রাজনৈতিক থিয়েটার হিসেবে নোট বাতিল কাণ্ডের জবাব নেই। নেতারা মাঠে, ময়দানে, টিভিতে বক্তৃতা করলে ক’জনের কানে তা পৌঁছোয়? সরকার রাতারাতি লোকের পকেট গড়ের মাঠ করে দিলে কারুরই জানতে বাকি থাকে না যে কালো টাকার বিরুদ্ধে কি একটা অশ্বমেধ যজ্ঞ শুরু হয়েছে দেশে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ব্যাঙ্কের লাইনে দাঁড়িয়েও অনেকেই ‘সাধু, সাধু’ বলছেন।

ঠান্ডা মাথায় বিশ্লেষণ করলে কিন্তু খটকা লাগে। নতুন নোটগুলো বাজারে চলে এলে কী করে আবার ঘুষ খাওয়া আটকাবে, ক্যাশের বান্ডিল দিয়ে বাড়ি কেনা বেচা বন্ধ হবে, মাদকদ্রব্যের কারবার মুখ থুবড়ে পড়বে, তার হিসেব মেলে না। কেউ বলছেন, ভবিষ্যতে যাই হোক, এত দিন যারা বেআইনি সম্পত্তি বানিয়েছে, তাদের ওপর তো একটা কোপ পড়ল! স্যুটকেস ভর্তি কালো টাকা গেলো বুঝি বেনোজলে ভেসে। আয়কর বিভাগের হানাদারির হিসেবে চোখ বোলালে দেখা যায় বাজেয়াপ্ত বেআইনি সম্পত্তির মাত্র ৬ শতাংশ হল কাঁচা টাকা, বাকিটা সোনাদানা, জমি, বাড়ি, শেয়ার আর বিদেশে পাচার করা দৌলত। সেটুকুও এখন এর ওর নামে, ছোট ছোট অঙ্কে সুযোগসন্ধানী স্ট্রাইকারের হেড করা বলের মতো ব্যাঙ্কের গোলপোস্টে ঢুকে যাচ্ছে বলে গুজব। অন্য দিকে আবার কলকাতা আই এস আই-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি দশ হাজার নোটের মধ্যে বড়জোর দু’তিনটে জাল। এ কি তবে মশা মারতে কামান দাগা নয়?

ব্যাঙ্ক আর এটিএম-এর সামনের দীর্ঘ লাইনকেই ডিমনিটাইজেশনের সবচেয়ে বড় কুফল ভাবলে ভুল হবে। আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। দেশে ৯০ শতাংশের বেশি কেনাবেচা হয় নগদে। কর ফাঁকি দেওয়ার ফিকির নয়, অন্য কোনও ভাবে লেনদেনের উপায় নেই বলে। সেই টাকার ৮৬ শতাংশ হঠাৎ বাতিল হওয়ার ফলে অর্থনীতির একটা বড় অংশ একেবারে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে। চাষিদের কাছে বীজ কেনার টাকা নেই, দিন মজুরদের কাজ নেই, ক্ষুদ্র শিল্প বন্ধের মুখে, মুদি আর ফিরিওয়ালার ব্যবসায় ভাটা। তিরুপুরের বস্ত্রশিল্প, বেনারসের শাড়ির ব্যবসা, লুধিয়ানার শীতবস্ত্রের বেচাকেনা, চা বাগান, বড় বড় ইমারত তৈরির কর্মকাণ্ড, সবই ধুঁকছে।

অর্থনীতিতে টাকার জোগান কমে গেলে মন্দা দেখা দেয়, সেটা জানা কথা। আমেরিকায় ১৯২৯ সালে শেয়ার বাজারে ধসের পর ফেডারেল রিজার্ভ টাকার জোগান ৩০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিল, পরবর্তী কালে মহামন্দার এটা একটা বড় কারণ বলে স্বীকৃত। ৯০-এর দশকে জাপানের মন্দার পেছনেও এমন কারণ আছে। এ যাত্রায় সুখবর হল, টাকার অভাবটা সাময়িক। দুঃসংবাদ হল, প্রাথমিক ধাক্কাটা আমেরিকা-জাপানের চেয়ে আরও অনেক বড় মাপের। মন্দার ঘূর্ণিতে অর্থনীতি যত বেশি ক্ষণ পড়বে, তত তার শক্তিক্ষয় হবে, এবং সেই চক্র থেকে বেরোনো কঠিনতর হয়ে পড়বে। অর্থনীতিতে নতুন টাকার জোগান রোগীর কাছে অক্সিজেনের মতো— কত তাড়াতাড়ি মেলে, সেটা মরণ বাঁচনের প্রশ্ন। এখানেই সরকারের ঢিলেমি আর প্রস্তুতির অভাব দেখে আশ্চর্য হতে হয়। এত বড় কাণ্ড ঘটানোর আগে ব্যাপারটার গুরুত্ব কি তাঁরা বুঝতে পারেননি? তিন সপ্তাহ হয়ে গিয়েছে, বাতিল টাকার অঙ্কের মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ করা হয়েছে বলে খবর। এই গতিতে চললে ইষ্টনাম জপ করা ছাড়া উপায় নেই।

খবরের কাগজে বা টিভি চ্যানেলে দেখি খুব বলা হচ্ছে যে, ব্যাঙ্কে এত কোটি কোটি টাকা জমা পড়ছে, তা থেকে সুদের হার কমবে, অনেক লগ্নি হবে আর অর্থনীতির পালে হাওয়া লাগবে। শুনে তাজ্জব হয়ে যাই। প্রথমত, টাকা তোলার বিধিনিষেধ শিথিল হলে এর অনেকটাই ভাটার জলের মতো ফিরে যাবে। হাটে বাজারে বিকিকিনির জন্য ওই নগদ টাকাটা দরকার। দ্বিতীয়ত, বড় বড় শিল্পপতিরা ঋণ ফেরত না দিয়ে যে ভাঁড়ার শূন্য করেছেন, গরিবের পুঁজি জোর করে সেখানে ঢুকিয়ে আবার তাঁদের পুনর্বাসন করা, কিংবা শহুরে বাবুদের গাড়ির ঋণের ব্যবস্থা করাটা কী ধরনের ন্যায়বিচার?

নোটবন্দির সমর্থকরা একটা আপাতগ্রাহ্য যুক্তি দিচ্ছেন এই বলে যে মানুষের চিন্তাধারা আর অভ্যাসে একটা নাড়া দেওয়ার দরকার। এ বার হয়তো অনেকেই ক্যাশলেস বেচাকেনার দিকে ঝুঁকবেন, দোকানে দোকানে মেশিন বসবে, গৃহ পরিচারিকার মাইনে চেকে দেওয়া হবে, সবাই চলে আসবেন অর্থনীতির মূল স্রোতে। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, যাঁরা নোটের তাড়া দিয়ে কোটি টাকার বাড়ি কিনছেন, তাঁদের বুঝি ক্রেডিট কার্ড নেই? এই দুর্নীতিগুলো বন্ধ করার জন্য নোট জিনিসটাকেই তুলে দিতে হয়। কিন্তু সরকার তো নোট তুলছে না, বদলাচ্ছে মাত্র। আমেরিকার মতো দেশেও বেচাকেনার ৪৬ শতাংশ হয় ক্যাশে। গরিবদের স্মার্ট করে তোলাটাই যদি উদ্দেশ্য হয়, ধীরে সুস্থে করলে হত না? কাজটা মাথায় ডান্ডা মেরেই করতে হত?

নোট বদলের সরাসরি উপযোগিতা খুঁজে পাওয়া ভার, তাই আলোচনাটা ঘুরে যাচ্ছে মানসিকতা বদলের দিকে। বলা হচ্ছে, কালোবাজারিদের কাছে একটা বার্তা পৌঁছেছে যে সরকার জেগে উঠেছে, হয়তো আরও কিছু করবে। লোকে এ বার আলসেমি কাটিয়ে আধুনিক প্রযুক্তির দ্বারস্থ হবে। সে ভাল কথা, কিন্তু জনমানসের ওপর প্রভাবটা সব দিক থেকেই দেখা উচিত। অর্থনীতি অনেকটাই বিশ্বাসের ভিত্তিতে চলে। টাকার নোট একটা কাগজ মাত্র, তার নিজের কোনও মূল্য নেই। সবাই তার মূল্য দেবে মনে করেই মূল্য দেয়। বাজারে এখন গুজব ছড়াচ্ছে যে নতুন দু’হাজারি নোট আবার বাতিল হবে, দশ টাকার কয়েন ইতিমধ্যেই বাতিল হয়ে বসে আছে। গোটা অর্থব্যবস্থার ওপর বিশ্বাসের ভিত্তিটাই কি খানিক হলেও টলে গেল না? জন ধন প্রকল্পে সরকার ২৫ কোটি নতুন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খুলিয়েছে। সমস্যা ছিল, তার একটা বড় অংশ ব্যবহারই হয় না। তাঁদের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার দিকে টেনে আনার প্রয়োজন ছিল। উল্টে তাঁরা এখন দেখছেন ব্যাঙ্কের সামনে কাতারে কাতারে লোক, টাকা তোলার নানা বিধি নিষেধ, বেশি টাকা রাখলে আয়কর বিভাগের জেরা। আধুনিক অর্থব্যবস্থার এ কেমন বিজ্ঞাপন হল?

ভক্তজনের কাছে উত্তর আছে বলে তো মনে হয় না।