Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২১ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

নবরূপের অপেক্ষায় ঐতিহ্যশালী হাসপাতাল

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ০১:২৫
দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ হাসপাতাল। নিজস্ব চিত্র

দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ হাসপাতাল। নিজস্ব চিত্র

বিনয়ভবন মাঠ পেরিয়ে শ্রীনিকেতন যাওয়ার পথে বামদিকে অবস্থিত একটি বাড়ি। আপাতদৃষ্টিতে দেখে নিছকই বাড়ি মনে হলেও সেই বাড়ির সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এক বিস্তৃত ইতিহাস। মূল রাস্তা থেকে একটু এগিয়ে গেলেই দেখা যাবে বাড়ির মাথায় থাকা ফলকটি। সেখানে লেখা ‘দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল’’ আউটডোর (বিনয়ভবন)। এক ঝলক দেখলে অবাক হতে হয়। বটগাছের ছায়া ঘেরা হলদে রংয়ের এই বাড়ি তাহলে হাসপাতাল! শুধু হাসপাতালই নয়, এর সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীর নাম। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা পূর্ববর্তী সময়ে যখন ইংরেজদের অত্যাচারে ভারতবাসী ত্রস্ত, ঠিক সেই সময় এক ইংরেজ সন্তান ‘দীনবন্ধু’ নাম পাচ্ছেন শান্তিনিকেতন-সহ সংলগ্ন গ্রামীণ এলাকার মানুষের কাছ থেকে। পরবর্তীকালে তাঁর নামেই শুরু হচ্ছে ‘দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল’। বিভিন্ন সময় একাধিক উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও অর্থাভাবে শেষ পর্যন্ত অনেক কিছুই হয়ে ওঠেনি। হয়তো ভবিষ্যতে এমন একটা দিন আসবে যেদিন নবরূপে আবার এই হাসপাতাল আত্মপ্রকাশ করবে এমনটাই আশা রাখছেন শান্তিনিকেতনের সাধারণ মানুষ।

১৯১২ সালে চার্লস এফ অ্যান্ড্রুজের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাক্ষাৎ হয়েছিল ইংল্যান্ডে। এর পর কবির আমন্ত্রণেই তিনি শান্তিনিকেতন আসেন। তখন গ্রামীণ পুনর্গঠনের কাজ চলছে জোর কদমে। তার সঙ্গেই গ্রামের মানুষদের চিকিৎসা নিয়েও চিন্তিত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কারণ সেই সময় এই এলাকার তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্ত মানুষেরা ভীষণভাবে যক্ষা রোগে আক্রান্ত হতেন। কবির সঙ্গে একযোগে গ্রামের মানুষদের জন্য কাজ শুরু করলেন সি এফ অ্যান্ড্রুজ। তাঁদের যে কোনও সমস্যায় বন্ধুর মতো পাশে থাকতেন বলে গ্রামবাসীরা তাঁকে ‘দীনবন্ধু’ আখ্যা দিলেন। পরবর্তীকালে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধীও একই নামে তাঁকে ভূষিত করেছিলেন।

সেই সময় শান্তিনিকেতনে হাসপাতাল বলতে শুধু পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতাল। এ দিকে রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। জানা যায়, শচীন্দ্রচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তখন পিয়ারসন মেমোরিয়ালের চিকিৎসক। শান্তিনিকেতনে তিনি পরিচিত ‘‘বড় ডাক্তারবাবু’’ হিসেবে। এক সময় তাঁরই সান্নিধ্য পেয়েছিলেন শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের বর্তমান ট্রাস্টি কালিকারঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানালেন, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল তৈরির প্রথম দিকের কথা তিনি শুনেছিলেন শচীন্দ্রবাবুর কাছ থেকেই।

Advertisement

শচীন্দ্রবাবু পিয়ারসন হাসপাতালের দায়িত্ব সামলে গ্রামে গ্রামে ঘুরতেন সাইকেল নিয়ে, কোথাও টাকা নিতেন না। গরুর গাড়িতে চেপেও রোগী এসে তাঁকে দেখিয়ে গিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিকিৎসা করেছিলেন তিনি। এর পর ১৯৪১ সালে কবি প্রয়াত হলেন।

১৯৪৫ সালে মোহনদাস কর্মচন্দ গাঁধী এলেন শান্তিনিকেতনে। তিনিও এই এলাকায় হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। নিজে উদ্যোগ নিয়ে হাসপাতাল তৈরির টাকা সংগ্রহ করতে শুরু করলেন। সব মিলিয়ে ওই সময়ে প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা জোগাড় করেছিলেন তিনি। পুরো টাকাটা দিয়ে যান বিশ্বভারতীকে। কর্তৃপক্ষ সেই টাকা তহবিলে রেখে দেন। একটা সময় টাকা অন্য কাজে খরচ হতেও শুরু করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে তৈরি হয় হাসপাতাল ভবনটি। তহবিলের টাকা থেকেই তৈরি হয় হাসপাতাল। গাঁধীর ইচ্ছে মেনেই হাসপাতালের নাম দেওয়া হয় ‘দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল’।

হাসপাতাল তো হল। কিন্তু প্রশ্ন উঠল চিকিৎসা করবেন কে?

কারণ তহবিলে তখন টাকা কম। বেতন দিয়ে চিকিৎসক রাখা সম্ভব নয়। কালিকাবাবু জানালেন, দায়িত্ব পড়ল শচীন্দ্রবাবুর উপরেই। তখন তিনি পিয়ারসন মেমোরিয়াল হাসপাতালের চিফ মেডিক্যাল অফিসার। সেই দায়িত্ব পালনের সঙ্গেই ১৯৬২ সাল থেকে চিকিৎসার জন্য বুধবার ও রবিবার শচীন্দ্রবাবু যেতেন দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতালে। এক একদিন প্রায় ২৫০ জন রোগী দেখতেন। একটা সময় তাঁকে সহায়তা করেছেন কালিকাবাবুও। ১৯৬৮ সালে পিয়ারসন মেমোরিয়ালের পদ থেকে অবসর পাওয়ার পরে ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রয়াণের আগে পর্যন্ত এই হাসপাতালে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে গিয়েছেন শচীন্দ্রবাবু। কালিকাবাবু বললেন, ‘‘বীরভূম জেলার এমন কোনও গ্রাম নেই যেখান থেকে রোগী এসে এই হাসপাতালে চিকিৎসা করাননি।’’ পিয়ারসন মেমোরিয়াল থেকে রেডিওগ্রাফার, প্যাথোলজিস্টরা এসেও বিনামূল্যে রোগীদের দেখেছেন।

তহবিলে রাখা টাকার সুদ থেকেই হাসপাতালের খরচ চলে যেত। চিকিৎসকেরা স্বেচ্ছাশ্রম দিতেন। শচীন্দ্রবাবুর পরে প্রণব চট্টোপাধ্যায় চিকিৎসা করেছেন। কিন্তু পরে একটা সময় এল যখন দেখা গেল আর পুরনো, অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক পাওয়া যাচ্ছে না। নতুন তরুণ প্রজন্মের চিকিৎসকেরা বেশি টাকা চাইছেন। অ্যালোপ্যাথি ইউনিট শেষ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেল। সেই সময় কেন্দ্র সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রকের কাছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ সাহায্যের আবেদন করলেও সে রকম কোনও সহায়তা মেলেনি। কালিকাবাবু জানালেন, সাংসদ, বিধায়ক, মন্ত্রীদের অনেকের কাছে সাহায্যের আবেদন চেয়েও কোনও লাভ হয়নি। শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট থেকে বিশ্বভারতীর কাছে অর্থসাহায্যের আর্জি জানানো হয়। অনেক আলোচনার পর পল্লি সংগঠন বিভাগের তহবিল থেকে এক লক্ষ টাকা মঞ্জুর করে বিশ্বভারতী। এখনও পর্যন্ত বৃত্তি তহবিলের সেই সুদের টাকা, অনুদানের টাকা এবং শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের মেলায় স্টলভাড়া দিয়ে যে পরিমাণ টাকা লাভ হয়, সেই টাকাতেই হাসপাতালের কাজ চলছে।

২০১৩ সালে বিশ্বভারতীর উদ্ভাবনী শিক্ষা ও গ্রামীণ পুনর্গঠন দফতরের ডিরেক্টর পদে যোগ দেন বিশ্বভারতীর প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য সবুজকলি সেন। শান্তিনিকেতন ট্রাস্টের ট্রাস্টি অনিলবাবু, কালিকাবাবু জানান, মূলত তাঁর উদ্যোগেই অ্যালোপ্যাথি ইউনিটটি আবার চালু হয়। এর আগে সুশান্ত দত্তগুপ্ত উপাচার্য থাকাকালীন হাসপাতাল ভবনটির সংস্কার করা হয়েছিল। বর্তমানে সপ্তাহে তিনদিন অর্থাৎ বুধবার, শুক্রবার ও শনিবার হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক সুদীপকুমার নাগ এবং বুধবার ও শুক্রবার অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসক সুরজিৎ সাহা হাসপাতালে রোগী দেখতে বসেন। ন্যূনতম সাম্মানিক তাঁরা পান। মূলত পিয়ারসনপল্লি, বাগানপাড়া, বালিপাড়া থেকে স্থানীয়েরা চিকিৎসার জন্য আসেন। এই দুজন চিকিৎসকই বিশ্বভারতীর দত্তক নেওয়া গ্রামগুলিতে গিয়েও মানুষের চিকিৎসা করেন। বছরে প্রায় দু’লক্ষ টাকা খরচ হয় ওষুধ কেনার জন্য। সেই টাকা শান্তিনিকেতন ট্রাস্ট পৌষমেলার স্টলভাড়া থেকে পাওয়া লভ্যাংশ থেকে খরচ করে।

তবে এই হাসপাতালের রূপ হয়তো পরিবর্তন হতে পারে। জানা গিয়েছে, কেন্দ্র থেকে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা অনুমোদন করা হয়েছে, যে টাকায় ‘যোগ কুঠি’ তৈরি হবে বিশ্বভারতীতে। বিনয়ভবনের আমবাগানে গাছের তলায় তৈরি হবে আটচালা ঘর। কোনও ঘর হবে আসন কুঠি, কোনও ঘর প্রাণায়াম কুঠি। সেই কুঠিগুলিতেই থাকবে বিষয়ভিত্তিক প্রাচীন সমস্ত বই। চিরাচরিত যোগের উপর ভিত্তি করেই এগিয়ে যাবে কাজ।

পরবর্তী ক্ষেত্রে যোগ কুঠির সামনেই একটি ভেষজ উদ্যান তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে বিশ্বভারতীর যোগিক আর্ট অ্যান্ড সায়েন্স বিভাগের। ওই বিভাগের প্রধান সমীরণ মণ্ডল জানালেন, ‘দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল’-কে যুক্ত করে একটি যোগ গ্রাম করার ইচ্ছে আছে তাঁদের। হাসপাতালে এখন যেমন চিকিৎসা চলছে তেমনটাই চলবে। তবে যে দিনগুলি হাসপাতাল বন্ধ থাকে সেই দিনগুলিতে শুধুমাত্র আয়ুর্বেদ, ইউনানি, সিদ্ধায়, যোগের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হবে। ভেষজ উদ্যান থেকে উপকরণ নিয়ে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যাবে।

বিষয়টি জানিয়ে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে একটি আবেদনপত্রও কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন সমীরণবাবু। অবসর নেওয়ার পরেও কর্মসমিতির অনুমোদনে দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট কমিটির সম্পাদক রয়েছেন কালিকারঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘‘আলোচনার মাধ্যমে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমাদের।’’ ঐতিহাসিক এই দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ মেমোরিয়াল হাসপাতাল কি নতুনরূপে আত্মপ্রকাশ করবে নাকি চিরাচরিত রূপ নিয়ে এভাবেই এগিয়ে যাবে -- সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন

Advertisement