট্টগোলই হোক বা শপিং মল খালি করে জিনিসপত্র বাড়িতে মজুত করাই হোক, করছে মূলত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্তেরা। দুনিয়া জুড়েই। তারা দিবারাত্রি টেলিভিশনে করোনাভাইরাসের খবর দেখছে, সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখছে, খবরের কাগজে দেখছে। তাদের মাথায় কোভিড-১৯ সম্বন্ধে তথ্য— অবিশ্যি, তাকে ‘তথ্য’ বলা মুশকিল, অনেক গুজব আর অনেক অতিরঞ্জনও বিলক্ষণ আছে তার মধ্যে। ও দিকে, টিবিতে লোকে বেধড়ক মরছে। কিন্তু তাদের বেশির ভাগই গরিব মানুষ। মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন চেনাপরিচিতির বাইরে। এমনকি, এই মুহূর্তে যখন টিবি নিয়েও এত কথা হচ্ছে, তবুও সেটা করোনাভাইরাসের ভয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারছে না কেন, জানিস? কারণ, টিবি-র কোনও ভিজ়ুয়াল ইমপ্যাক্ট এই মুহূর্তে নেই। আমরা বড় জোর কিছু পরিসংখ্যান পড়ছি। ছবি দেখছি না। এই যে আমি, ব্যাগে হ্যান্ড স্যানিটাইজ়ার নিয়ে ঘুরছি করোনার ভয়ে, টিবির ভয়ে কিন্তু সিগারেট খাওয়া বন্ধ করিনি এখনও। কাজটা অবিশ্যি ঘোর অন্যায় করছি।’’ কথা থামিয়েই শিশিরের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিয়ে ধরালেন শিবুদা। 

‘‘এ তো বিহেভিয়রাল সায়েন্সের খনি দেখছি!’’ তপেশ বলে। 

‘‘এখনও শেষ হয়নি।’’ বললেন শিবুদা। ‘‘কী ভাবে কেউ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে, হলে ঠিক কী বিপদ হতে পারে, তার থেকে বাঁচার উপায় কী— কিছুই যখন জানা নেই, তখন মন সেই অজানা অনিশ্চয়তাকে মাপতে চায় কেন? তার কারণ, যত ক্ষণ অবধি মন একটা কমপ্রিহেনসিভ, যুক্তিগ্রাহ্য আখ্যান খাড়া করতে পারছে— যে গল্পে কারণ আর ফলাফল দুটোই আমাদের জানা, তেমন আখ্যান— তত ক্ষণ অবধি মনের অশান্তি বড় প্রবল। কারণ, আগেও বলেছি, আমাদের মগজ আসলে একটা গল্প বানানোর মেশিন। এই যুক্তিগ্রাহ্য গল্প বানানোর ক্ষমতাটাও আমাদের বিবর্তনের একটা মস্ত ধাপ। কিন্তু, তাতে মুশকিলও আছে। গল্প এক বার খাড়া হয়ে গেলে আমরা আর তার ঠিক-ভুল বিচারের চেষ্টা করি না খুব একটা।

‘‘সে যা-ই হোক, যে হেতু কোনও বিপদ ঘটার সম্ভাবনা নিখুঁত করে মাপা মানুষের অসাধ্য— সেটা মাপতে গেলে যে পরিমাণ তথ্য প্রয়োজন, আর তার যতখানি বিশ্লেষণ প্রয়োজন, সেটা করতে সুপার-কম্পিউটার লাগবে— ফলে আমাদের মন সেই বিপদকে হয় ছোট করে দেখে, অথবা বড় করে দেখে। মন কোন দিকে ঝুঁকবে, তা নির্ভর করে হাতের কাছে যা যা তথ্য পেল অথবা পেল না, তার ওপর। সে সব দিয়ে আমাদের মন তো করোনাভাইরাসের বিপদের একটা মাপজোখ করে ফেলল। ইনফর্মেশন কাসকেড তৈরি হওয়ায় করোনার বিপদকে বড় করেও দেখল। এ বারে প্রশ্ন হল, সেই বিপদের সামনে দাঁড়িয়ে আমাদের রিঅ্যাকশন কী হবে? 

‘‘এ বার আসরে নামে মানুষের ‘লস অ্যাভারশন’— ক্ষতির ভীতি। মানুষের মনের কাছে যে হেতু করোনাভাইরাসের বিপদ প্রকট এবং বড়, ফলে সেই বিপদে ক্ষতির আশঙ্কাও বড়। সেই ক্ষতি ঠেকাতে বোতল বোতল স্যানিটাইজ়ার কেনা, বা শপিং মল খালি করে টয়লেট পেপার তুলে আনা তো অতি তুচ্ছ।’’

‘‘বুঝলাম, শিখলাম। এবং জানলাম যে আমিও মানুষ, আমারও মন আছে। আমার সেই মনের ভয় করছে। অতএব, করোনা বিদায় না হওয়া অবধি আমি আর আড্ডায় আসছি না মোটেও।’’ মুখে মাস্ক পরতে পরতে বলল তপেশ।

‘আম্মো।’ শিবুদাও উঠে পড়লেন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন