কাজের জায়গা? না কি অবরুদ্ধ নগরী? যেখানে ঢুকলেই মনে হয় এই বুঝি কেউ তাড়া করবে “আমার রোগীটাকে মেরে ফেললেন?” কাজের আনন্দ হাওয়া হয়েছে অনেক দিন, এখন দমবন্ধ অবস্থায় কোনও রকমে দিনাতিপাত। আগে হাসপাতালে ঢুকতেন গানের কলি ভাঁজতে ভাঁজতে। কখনও বা গলায় থাকত সৃষ্টিসুখের উল্লাস। আর এখন? ঢোকার মুখে চোয়াল শক্ত করেন, চার পাশটা দেখে নেন কোনও জটলা আছে কি না! ঢুকেই সহকর্মীকে প্রশ্ন করেন “কি রে, কোনও ঝামেলা নেই তো!” চেনা দেওয়াল, চেনা ফুলগাছ, চেনা মানুষ— সব কিছুকেই কেমন যেন অচেনা ঠেকে মাঝে মধ্যেই। ‘আপনি ভগবান’ শুনলেই আঁতকে ওঠেন চিকিৎসক, এই বুঝি শুনতে হবে ‘শয়তান শুধু কামাচ্ছে’।

মাথা আর হৃদয়ের যুগলবন্দি দিয়ে জীবনরক্ষার কাজ করতে যাওয়ার আগে চিকিৎসক মশাইকে ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়ের উপর নির্ভর করে ঠিক করতে হয় বাতাসে সোঁদা গন্ধ কতটা! মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর হৃৎস্পন্দনের ছন্দ বুঝে তার চিকিৎসায় ঝাঁপানোর আগের মুহূর্তেই মাথায় আসে রোগীটি না বাঁচলে তাঁর নিজের পরিণতি কী কী হতে পারে। দুর্ভাগ্যবশত, সৃষ্টিকর্তা সবাইকে বাঁচিয়ে রাখার এবং ‘গ্যারান্টি-সহকারে’ ভাল করার ক্ষমতা চিকিৎসককুলকে না দিলেও, গণ-উন্মত্ততার মাদকতা সেই অফুরান প্রত্যাশা নিয়েই নিঃশ্বাস ফেলতে থাকে চিকিৎসকের ঘাড়ের উপর। পান থেকে চুন খসলেই ‘ছবি’ হয়ে যেতে পারেন। চপেটাঘাত, ফাটানো মাথা, বিষ্ঠাসিক্ত সত্তা নিয়ে এই মুহূর্তে এ রাজ্যের, এ দেশের চিকিৎসকেরা সঙ্কটজর্জর, অসহায়। এক দিকে পেশার দায় এবং দায়িত্ব, উল্টো দিকে পরিকল্পিত ভাবে তৈরি করা অবিশ্বাসের কুণ্ডলী-পাকানো ধোঁয়ার মধ্যে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠছেন চিকিৎসকেরা।

নাটুকে শোনালেও এই বিবরণ অনেক চিকিৎসকের প্রতি দিনের জীবন থেকে উঠে আসা। পাড়ায় পাড়ায় হরিনাম সংকীর্তনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ‘ভুল চিকিৎসা’র জিগির। সব চেয়ে সহজে  যাঁদের বিচার করা যায় আর সহবত শেখানো যায় মর্জিমতো, তাঁরা হচ্ছেন এ রাজ্যের চিকিৎসককুল। ‘ভুল চিকিৎসা’ কোনটা, এখন সবাই বোঝেন। একমাত্র বুঝতে পারেন না চিকিৎসক। তাঁর বিচারের অঙ্গনটি কোথায় হবে? কোনও কোর্ট লাগবে না। হাসপাতালের মাঠ আছে, আছে ডাক্তারের চেম্বার। সেখানেই তাৎক্ষণিক কোর্ট মার্শাল।

বিচারক কে হবেন? ‘জনসেবায়’ অধীর, ‘রাজনৈতিক জোছনা’র আলো পেতে উদ্গ্রীব পাড়ার দাদা ‘স্বতঃস্ফূর্ত জনরোষ’-এর মাথায় চেপে আবির্ভূত হন। হাসপাতালে ঝামেলা করতে পারলে রাজনীতির চেকারবোর্ডে নম্বর বাড়ে। পরের ভোটে টিকিট পাওয়ার পথ সুগম হয়। আর তাৎক্ষণিক ‘অন্য’ প্রাপ্তিযোগ তো থাকেই। এ এক ‘অরণ্যসভ্যতা’র ইতিবৃত্ত। অসহায় চিকিৎসকের কানে বাজে জীবনানন্দের কলি— ‘ধরা যাক দু-একটা ইঁদুর এবার’। নিতান্তই অসহিষ্ণু, জীবনরক্ষার যুদ্ধে পাঁচ আর পাঁচ যোগ করলে যে দশ হয় না, তা শুনতে ও বুঝতে একান্তই অপ্রস্তুত, আরোপিত সিদ্ধান্তের মাদকতায় আচ্ছন্ন, দাদা-তাতানো দলবলের হাতে কখন পড়তে পারি সেই ভাবনা তাড়া করছে প্রতিনিয়ত।

এই অবস্থার মধ্যে কোন আদর্শের নিগড়, কোন সামাজিক দায়বোধের না-হারা প্রেরণা এ রকম উৎপীড়ন-জর্জর সামাজিক বলয়ে চিকিৎসককে তার সবটুকু নিঃশেষ করতে উদ্বুদ্ধ করবে, বোঝা যাচ্ছে না এ সময়। এই কুয়াশায় এটাও দৃশ্যমান নয় যে, কোন পথে চিকিৎসক সমাজ আর সাধারণ মানুষের মধ্যে বিদ্যুৎগতিতে বেড়ে চলা অভিমান, অবিশ্বাস, পারস্পরিক অশ্রদ্ধা আর চূড়ান্ত সন্দেহবাতিক চলে গিয়ে আসবে খোলা বাতাস। এটা ভীষণই জরুরি। আর এ কাজ করার দায়িত্ব সবারই।

সবার আগে যেটা প্রত্যেককে বুঝতে হবে সেটা হচ্ছে, চিকিৎসকরা সাধারণ ভাবে নিজের কাজটা ভাল করে সম্পাদন করে রোগীর জীবন বাঁচানোর জন্য ইচ্ছুকই শুধু নন, প্রতি মুহূর্ত লড়াই করেন। না হলে তো তাঁর পেশার প্রাসঙ্গিকতাই থাকে না। অপেশাদারিত্ব? অবক্ষয়? হ্যাঁ আছে বইকি! আমরা ভাবি কী করে যে, চিকিৎসা পেশাটা একটা দুর্গ দিয়ে ঘেরা, যেখানে সামগ্রিক ভাবে চলতে থাকা সমাজের ভাবনাচিন্তার ঢেউ পৌঁছয় না! কিন্তু কালো দেখার উন্মাদনায় আমাদের চোখ যদি আলো দেখার ক্ষমতাই হারিয়ে ফেলে, তা হলেই ঘটে দুর্ঘটনা। আত্মরতি একটি সামাজিক ব্যাধি। ব্যক্তি থেকে ছড়িয়ে তা কখনও কখনও সমাজের একটা অংশের মানুষকেও আচ্ছন্ন করে। এ ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটছে। 

অন্য দিকে, ছোট হলেও পেশার জগতে এই কালো অংশটিকেও চিহ্নিত করার কাজটা পেশার মধ্যে থাকা মানুষজনকেই করতে হয়। অস্বীকার করার উপায় নেই, এই মুহূর্তে এই কাজটা অবশ্যই পেশার মধ্যে খুব বলশালী নয়। প্রকৃতির নিয়মে পচা ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে যায় রজনীগন্ধার সুবাসকেও। নিতান্তই আদর্শঋদ্ধ, কাজপাগল ও ঝামেলা না করা পেশার মধ্যের বেশির ভাগ মানুষদের তাই এই কাজে মনোযোগী হওয়া দরকার।

কিন্তু সব চেয়ে জরুরি কাজ: প্রত্যেকের এটা বোঝা যে চিকিৎসকরা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যবস্থার মুটে এবং মুখোশ। প্রবহমান ব্যবস্থার যত ক্লেদ, পরিকল্পনার অভাব-অপ্রতুলতা, তার সব কিছুর নীলকণ্ঠ হয়ে চিকিৎসকরা আসেন মানুষের সামনে। সরল দৃষ্টিতে মানুষও প্রায়ই ভাবতে শুরু করেন যে, ব্যবস্থার ভালমন্দের একমাত্র দায়িত্ব চিকিৎসকদের।

এ এক নতুন পুতুলনাচের ইতিকথা। চিকিৎসক এখানে কারিগরের হাতের পুতুলমাত্র। জালের আড়ালে থাকা রাজা যেমন দৃশ্যমান হন না। সামনে আসে সৈনিকরা। চিকিৎসকদের অবস্থাও তাই। আমাদের দুর্ভাগ্য এটাই যে, এ দেশের সরকার এই মুহূর্তে চাইছেন না আর মানুষের স্বাস্থ্যের ভার বইতে। নামমাত্র অর্থব্যয়ের মধ্য দিয়ে সরকারি স্বাস্থ্যের ল্যাম্পপোস্ট কোনও রকমে টিকিয়ে রাখার প্রতারণার কাজ এক দিকে চলছে। অন্য দিকে চলছে নামগান— ‘উন্নত চিকিৎসা’ নাকি একমাত্র ব্যবসায়ীরা করতে পারে। রাষ্ট্রের দায় ঝেড়ে ফেলে আলুকাবলির মতো স্বাস্থ্য বিক্রির যে পথচলা, কর্পোরেটের বেড়ে ওঠা, তার মূলগত ভিত্তিই হচ্ছে তঞ্চকতা, অস্বচ্ছতা। দায়িত্ববোধহীন এবং প্রতারণাজর্জর এই দ্বিমুখী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের অসন্তোষের বিকৃত এবং অতিসরলীকৃত বহিঃপ্রকাশের সামনে পড়তে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এটা বাঞ্ছিত কি? সন্ত্রাসবাদীরা যেমন দুষ্কর্ম থেকে আত্মগোপনের অভিসন্ধি নিয়ে নারী-শিশুদের সামনে রেখে আক্রমণ চালায়, এটা ঠিক সে রকমই। বিষয়টির গভীরতা তাই উপলব্ধি করা দরকার।

এটা বোঝা দরকার চিকিৎসক পিটিয়ে, আর ভীতসন্ত্রস্ত চিকিৎসক সমাজকে সঙ্গে নিয়ে সমাজ সামনে হাঁটতে পারবে না। প্রশাসনিক পদক্ষেপ করে অশান্তি রোখার কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সরকারকে অগ্রণী হতে হবে। পাশাপাশি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভুল চিকিৎসার ছেলেধরার ডাক শুনে বিভ্রান্ত সাধারণ মানুষের সঙ্গে চিকিৎসকদের আরও তন্নিষ্ঠ আলাপন। যেখানে তথ্য থাকবে, বুজরুকি থাকবে না। সত্য থাকবে, মরীচিকা থাকবে না। চিকিৎসকদেরও এগোতে হবে দেওয়াল ভাঙতে। ‘পেশেন্ট পার্টি’ বলে একটা শব্দ ছাত্রজীবন থেকে আমাদের শেখানো হয় রোগীর আত্মীয়স্বজনদের বোঝাতে। এর মধ্যে দূরত্বের আবহ আছে। আছে বিভাজনের ইঙ্গিত। রোগীদের বাড়ির লোকজনের সঙ্গে স্বচ্ছ ভাবে, সোজা ভাবে বাস্তব অবস্থাটা বলার এবং বার বার বলার ধৈর্য-সহকারে কথা বলার দায়িত্ব চিকিৎসকদের নিতে হবে।

শিক্ষিত, সাধারণ ভাবে সংবেদনশীল নাগরিক সমাজের এ বিষয়ে ভূমিকা নেওয়াটাও জরুরি হয়ে পড়েছে। সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা অনেক সময়ই সমাজের ক্ষতিকারক অনুরণনগুলি অন্যদের থেকে আগে বুঝতে পারেন এবং এগিয়ে আসেন তার প্রতিকারের পথ দেখাতে। এটা ঘটনা যে চিকিৎসা-পেশার এই  শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা তাঁদের তীক্ষ্ণ অনুভূতিকে এখনও নাড়া দিতে পারেনি। এ-ও হতে পারে পেশার প্রতি দিনের সমাজগ্রাহী ভূমিকা নিয়ে তাঁরাও সংশয়ে এবং ভাবনার দ্বিধায় আছেন। এটা কাটানোতে পেশার মানুষজনেরও ভূমিকা নেওয়া দরকার। সাধারণ ভাবে পরিব্যাপ্ত সমাজের সঙ্গে আত্মরক্ষার যুদ্ধে নেমে পেশার এই সঙ্কট চলে যাবে না। ব্যাপকতর সামাজিক মঞ্চগুলোর এ ব্যাপারে এগোনো দরকার। সমুদ্রের আপাতশান্ত রূপের অতলে প্রায়ই প্রলয় চলে। সাগর তার গভীরতা আর সহনশীলতা দিয়ে তা সয়ে নেয়। যখন আর তা পারে না তখনই হয় প্রলয়। চিকিৎসা-পেশাতেও
এ রাজ্যে, এ দেশে এ রকম একটা অবস্থা। আপাতস্নিগ্ধ নমনীয়তার আড়ালে গুমরাচ্ছেন চিকিৎসক সমাজ। এটার দিকে দৃষ্টি দেওয়াটা জরুরি হয়ে পড়ছে প্রত্যেকের।